
ভারতে বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা–শঙ্কা থাকায় টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে সে দেশে দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বললেও বিসিবি নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে।
দুই পক্ষের মধ্যে সর্বশেষ যে ভিডিও কনফারেন্স হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ বর্তমানে ভারতে কোনো রকম নিরাপত্তা–সংকট ছাড়াই আম্পায়ারিং করছেন বলে আইসিসির বক্তব্যে তুলে ধরা হয়। ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমেও কয়েক দিন ধরে শরফুদ্দৌলার ভারতের ম্যাচে দায়িত্ব পালন নিয়ে খবর প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশি আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ চলমান ভারত-নিউজিল্যান্ড ওয়ানডে সিরিজের আম্পায়ার প্যানেলে আছেন। ১১ জানুয়ারি বড়োদরায় সিরিজের প্রথম ওয়ানডের পর গতকাল রাজকোটে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতেও তিনি তৃতীয় আম্পায়ারের দায়িত্বে ছিলেন। এমনকি ১৮ জানুয়ারি ইন্দোরে সিরিজের শেষ ওয়ানডেতে তাঁকে অনফিল্ড আম্পায়ার হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
শরফুদ্দৌলার ভারতে অবস্থান ও ভারতের ম্যাচ পরিচালনায় অংশগ্রহণের কারণে কারও কারও প্রশ্ন—বিসিবি যখন নিরাপত্তা শঙ্কায় দল পাঠাচ্ছে না, তখন শরফুদ্দৌলা কীভাবে ভারতে আম্পায়ারিং করছেন?
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সিরিজে আম্পায়ার ও ম্যাচ রেফারি নিযুক্ত করে আইসিসি। প্রতিটি ম্যাচ বা সিরিজে কোন কোন আম্পায়ার দায়িত্ব পালন করবেন, তা নির্ধারণে আইসিসি কিছু মানদণ্ড অনুসরণ করে। আইসিসি ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে কিছু ধারণা দেওয়া হয়েছে।
যেমন ম্যাচ বা সিরিজে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রভাবমুক্ত বা নিরপেক্ষ থাকা, ওই সময়ে দায়িত্ব পালনের জন্য উন্মুক্ত থাকাদের মধ্যে সেরা অপেক্ষাকৃত ভালো পারফর্ম করা আম্পায়ারদের বেশি সুযোগ দেওয়া, একই দলের ম্যাচে নির্দিষ্ট কোনো আম্পায়ারের বারবার দায়িত্ব পালনের বিষয়টি এড়ানো এবং কাজের চাপের বিষয়ে লক্ষ্য রাখা।
বলে রাখা ভালো, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুরু থেকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত আম্পায়ার নিয়োগ করত আয়োজক দেশের বোর্ড। ১৯৯৩ সালে আইসিসি প্রতিটি টেস্ট ম্যাচে একজন করে নিরপেক্ষ আম্পায়ার দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করে। পরে যা ওয়ানডেতেও কার্যকর হয়। নিরপেক্ষ আম্পায়ার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সুবিধার্থে ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ২০০২ সালে এলিট প্যানেল গঠন করে।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই এলিট প্যানেল থেকেই দুটি পূর্ণ সদস্যদেশের দ্বিপক্ষীয় সিরিজ ও আইসিসি টুর্নামেন্টের জন্য আম্পায়ার বাছাই করা হয়। তবে এলিট প্যানেলের আম্পায়ার বেশি নয় বলে বড় টুর্নামেন্টগুলোতে আন্তর্জাতিক প্যানেল থেকেও আম্পায়ার নেওয়া হয়।
আম্পায়ারদের মোট চারটি প্যানেল আছে। প্রথমটি হচ্ছে ন্যাশনাল আম্পায়ার, যাঁরা মূলত সংশ্লিষ্ট দেশের ক্রিকেট বোর্ডের অধীন। ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ম্যাচ, লিস্ট ‘এ’ ও টি-টুয়েন্টি পর্যন্ত আম্পায়ারিং করতে পারেন তাঁরা।
পরের ধাপে আছে আইসিসি ইন্টারন্যাশনাল আম্পায়ার্স প্যানেল। এই ধাপের আম্পায়াররা ঘরের মাঠে ওয়ানডে ও আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি পরিচালনা করতে পারেন। তৃতীয় ধাপকে বলা হয় আইসিসি ইমার্জিং আম্পায়ার প্যানেল, যা মূলত এলিট প্যানেলে যাওয়ার আগে সর্বশেষ ধাপ।
আম্পায়ারদের সর্বোচ্চ স্তর হচ্ছে আইসিসি এলিট আম্পায়ার প্যানেল। এই প্যানেলে থাকা আম্পায়াররা নিরপেক্ষ আম্পায়ার হিসেবে টেস্ট ও ওয়ানডে ম্যাচে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে এলিট প্যানেলে আম্পায়ার আছেন ১২ জন। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশের একমাত্র আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ। ২০২৪ সালের মার্চ এলিট প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত হন তিনি, যা বাংলাদেশের আম্পায়ারদের মধ্যে প্রথম।
এলিট প্যানেলের আম্পায়াররা সরাসরি আইসিসির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। আইসিসি যখন যেখানে পাঠায়, সেখানেই দায়িত্ব পালন করতে যান। যেমন গত মাসে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের অ্যাশেজে ব্রিসবেন টেস্টে মাঠে ছিলেন তিনি। মাঝখানে কয়েক দিন বিপিএলে ম্যাচ পরিচালনা করে এখন গেছেন ভারত-নিউজিল্যান্ড সিরিজে।
শরফুদ্দৌলা বিসিবি আয়োজিত টুর্নামেন্টে আম্পায়ারিং করেন। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আম্পায়ারিংয়ের জন্য তিনি আইসিসির আওতাধীন। এলিট প্যানেলের আম্পায়ার হওয়ায় বিসিবির কাছ থেকে তাঁর ছাড়পত্র নেওয়ার বিষয় নেই।
এ বিষয়ে বিসিবি পরিচালক ইফতেখার রহমান পরিষ্কার করেই বলেছেন, ‘তিনি আইসিসির চুক্তিবদ্ধ আম্পায়ার। আমাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ নন। আমাদের সঙ্গে যে চুক্তি, সেটা হচ্ছে যখনই তাঁর আইসিসির দায়িত্ব থাকবে, তিনি চলে যাবেন। এখানে অনাপত্তিপত্র দেওয়ার বিষয় নেই। অ্যাগ্রিমেন্টেই আছে, আইসিসির কাজ থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তিনি অবমুক্ত। তাঁকে কোথাও যেতে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া বা না দেওয়ার কোনো এখতিয়ার আমাদের নেই।’