
ম্যাচটা চতুর্থ দিনে যাবে কি না সংশয় হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত গিয়েছে। তবে পঞ্চম দিনে যাওয়ার সম্ভাবনা যে খুবই কম, আজ এই বিশ্বাস নিয়েই ঘরে ফিরে গেছেন ডারউইনের দর্শকেরা।
‘বিশ্বাস’ বলাটা কি ঠিক হলো! অস্ট্রেলিয়ানরা তো নিশ্চিতভাবেই চাইবে টেস্টটা শেষ দিনে যাক। তাহলেই তাদের মানসম্মান কিছুটা বাঁচার সম্ভাবনা থাকবে। চতুর্থ দিনে শেষ হওয়ার যে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, সেটা তো আসলে বাংলাদেশের পক্ষে! কাল টেস্ট শেষ হওয়া মানে তো বাংলাদেশেরই জয় আসলে।
ভাবতে একটু অন্য রকমই লাগছে যে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে একটি টেস্ট যেন চতুর্থ দিনে শেষ হয়ে যায়, সেই পালে হাওয়া দেওয়া দলটির নাম বাংলাদেশ! আর স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া মনেপ্রাণে চাইছে যেন তা না হয়। কাল তাদের দ্বিতীয় ইনিংসটা যেন এতটাই লম্বা হয় যে শেষ দিনেও অন্তত লড়াইটা করা যায়।
টেস্টের আয়ু নিয়ে এই আলোচনার কারণটা ডারউইন টেস্টে স্কোরকার্ডের দিকে তাকালেই পরিষ্কার হবে। আজ তৃতীয় দিন শেষে দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেটে ১৬১ রান করে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের চেয়ে এখনো পিছিয়ে ৬৭ রানে। এর আগে টেলএন্ডারদের দৃঢ়তায় ২২৮ রানের লিড নিয়ে লাঞ্চের পরপর বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস শেষ হয় ৪২৬ রানে। টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান। ২০০৬ সালে ফতুল্লা টেস্টের প্রথম ইনিংসে করা ৪২৭–ই এখনো সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশের লিড ২০৬ অতিক্রম করার পর থেকেই ইতিহাসের পাতা চোখ রাঙাতে শুরু করেছে অস্ট্রেলিয়াকে। নিজেদের টেস্ট ইতিহাসেই যে কখনো ঘরের মাঠে প্রথম ইনিংসে ২০৬ রানের বেশি পিছিয়ে থাকা ম্যাচে জেতেনি তারা! অর্থাৎ ডারউইনে জিততে ঘরের মাঠে প্রথম ইনিংসে সবচেয়ে বেশি রানে পিছিয়ে থাকার ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার রেকর্ড গড়তে হবে তাদের।
কিন্তু তৃতীয় দিনে শেষ সেশনে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া যেভাবে উইকেট হারাতে শুরু করল, তাতে রেকর্ডটা নতুন করে লিখতে একটু কষ্টই হওয়ার কথা তাদের। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নেওয়া হাসান মাহমুদ এবারও কাঁপিয়ে দিয়েছেন স্বাগতিকদের শুরুটা। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে বোল্ড করেছেন ওপেনার জেক ওয়েদারাল্ডকে এবং ট্রাভিস হেডকে ১১তম ওভারে। হাসানকে কাট করতে গিয়েছিলেন হেড। কিন্তু শরীরের কাছাকাছি থাকা বলটা ব্যাটে লেগে ভেঙে দেয় স্টাম্প।
৩৭ রানে ২ উইকেট হারানো অস্ট্রেলিয়ার ভরসা তখন মারনাস লাবুশেন আর স্টিভেন স্মিথের তৃতীয় উইকেট জুটি। ৩৬ রানের জুটিতে দুজনই মোটামুটি থিতু হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ২০তম ওভারের শেষ বলে তাইজুল ইসলাম ৫৯ বলে ৩১ রান করা লাবুশেনেকে বোল্ড করে দিলে আরেকবার কেঁপে ওঠে স্বাগতিকেরা। স্মিথ ফিরেছেন আরেকটু এগিয়ে, ৪৪ রান করে মেহেদী হাসান মিরাজের বলে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে। অস্ট্রেলিয়া ১২২ রানে চতুর্থ উইকেট হারানোর পর ডারউইনের প্রেসবক্সে আলোচনা—টেস্টটা চতুর্থ দিনে যাবে তো!
ক্যামেরন গ্রিন তো বটেই, অস্ট্রেলিয়ারও সৌভাগ্য যে তাসকিন আহমেদের একটি বল তাঁর স্টাম্পে লাগলেও বেলস পড়েনি। অবিশ্বাস্যভাবে স্টাম্পে আঘাত করে বলটা ছাড়িয়ে গেছে বাউন্ডারিও! সেই সৌভাগ্য নিয়েই অস্ট্রেলিয়া দিন শেষ করেছে আর কোনো উইকেট না হারিয়ে।
ডারউইন টেস্টটা যে তৃতীয় দিন শেষে এই জায়গায় দাঁড়িয়ে, সেটির বড় কৃতিত্ব প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের টেলএন্ডের ব্যাটিংয়ের। কিন্তু সেখানে কোনটি বিশেষ? নাথান লায়নকে স্লগ সুইপে ডিপ মিড উইকেটের ওপর দিয়ে মারা ইবাদত হোসেনের বিশাল ছক্কা? নাকি হাসান মাহমুদের ১৪ রান করার ছলে ৯২টি বল খেলে যাওয়া!
অস্ট্রেলিয়ানরা বলবে—এর কিছুই নয়। ঝামেলা তো পাকিয়েছে আমাদের ফিল্ডাররা। এক সেশনে তিনটা ক্যাচ ফেলে কেউ? তা–ও আবার এক ওভারে দুইটা। ক্যাচ ফেললে টেলএন্ডার ব্যাটসম্যান কেন, শিশুরাও রান করত পারবে।
যে যেভাবেই দেখুক, আজ ডারউইন টেস্টের আরও একটি দিনকে শুরু থেকেই বাংলাদেশ করে নিয়েছিল নিজেদের এবং সে কৃতিত্বের প্রায় পুরোটাই টেলএন্ডারদের দারুণ ব্যাটিংয়ের। ১৫৪ বলে মিরাজের ৬৫–কে খুঁটি বানিয়ে সেটাকে চক্কর দিয়ে ব্যাটিং করে গেছেন আগের দিনের অপরাজিত হাসান, তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ আর ইবাদত।
কাল দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশের লেজের দিকের ব্যাটিং শুরু হয়েছিল ৮৩.৩ ওভারে, মুশফিকুর রহিমের আউটের পর রান তখন ৬ উইকেটে ৩০৮। মিরাজের সঙ্গে এরপর কালকের শেষ সেশন আর আজকের প্রথম সেশন মিলিয়ে টেলএন্ডাররাই অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের দিয়ে বল করিয়েছেন ৫২.৩ ওভার। এই সময়ে রান যোগ হয়েছে আরও ১১৮, যার ৭৫–ই এসেছে আজ। এসব কারণেই সম্ভবত হ্যাজলউড ৬ উইকেট নিয়ে টেস্টে ৩০০ উইকেটের মাইলফলকের দেখা পেলেও অর্জনটি অস্ট্রেলিয়ানরা ঠিক উদ্যাপন করতে পারেনি।
জুটিগুলোর দিকেও একটু তাকিয়ে দেখুন। মিরাজ–হাসানের সপ্তম উইকেটে ৪৬, মিরাজ–তাইজুলের অষ্টম উইকেটে ১৮, মিরাজ–তাসকিনের নবম উইকেটে ৪, এমনকি তাসকিন–ইবাদতের শেষ উইকেটে ৮ রান, যার মধ্যে ইবাদতের ওই ছক্কাটাও আছে।
টুপিখোলা অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য টেলএন্ডারদের এই কীর্তিতেই তৃতীয় দিনের প্রথম সেশন পার করে লাঞ্চের পরও ৫ ওভার ব্যাটিং করেছে বাংলাদেশ। হাসান, ইবাদতের কথা তো বলাই হলো, মাঝে এক ছক্কা এক চারে তাইজুলের ২৩ বলে ১৭ আর তাসকিনের দুই বাউন্ডারি মেশানো ৩২ বলে অপরাজিত ১৪ রানের ইনিংস দুটির সময়ও মনে হয়নি অস্ট্রেলিয়ার পেস–বাউন্স খুব একটা ভোগাচ্ছে তাঁদের। হ্যাঁ, তিনটা ক্যাচ পড়েছে প্রথম সেশনে, যার দুটি আবার এক ওভারে।
কিন্তু তাতে কী! তানজিম হাসান তো আগের দিনই বলে দিয়েছেন, ক্যাচ ধরবে–ক্যাচ পড়বে এসব খেলারই অংশ।
অস্ট্রেলিয়া : ১৯৮ ও ৫৩ ওভারে ১৬১/৪ (স্মিথ ৪৪, গ্রিন ৪৩*, লাবুশেন ৩১, হেড ১৭, ক্যারি ৭*; হাসান ২/৩৩, তাসকিন ০/৩৮, ইবাদত ০/৩৮, তাইজুল ১/২৮, মিরাজ ১/২০)। বাংলাদেশ: ৪২৬।