
এমন বিশ্বকাপ কি আগে দেখেছেন আপনি! এমন বিশ্বকাপ মানে কেমন বিশ্বকাপ? যে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নেই।
টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ অবশ্যই নয়। বাংলাদেশকে ছাড়া টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ হলেই না দেখবেন! ২০০৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের এর আগের ৯টি আসরেই নিয়মিত বাংলাদেশ এবার কেন নেই, তা আপনার অজানা থাকার কথা নয়।
এ জন্য ক্রিকেট অনুরাগী হওয়ারও দরকার নেই। গত কিছুদিন এ নিয়ে যে লঙ্কাকাণ্ড, তা কি আর শুধু ক্রিকেটে সীমাবদ্ধ আছে নাকি! ভূরাজনীতি মিশে গিয়ে তা হয়ে উঠেছে জটিল এক সমীকরণ। খেলা অনেক দিনই আর শুধু খেলা নেই। তবে এবার যা হয়েছে, ক্রিকেট এমন কিছু কখনো দেখেনি আগে। বাংলাদেশও যেমন এমন বিশ্বকাপ আগে দেখেনি।
প্রায় সব খেলারই বিশ্বকাপ হয়, এখানে যে শুধু ক্রিকেটের বিশ্বকাপের কথাই হচ্ছে, তা কি বলে দেওয়ার দরকার আছে!
ক্রিকেটের বিশ্বকাপ বললেও অবশ্য প্রশ্ন উঠতে পারে। ক্রিকেটের বিশ্বকাপ তো আর একটি নয়। ২০ ওভারের বিশ্বকাপের মতো ৫০ ওভারের বিশ্বকাপও আছে। টি-টুয়েন্টি আর ওয়ানডে দুই বিশ্বকাপ ধরলেও বাংলাদেশকে ছাড়া ক্রিকেটের বিশ্ব আসরের দেখা পেতে পিছিয়ে যেতে হয় প্রায় ৩০ বছর, সেই ১৯৯৬ সালে।
৩০ বছর আগে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় যৌথভাবে আয়োজিত সেই বিশ্বকাপের কোনো স্মৃতি যদি আপনার মনে থেকে থাকে, তাহলে ধরে নিতে পারি আপনার বয়স ৩৫–৩৬। হিসাবটা করলাম পাঁচ–ছয় বছরের চেয়ে কম বয়সের স্মৃতি মনে থাকে না, এমন একটা সাধারণ ধারণা থেকে। তা বাংলাদেশে আপনার মতো মানুষের সংখ্যা কত?
একটা পরিসংখ্যানে দেখলাম, বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬৫ শতাংশের বয়স ৩৫–এর নিচে। যার মানে দাঁড়াচ্ছে, এ দেশের বেশির ভাগ মানুষেরই বাংলাদেশবিহীন বিশ্বকাপ দেখার অভিজ্ঞতা নেই। যে অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে আজ শুরু টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের দশম আসরে।
বাংলাদেশ নেই ঠিক আছে, কিন্তু গত কিছুদিনের ঘটনাপ্রবাহে এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কি না থেকেও থাকবে না!
আজ বেলা সাড়ে ১১টায় কলম্বোতে উদ্বোধনী ম্যাচে পাকিস্তান যখন নেদারল্যান্ডসের মুখোমুখি হবে, তখন কোনো না কোনোভাবে অবশ্যই বাংলাদেশের প্রসঙ্গ আসবে। বিশ্বকাপ–বিতর্কে যে বাংলাদেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে পাকিস্তানও।
ভারতে না খেলার দাবিতে বাংলাদেশের পক্ষে ভোটই শুধু দেয়নি, বাংলাদেশ বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার পর অভাবিতভাবে ঘোষণা দিয়েছে ক্রিকেটের সবচেয়ে অর্থকরী ম্যাচ থেকে সরে দাঁড়ানোরও। যে ম্যাচ এমনই সোনার ডিম পাড়া হাঁস যে অন্তত তার একটি নিশ্চিত করেই শুরু হয় মহাদেশীয় ও বৈশ্বিক যত ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোতে নির্ধারিত সেই ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ শেষ পর্যন্ত ওয়াকওভারই দেখবে কি না, আগামী এক সপ্তাহ মাঠের খেলার চেয়েও এ নিয়ে বেশি আলোচনা হবে নিশ্চিত।
বেলা সাড়ে ৩টায় উদ্বোধনী দিনের দ্বিতীয় ম্যাচে দুবারের চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ যখন কলকাতার ইডেন গার্ডেনে খেলতে নামবে, তখন আরও বেশি করে আসবে বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রতিপক্ষ হিসেবে স্কটল্যান্ডকে মাঠে নামতে দেখে সবার মনে পড়বে, স্কটল্যান্ডের বদলে আসলে নামার কথা ছিল বাংলাদেশের। মনে পড়বে সবারই, তবে অন্যদের বাংলাদেশের মানুষের মতো করে অবশ্যই নয়। যে ঘটনা থেকে এত কিছু, পেছনে ফিরে তাকিয়ে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সেই সিদ্ধান্তটাকে এখন মনে হচ্ছে যেন কত দিন আগের!
অথচ যে সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ব ক্রিকেটে রীতিমতো ভূমিকম্প, মোস্তাফিজুরকে বাদ দেওয়ার সেই খবরটা এসেছিল ৩ জানুয়ারি। এর পর থেকেই তো মাঠের খেলাকে আড়ালে ঠেলে দিয়ে বড় হয়ে উঠল অন্য আলোচনা। খেলা বাদ দিয়ে আর্থিক লাভ–ক্ষতির হিসাব।
খেলার একটা আশ্চর্য শক্তি আছে। যত কাদা–ছোড়াছুড়িই হোক, যত বিতর্ক—একবার খেলা শুরু হয়ে গেলে সেসব আড়ালে চলে গিয়ে খেলাটাই বড় হয়ে ওঠে।
এই যে বিশ্বকাপ শুরু হয়ে যাচ্ছে, সেটির আমেজও কি পাওয়া যাচ্ছে সেভাবে! এই প্রথম কোনো টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর আগে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন কে, কাদের ব্যাটে রানের ফোয়ারা ছুটবে, আগুন ঝরবে কাদের বলে—এসব নিয়ে বলতে গেলে সেভাবে আলোচনাই হচ্ছে না। টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের এর আগের ৯টি আসরে চ্যাম্পিয়ন হতে দেখেছে ৬টি দলকে। ‘নয়–ছয়ের’ এই হিসাব ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড আর ভারত দুবার করে শিরোপা জিতেছে বলে।
কাগজে–কলমে শক্তিমত্তা আর গত কিছুদিনের রেকর্ডে এবারের ফেবারিট হিসেবে ভারতের নামটাই উচ্চারিত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। যা বলার সময় কেউ কেউ অবশ্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মনে করিয়ে দিচ্ছেন। এক. টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত স্বাগতিক কোনো দেশ ট্রফি জেতেনি। দুই. কোনো দলই টানা দুবার জিতে শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি।
আজ উদ্বোধনী দিনের তৃতীয় ও শেষ ম্যাচে ভারত যখন মুম্বাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খেলতে নামবে, প্রচ্ছন্ন হয়ে থাকবে সেই ইতিহাস নতুন করে লেখার মিশন।
খেলার একটা আশ্চর্য শক্তি আছে। যত কাদা–ছোড়াছুড়িই হোক, যত বিতর্ক—একবার খেলা শুরু হয়ে গেলে সেসব আড়ালে চলে গিয়ে খেলাটাই বড় হয়ে ওঠে। টি–টুয়েন্টির এই বিশ্বকাপেও কি তা–ই হবে? হতে পারে, তবে বাংলাদেশে বোধ হয় সর্বার্থে তা হবে না।
এমন বিশ্বকাপ যে বাংলাদেশ কখনো দেখেনি আগে!