বিসিবির সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম
বিসিবির সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম

যেসব কারণে ভেঙে দেওয়া হলো বিসিবিতে আমিনুলের কমিটি

গত বছর অক্টোবরে বিসিবি নির্বাচনের পর থেকেই অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ তুলেছিল একটি পক্ষ। গত ৮ মার্চ কিছু ক্লাব প্রতিনিধি এবং একদিন পর জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার কিছু কাউন্সিলর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে (এনএসসি) লিখিত অভিযোগ জমা দেন। পরে সাবেক বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। সেই তদন্ত কমিটি গত রোববার এনএসসির কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

সেই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আজ আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে তামিম ইকবালকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের এক অ্যাডহক কমিটি ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণা দেওয়ার সময়ই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসা অনিয়মগুলো সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন এনএসসির ক্রীড়া পরিচালক আমিনুল এহসান।

সংবাদ সম্মেলনে এনএসসির ক্রীড়া পরিচালক আমিনুল এহসান।

বিসিবি নির্বাচনে ক্যাটাগরি–১ এ জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলো থেকে ১০ জন পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনের সময় এই ক্যাটাগরিতে কাউন্সিলরদের নাম জমা দেওয়ার সময়সীমা কয়েক দফায় বৃদ্ধি করা হয়। তদন্ত কমিটি মনে করে, যথাযথ কারণ ছাড়াই এবং গোপন উদ্দেশ্যে তা বাড়ানো হয়েছিল। যেন নিজেদের ‘পছন্দের’ কাউন্সিলরদের মনোনীত করা যায় এবং তাদের পরিচালক হিসেবে নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হয়।

জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা থেকে কাউন্সিলর নির্বাচন নিয়েও ‘অনিয়মের’ প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। অন্তবর্তীকালীন সরকার ক্ষমতার আসার পর গঠিত অ্যাডহক কমিটি থেকে কাউন্সিলরের নাম নতুন করে পাঠাতে বলা হয়েছিল। এক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতিদের প্রভাবিত করার ‘প্রমাণ’ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার এপিএস সাইফুল ইসলাম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাবিত করেন বলেও দাবি করা হয়েছে।

বিসিবির সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম

জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর অ্যাডহক কমিটি থেকে কাউন্সিলর মনোনয়ন দেওয়ার জন্য তখন চিঠি দিয়েছিলেন বিসিবির তখনকার সভাপতি আমিনুল ইসলাম। তবে ওই অ্যাডহক কমিটির বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে তদন্ত কমিটি। কারণ, অধিকাংশ অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের ক্ষেত্রেও অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে কমিটি।

সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ‘অযৌক্তিক’ হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়ার কথাও আছে তদন্ত প্রতিবেদনে। বিসিবির সদ্য সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম, সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা এবং তার এপিএস সাইফুল ইসলামের সহায়তায় সমন্বিতভাবে ই-ভোটিং প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ ও কারচুপির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে দাবি তদন্ত কমিটির।

নির্দিষ্ট স্থান থেকে গোপনীয়তা ব্যতীত ই-ভোট প্রদান করারও প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। ই ভোটারদের অধিকাংশই ভোটের দিনে শারিরীকভাবে উপস্থিত ছিলেন—কমিটির কাছে তা ভোট কারচুপির প্রক্রিয়া হিসেবে মনে হয়েছে।

সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া

ঢাকা জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটিতে আমিনুল ইসলাম ও নাজমূল আবেদীনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও ‘অযৌক্তিক প্রভাব’ খাটানোর অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে বলেও মনে করে তারা। ব্যালটের গোপনীয়তা, প্রার্থীদের সমান সুযোগ এবং স্বাধীন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিধান লঙ্ঘনের মতো ঘটনার প্রমাণও পাওয়া গেছে বলে দাবি তদন্ত কমিটির। যা বিসিবির গঠনতন্ত্রের লঙ্ঘন বলে মনে করে তারা।

ক্যাটাগরি–২ এ ক্লাব কাউন্সিলরদের বক্তব্যের ভিত্তিতে নির্বাচনের সময় হুমকি প্রদান ও বেআইনিভাবে জবরদস্তির প্রমাণ পাওয়ার কথাও বলা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। ই ভোটিং সিস্টেমের অপব্যবহার করে কাউন্সিলরদের গোপনীয়তা রক্ষা না করার অভিযোগ করা হয়েছে। আর এই ঘটনা হোটেল শেরাটনে ঘটেছে, যার প্রধান নির্বাহী সাখাওয়াৎ হোসেন বিসিবির পরিচালক নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের সহায়তায় ই-ভোটে নির্বাচন কারচুপি হয়েছে বলে মনে করে তদন্ত কমিটি। এই কাজে ক্রীড়া উপদেষ্টা ও তাঁর এপিএস সাইফুল ইসলাম জড়িত ছিলেন বলে জানানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে নির্বাচনের বিভিন্ন ধাপে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

নতুন বিসিবি প্রধান তামিম ইকবাল

এছাড়া সাবেক ক্রিকেটারদের জন্য সংরক্ষিত ক্যাটাগরি–৩ থেকে একজন পরিচালক নির্বাচিত হন। এই ক্যাটাগরিতে পরিচালক নির্বাচিত হন ১০ জন সাবেক ক্রিকেটারের ভোটে। এই ১০ জনকে কাউন্সিলর হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার দায়িত্ব তৎকালীন বোর্ড পরিচালকরা সভাপতি আমিনুল ইসলামকে দিয়েছিলেন বলে তখন দাবি করা হয়েছিল। তবে বিসিবির কাছ থেকে ওই বোর্ডসভার অডিও বা ভিডিও চাইলে ৩–৪ সপ্তাহ সময় চেয়েছিল বিসিবি। তবে তা ‘অযৌক্তিক’ মনে হয়েছে তদন্ত কমিটির। অন্যান্য পরিচালকরা তদন্ত কমিটির কাছে দাবি করেছেন, কাউন্সিলর মনোনয়নের দায়িত্ব আমিনুলকে দেওয়া হয়নি।