
কথাটা কানে একটু লাগল বটে, তবে অবিশ্বাস্য মনে হলো না। নাজমুল হোসেন যা বললেন, তাতে ভুলটা কোথায়! তারপরও ওই কানে লাগার ব্যাপারটি ঘটল অনভ্যস্ততার কারণে। বাংলাদেশ দলের কোনো টেস্ট অধিনায়ক বলবেন, প্রতিপক্ষ অমুক দলের চেয়ে আমাদের পেস বোলিং এগিয়ে—কয় বছর আগেও কি এটা ভেবেছেন কেউ!
আগামীকাল শুরু হচ্ছে মিরপুর টেস্ট, বাংলাদেশ–পাকিস্তান সিরিজে এবারের প্রথম। শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের মাঝমাঠে সবুজাভ উইকেট, যেটি গতকাল ছিল আরও সবুজ। সিরিজ কাভার করতে আসা পাকিস্তানের এক সাংবাদিকের যেন তাতে স্বস্তি। প্রেসবক্স থেকে মাঠের দিকে তাকিয়ে বলছেন, ‘কিছু ঘাস কি উড়ে গেল নাকি…!’ দুই অধিনায়কের সংবাদ সম্মেলনেও ঘুরেফিরে পেসারদের প্রসঙ্গ।
ঠিক এমন পরিবেশে দাবিটা করলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন, ‘ওরা যেভাবে বোলিং করছে…আমাদের পেস বোলিং অ্যাটাক হয়তো একটু এগিয়েই আছে গত কয়েক বছর ধরে।’ পেসারদের ওপর অধিনায়কের এমন আস্থার বড় কারণ অবশ্যই নাহিদ রানা। দুই বছর আগে রাওয়ালপিন্ডিতে সর্বশেষ সিরিজে পাকিস্তান তাঁকে দেখেছে। কয় দিন আগে ঘরের মাঠে সাদা বলে তাঁর সামনে কেঁপেছে নিউজিল্যান্ড।
বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের সঙ্গে অন্য যেকোনো দেশের পেস বোলিংয়ের তুলনামূলক ছবিতে নাহিদই এখন বড় পার্থক্য এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাহসও। পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনায় যেমন নাজমুল আজ বলেছেন, ‘নাহিদকে (রানা) আমি একদম ছোট থেকে চিনি। আমি জানি, আসলে ও কী চিন্তা করে বা ও কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করে। ওর মতো এক্সপ্রেস পেস বোলার দলে থাকাটা অধিনায়কের জন্য বাড়তি সুবিধা।’
বাংলাদেশ টেস্ট অধিনায়কের পেস–আস্তিনে থাকা বাকি তিনটি নাম—এবাদত হোসেন, তাসকিন আহমেদ ও শরীফুল ইসলাম। তাঁদের কারও সামর্থ্য নিয়েই প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। হ্যাঁ, চোট–আঘাতের সঙ্গে লড়তে হয় বলে তাসকিনকে নিয়ে একটা সংশয় তো থাকেই। তার ওপর টেস্ট ক্রিকেটে তিনি নেই দেড় বছর ধরে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে গোড়ালিতে সমস্যা বোধ করেছিলেন। এরপর এবারই প্রথম ফিরছেন সাদা পোশাকের ক্রিকেটে। সামনে টেস্ট আছে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। তাসকিনকে তাই এখন থেকেই লাল বলের খেলায় রাখাটা জরুরি মনে করছে টিম ম্যানেজমেন্ট।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তাঁর সর্বশেষ সিরিজে এক ইনিংসে তাসকিনের ৬ উইকেট ছিল। পাকিস্তান সিরিজে কি সেখান থেকেই ব্যাটনটা ধরতে পারবেন তিনি? অধিনায়ক কিন্তু আশাবাদী। ‘তাসকিন সব সময় টেস্ট ক্রিকেটটা খেলতে চায়।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ফিটনেস বলেন বা ইনজুরি বা ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট—এগুলোর দিকে খেয়াল রাখতে গিয়ে সব সময় আমরা তাকে নিতে পারি না’, বলে নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেও নাজমুলের কথা, ‘…তবে এই টেস্টের আগে ট্রেনার ও ফিজিওর সঙ্গে অনেক লম্বা আলোচনা হয়েছে এবং সে খেলার জন্য ফিট। তার সর্বশেষ সিরিজেও সে খুব ভালো খেলেছে।’
দুই দলের পেস বোলিংয়ের তুলনা এবং এ প্রসঙ্গে নাজমুলের নিজেদের পেসারদের এগিয়ে রাখা; এসব প্রসঙ্গ পাকিস্তান অধিনায়ক শান মাসুদের সামনেও আনা হয়েছিল। তবে এমন ‘উসকানিমূলক’ প্রশ্নেও বরাবরের মতো বিনয়ী মাসুদ শুধু বললেন, ‘প্রতিটি দলেরই নিজস্ব শক্তি আছে। আমরা আমাদের নিজেদের দক্ষতার দিকেই মনোযোগ দিতে চাই এবং নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়গুলো বিচার করতে চাই।’
তুলনায় না গেলেও পরে আরেক প্রশ্নে শান মাসুদের কণ্ঠে বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের প্রশংসা শোনা গেছে, ‘তাদের বোলিং আক্রমণ খুবই ভালো; আমার চোখে সম্ভবত এটাই তাদের সেরা পেস আক্রমণ। তুলনায় যেতে চাই না। কারণ, উভয় দলেই ভালো খেলোয়াড় আছে। এর আগে পাকিস্তানে তাদের বিপক্ষে যখন খেলেছিলাম, তখনকার অবস্থার সঙ্গেও মিল আছে।’
আর পাকিস্তানের পেস আক্রমণ? নিজেদের এগিয়ে রেখেও তাদের প্রতি সমীহ দেখিয়েছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল, ‘দুই দলেরই ভালো পেস আক্রমণ আছে। আর পাকিস্তান তো সব সময়ই ওদের পেস বোলিংয়ের জন্য বিখ্যাত।’
নতুন বলে সুইং, তীক্ষ্ণ গতি আর টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের দ্রুত আউট করার সামর্থ্য নিয়ে শাহিন শাহ আফ্রিদিই এখনো সেই আক্রমণে মূল স্ট্রাইক বোলার। নিখুঁত লাইন-লেংথ এবং ধারাবাহিকভাবে এক জায়গায় বল ফেলে যাওয়ার সামর্থ্য মূল শক্তি মোহাম্মদ আব্বাসের।
পেস–সহায়ক উইকেটে তাঁকে সামলানোটা একটু কঠিনই হয় ব্যাটসম্যানদের জন্য। সদ্য সমাপ্ত পিএসএলে ধারাবাহিক উইকেট নিয়ে আবারও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন আরেক পেসার হাসান আলী। আর এখন পর্যন্ত ৬টি টেস্ট খেলা খুররম শেহজাদের বড় গুণ টানা বোলিং করে যেতে পারা।
উইকেটে ঘাস যদি আর না কমে এবং প্রত্যাশা অনুযায়ী যদি তা ‘স্পোর্টিং’ আচরণই করে, মিরপুর টেস্ট হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পেসারদের শক্তি প্রদর্শনের লড়াই। নাজমুলের কথাটাকে কি সেখানে সত্যি প্রমাণ করতে পারবেন নাহিদ–তাসকিনরা?