
আউট হওয়ার পর মাঠ থেকে ড্রেসিংরুম পর্যন্ত যাওয়ার পুরো সময়টাতেই চলল লিটন দাসকে দর্শকদের অভিনন্দন জানানো করতালি। মুশফিকুর রহিম তো সিঁড়িতেই নেমে এলেন তাঁর পিঠ চাপড়ে দিতে। এরও ঘণ্টাখানেক পর লিটন সংবাদ সম্মেলনে কথা বলতে এলেন। এত কিছুর পর লিটনের মধ্যে ক্লান্তি দেখাটাই প্রত্যাশিত ছিল।
ক্লান্ত লিটন নিশ্চয়ই ছিলেন। কিন্তু তাঁর কথায়, তাঁর রসিকতায় ঢাকা পড়ে গেল সব। কাল বিপর্যয়ের মধ্যেও ১২৬ রানের ইনিংসটা তিনি খেলেছেন টেলএন্ডারদের বাঁচিয়ে। এ নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে লিটনের রসিকতা, ‘একজনকে ৬ বল খেলতে দিয়েছিলাম, সে প্রথম বলেই আউট হয়ে গেছে (হাসি)। এরপর আমি আরও সতর্ক হয়ে গেছি, আমারই খেলা লাগবে।’
তাতেও অবশ্য দুশ্চিন্তা শেষ হয়নি। নবম উইকেটে শরীফুল ইসলামের সঙ্গে ৬৪ রানের জুটি বেঁধেছিলেন, সেখানে তাঁর রানই ছিল ৫১। সেঞ্চুরি ছোঁয়ার সময়টাতেও লিটনের সঙ্গী ছিলেন শরীফুল। লিটন যখন ৯৯ রানে অপরাজিত, তখন কিনা শরীফুল হয়ে যান এলবিডব্লু!
আম্পায়ারের বিরুদ্ধে ব্যাটসম্যান রিভিউ নেবেন কী, নন স্ট্রাইকে থাকা লিটনেরই যেন সেই তাড়া বেশি। সেঞ্চুরির অপেক্ষাটা তাঁর পরে আরও বেড়েছে মাঝখানে পানি পানের বিরতি চলে আসায়। সময়টা যে খুব একটা স্বস্তির ছিল না, সেটিও বলেছেন লিটন, ‘আমি অনেক টেনশনে ছিলাম। বিশেষ করে যখন শরীফুলের পায়ে লাগল। আমি ওকে বারবার বলছিলাম যে সামনের পায়ে খেলার জন্য, কারণ ও অনেক লম্বা।’
শুধু টেলএন্ডারদের আগলে রাখাই নয়, লিটনকে পাকিস্তানের বোলারদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে পুরো ইনিংসে। তাঁর বিরুদ্ধে শুরু থেকেই ফিল্ডার ছড়িয়ে দেওয়া ছিল, লিটন যেন বাউন্ডারি না পান, চাওয়া ছিল সেটি।
সঙ্গে তাদের ছিল বাড়তি পরিকল্পনাও—আগের দুই ইনিংসেই লিটন আউট হয়ে গিয়েছিলেন শর্ট বলে। তাঁকে তাই টানা বাউন্সার দিয়ে গেছেন পাকিস্তানের বোলাররা। লিটন সেসবে পুল–হুকে বাউন্ডারি মেরেছেন, শেষে অবশ্য তেমন শটেই ক্যাচ তুলে দিয়েছেন।
তবে এটাতে লিটনের তেমন আফসোস আছে বলে মনে হলো না, ‘যেহেতু পরপর দুইটা ইনিংসে আমি বাউন্সারে আউট হয়েছি, তাদের কাছে এটাই সেরা অপশন মনে হয়েছে। কিন্তু আমি বাউন্সার অনেক উপভোগ করেছি।’
পাকিস্তান যতক্ষণে সফল হয়েছে, ততক্ষণে অবশ্য টেস্টে ষষ্ঠ সেঞ্চুরি পেয়ে গেছেন লিটন। পাকিস্তানের বিপক্ষেই যার তিনটি, তাহলে কি দলটা তাঁর প্রিয় প্রতিপক্ষই হয়ে গেল? লিটন অবশ্য বলেছেন, ‘না, না।’
পাকিস্তানের বিপক্ষে দুই বছর আগে রাওয়ালপিন্ডিতে একই রকমভাবে দলকে ম্যাচে ফিরিয়েছিলেন লিটন। সে ম্যাচে ২৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল বাংলাদেশ। কেউ একজন লিটনকে তাই বাংলাদেশের ‘ক্রাইসিস ম্যান’ও বলতে চাইলেন।
এবার লিটনের উত্তর, ‘টেস্টে আমার ভূমিকাটাই আলাদা। দেখবেন কোনো কোনো দিন টপ অর্ডাররা ওপর থেকে রান করছে। আমি ৬০–৭০ ওভারের সময় নামলাম, উইকেটে তখন বল ঘোরা শুরু হয়ে গেছে। আমার ক্রিকেটটাই এমন—যখন যে সময়টা আসবে, সে সময়টা উপভোগ করে খেলতে হবে। এটাও একটা চ্যালেঞ্জ, কিন্তু এখানেও উপভোগ করার অনেক কিছু আছে।’
লিটনের সেঞ্চুরিতে বিপর্যয় কাটিয়ে প্রথম ইনিংসে ২৭৮ রানের সংগ্রহ পেয়েছে বাংলাদেশ। তাতেও অবশ্য খুব একটা স্বস্তিতে নেই দল। লিটনের ব্যাটিংয়ের সময়ই বোঝা গিয়েছিল, সময়ের সঙ্গে উইকেটটা ব্যাটিংয়ের জন্য ভালো হচ্ছে।
পাকিস্তানের হয়ে ৪ উইকেট নেওয়া খুররম শেহজাদেরও দিন শেষে সে রকমই মনে হচ্ছে, ‘এই পিচ ঢাকার চেয়ে আলাদা। ওখানে বোলাররা সাহায্য পেয়েছে। কারণ, অনেক জায়গায় ফেটে গিয়েছিল। অসম বাউন্স ছিল। এখানে মনে হচ্ছে অনেক রান করা যাবে। আমরা যদি একটা জুটি পাই, তাহলে ৪০০–৪৫০ রান করতে পারব।’
স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ সেটা চাইবে না। তবে উইকেট যে ব্যাটসম্যানদের সাহায্য করছে, সেটি বুঝতে পারছেন লিটনও। ব্যাট হাতে টেস্টের প্রথম দিনটাকে নিজের করে নিয়ে লিটনের সব চাওয়া এখন বোলারদের কাছেই, ‘বোলারদের লম্বা সময় ধরে (ভালো) বল করতে হবে এবং ভালো জায়গায় বল করতে হবে। লিডটা যদি ওরাও পায়, যেন সময় নিয়ে পায়।’