পুনে গ্র্যান্ড ট্যুর অনুষ্ঠিত হলো গত জানুয়ারিতে। সেখানে অংশ নিয়েছিল লি-নিং স্টার সাইক্লিং দল। আশ্চর্যের বিষয়, তাদের সেই দলে নেতৃস্থানীয় সাইক্লিস্টদের মধ্যে একজনও চায়নিজ নন। এটুকু শুনে আপনার মনে পড়তে পারে, ৮ বছর আগের বিশ্বকাপ ফুটবল। রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত ২০১৮ সালের সেই বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয় ফ্রান্স। তাদের সেবার বিশ্বকাপ জয়ের নেপথ্যে মূল কারিগর ছিলেন পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান এবং ইউরোপের দক্ষিণাঞ্চলের বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়েরা।
তাকাতে পারেন ক্রিকেটেও। ২০২৪-২৫ বোর্ডার-গাভাস্কার ট্রফি। অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের (এবিসি) ক্রীড়া সঞ্চালক পল কেনেডে আগে ফুটবল খেলতেন, বর্তমানে সাংবাদিক। সেই সিরিজে তিনি অবাক করা এক তথ্য জানান। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে অনূর্ধ্ব-১২ পর্যায়ে খেলা কচিকাঁচাদের মধ্যে ৪০ শতাংশই দক্ষিণ এশিয়ান বংশোদ্ভূত। কেনেডি এক ধাপ এগিয়ে এটাও বলে দেন, ‘অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের ভবিষ্যতের প্রশ্নে উত্তরটা সম্ভবত ভারতীয় ও দক্ষিণ এশিয়ান বংশোদ্ভূত ক্রিকেটাররা।’
নেদারল্যান্ডস দলের সাকিব জুলফিকারের কথাই ধরুন। পাকিস্তানের শিয়ালকোটে ১৯৬৬ সালে জন্ম নেওয়া তাঁর বাবা জুলফিকার আহমেদ নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলে খেলেছেন। পরে ডাচ ক্রিকেটে কোচিংও করেছেন। তাঁর তিন ছেলের সবাই নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
আসলে খেলাধুলা জাতীয়তার কঠিন সংজ্ঞা ডিঙিয়ে গেছে বহু আগেই। পূর্বপুরুষ যে দেশের কিংবা যে দেশে জন্ম, সেই দেশের হয়েই যে খেলতে হবে, তা নয়। অ্যাথলেটরা অন্য দেশেরও প্রতিনিধিত্ব করেন। আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে তাকাতে পারেন। এখানেও দক্ষিণ এশিয়ান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের দাপট। ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র হিসাব অনুযায়ী ৪০ জন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ক্রিকেটার খেলবেন এবার টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে। এরপরই পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ক্রিকেটাররা—৩০ জন।
পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ক্রিকেটাররা সবচেয়ে বেশি আছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত দলে—১০ জন। তাঁদের মধ্যে ২৬ বছর বয়সী পেসার মুহাম্মদ জাওয়াদউল্লাহর গল্পটা শুনতে পারেন।
পাকিস্তানের মালাকান্দ জেলায় জন্ম নেওয়া জাওয়াদের জীবনে ক্রিকেট ধরা দিয়েছিল ছোটবেলার বিনোদন হিসেবে। কোনো লক্ষ্য তাঁর ছিল না। স্রেফ আনন্দের জন্য ক্রিকেট খেলতেন। ৮ সদস্যের পরিবারের একজন ছিল তিনি। টেনিস বলের ক্রিকেটই খেলতে হতো। ছিল না কোনো কোচ, ধীরে ধীরে উঠে আসার অবকাঠামোও তাঁর ধরা-ছোঁয়ার বাইরে ছিল।
গত বছর টাইমস অব ইন্ডিয়াকে জাওয়াদ বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানে আমি শুধু টেনিস বলের ক্রিকেট খেলেছি। আমাকে পথ দেখানোর জন্য কোনো কোচ কিংবা অভিজ্ঞ কোনো খেলোয়াড় ছিলেন না। অনেকেই আমাকে ক্রিকেট বল খেলার একাডেমিতে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমার মনে হয়েছিল, সেসব জায়গায় তো অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড়ই সুযোগ পায় না, তখন আসলে কী ভেবেছিলাম জানি না, সম্ভবত ভীতি ছিল মনের মধ্যে।’
জাওয়াদের জীবন পাল্টে গেল ২০২০ সালে। পারিবারিক দায়িত্ববোধ বাড়ছিল, জাওয়াদ পাড়ি জমালেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোর ফাক্কানে। তাতে জাওয়াদের পরিবার একটু সচ্ছল হলো বটে; কিন্তু তাঁর নিজের ক্রিকেট খেলার সুযোগ মিলছিল না সেভাবে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতেন। শরীরের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যেত, তাই তেমন একটা খেলতে পারতেন না। জাওয়াদের ভাষায়, ‘খেলার তেমন একটা সুযোগ পেতাম না, হয়তো এক-দুই ঘণ্টা। এমনকি তখনো টেনিস বলেই খেলতাম। ক্রিকেট বলে খেলতে অনেক সময়ের প্রয়োজন, পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা।’
জাওয়াদ আসলে সেই সব পাকিস্তানির একজন, যারা জীবনের প্রয়োজনে দেশ ছেড়ে অন্য দেশে গিয়েও ক্রিকেটের প্রতি ভেতরের ভালোবাসাটুকু ধরে রেখেছেন। আর সেটুকুর জন্যই এখন তাদেরই কেউ কেউ পা রেখেছেন বিশ্বকাপে।
নেদারল্যান্ডস দলের সাকিব জুলফিকারের কথাই ধরুন। পাকিস্তানের শিয়ালকোটে ১৯৬৬ সালে জন্ম নেওয়া তাঁর বাবা জুলফিকার আহমেদ নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলে খেলেছেন। পরে ডাচ ক্রিকেটে কোচিংও করেছেন। তাঁর তিন ছেলের সবাই নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক সিকান্দার রাজার যাত্রা শুরু হয়েছিল ভিন্ন এক স্বপ্ন নিয়ে। শিয়ালকোট থেকে জিম্বাবুয়েতে তাঁর যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না, পথে ছিল নানা বাঁক—যার মধ্যে ছিল পাইলট হওয়ার স্বপ্ন ও গ্লাসগোর একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটিংয়ে ডিগ্রি অর্জন। শেষ পর্যন্ত পরিবার জিম্বাবুয়েতে স্থানান্তরিত হওয়ার পর ক্রিকেটই তাঁর জীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ এসএটি২০-তে খেলার সময় রাজা এ নিয়ে বলেছেন, ‘বিশ্বকাপ সব ক্রিকেটারের জীবনেই গুরুত্বপূর্ণ। আমি সব সময় জিম্বাবুয়ের সম্মান নিয়েই ভাবি, যেখানে বিশ্বকাপের ভূমিকা অপরিসীম। তাই আমরা সেখানে সব সময় ভালো করার কথাই ভাবি যেন দেশে সবার মাথাটা উঁচু থাকে।’
৩৯ বছর বয়সী রাজার জীবনে এখন পরিষ্কার এক লক্ষ্য—পরবর্তী প্রজন্মে তাঁর মতো যত সিকান্দার আছেন, তাঁদের সবাইকে অনুপ্রাণিত করা, ‘নিজের কাজে সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আশা করি, জিম্বাবুয়ে এবং বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা অন্য সিকান্দাররা তাতে অনুপ্রাণিত হবেন।’
যুক্তরাষ্ট্র দলের পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত পেসার আলী খান সর্বশেষ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ভালো করেই আলোচনায় উঠে আসেন। এবারও মুখোমুখি হবে দুই দল, সেই ম্যাচটা ১০ ফেব্রুয়ারি।
আসলে যুক্তরাষ্ট্রের শায়ান জাহাঙ্গীর থেকে শুরু করে ইংল্যান্ডের রেহান আহমেদ,আদিল রশিদ কিংবা ইতালি, স্কটল্যান্ড থেকে ওমান ও কানাডা পর্যন্ত—টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ যেন আধুনিক অভিবাসনের এক জীবন্ত মানচিত্র।