বাংলাদেশের মাটিতে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের সুখস্মৃতি নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে নিউজিল্যান্ড
বাংলাদেশের মাটিতে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের সুখস্মৃতি নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে নিউজিল্যান্ড

১৫ বছর পর দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের কাছে ওয়ানডে সিরিজ হার বাংলাদেশের

‘প্রি ম্যাচ শো’ করে মাঠ থেকে কমেন্ট্রি বক্সে যাচ্ছিলেন নিউজিল্যান্ডের সাবেক পেসার মিচেল ম্যাকক্লেনাহান। ততক্ষণে বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের তৃতীয় ওয়ানডে ম্যাচের টস হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের একাদশে একাধিক পরিবর্তন দেখার পর থেকেই তিনি বেশ অবাক। এক সিরিজে বাংলাদেশ দলের এত পরিবর্তন, তার ওপর বিশ্বকাপ দল নিয়ে নাটক—লিফটে উঠতে উঠতে এসব খবর শোনার পর তাঁর প্রতিক্রিয়াটা ছিল এমন, ‘পাগলামি ছাড়া তো কিছুই মনে হচ্ছে না।’

নিউজিল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলছে বাংলাদেশ, কিন্তু খেলায় কারও মনোযোগই নেই। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের মূল মাঠে তাকানোর চেয়ে বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের কক্ষে কে এল, কে গেল, তা নিয়েই বেশি আলোচনা প্রেস বক্সে। এর মধ্যেই মাঠে যে খেলাটা হলো, সেটা নিয়েও গর্ব করার কিছু নেই। সিরিজ বাঁচাতে হলে বাংলাদেশকে জিততেই হতো।

ম্যাচ শেষে হেনরি নিকোলসের সঙ্গে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক নাজমুল হোসেনের করমর্দন

এমন ম্যাচে আরও একবার ব্যাটিং–ধস দেখল মাঠভর্তি মিরপুর। মাত্র ৩৪.৩ ওভারে বাংলাদেশ অলআউট ১৭১ রানে। ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক নাজমুল হোসেন সর্বোচ্চ ৭৬ রান করেন।

এই জয়ে ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশের মাটিতে প্রথমবার ওয়ানডে সিরিজ জিতল কিউইরা। তিন ম্যাচের সিরিজটা নিউজিল্যান্ড জিতল ২–০ ব্যবধানে। এ বছর ঘরের মাঠে বাংলাদেশের তৃতীয় ওয়ানডে সিরিজ হার এটি। ইংল্যান্ড, আফগানিস্তানের পর এবার নিউজিল্যান্ডও বাংলাদেশে এসে ওয়ানডে সিরিজ জিতে গেল। সেটাও খুব সহজে।

১৭২ রানের লক্ষ্য ছুঁতে গিয়ে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের শুধু শরীফুল ইসলামের প্রথম স্পেলটা দেখেশুনে পার করতে হয়েছে। নতুন বলে এই বাঁহাতি পেসার আগুনে বোলিংয়ে টানা ২ বলে ফিন অ্যালেন (২৮) ও ডিন ফক্সক্রফটের (০) উইকেট তুলে নেন।

সে স্পেলটা পার করার পর নিউজিল্যান্ডকে বেশি কিছু করতে হয়নি। ওপেনার উইল ইয়াং নিউজিল্যান্ডের ইনিংসটা টেনে নেন ১৩০ রান পর্যন্ত। নাসুম আহমেদের দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে আউট হওয়ার আগে ইয়াংয়ের ব্যাট থেকে আসে ৮০ বলে ৭০ রান। ১০টি চার ও ১টি ছক্কা ছিল তাতে। বাকি কাজটা করেছেন হেনরি নিকোলস (৮৬ বলে ৫০ রান) ও টম ব্লান্ডেল (১৬ বলে ২৩ রান)। নিউজিল্যান্ড লক্ষ্যটা পেরিয়ে যায় ৩৪.৫ ওভারে ৭ উইকেট হাতে রেখেই।

কিউইদের উইকেট উদ্‌যাপন

যে যুগলবন্দী দেখা গেল নিউজিল্যান্ড ইনিংসে, সেটার অভাবই ভুগিয়েছে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের ইনিংসে যা করার একাই করেছেন ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক নাজমুল। চোট থেকে ফেরা এই বাঁহাতি তিনে নেমে ৮৪ বল খেলে করেছেন ৭৬ রান, ১০টি চার ছিল তাঁর ইনিংসে। অভিষেক ম্যাচে ১ রান করে আউট হওয়া জাকির হাসান আউট হওয়ার পর দ্বিতীয় ওভারে উইকেটে আসা নাজমুল ফিরেছেন ৩২তম ওভারে সপ্তম ব্যাটসম্যান হিসেবে দলকে ১৬৮ রানে রেখে। এরপর তাঁর দল টিকেছে আর মাত্র ৩.১ ওভার, যোগ করেছে মাত্র ৩ রান।

নাজমুল তাঁর সর্বশেষ দুই ইনিংসেও ফিফটি করেছিলেন। লাহোরে এশিয়া কাপের ম্যাচে আফগানিস্তানের বিপক্ষে তাঁর ব্যাট থেকে আসে ১০৪ রান, এর আগের ম্যাচে পাল্লেকেলেতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিনি খেলেছেন ৮৯ রানের ইনিংস। আজকের ইনিংসটির গুরুত্বটা অন্যরকম। অধিনায়ক হিসেবে অভিষেক ম্যাচেই ফিফটি করা বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের তালিকায় হাবিবুল বাশার ও সাকিব আল হাসানের পর নাজমুলের নামটাও আজ যোগ হলো। তবে অধিনায়কত্বের অভিষেকে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ইনিংসটা নাজমুলেরই।

নাজমুল যখন ক্রিজে আসেন, তখন বাংলাদেশের রান ৬। ২ রান যোগ হতে না হতেই তিনি হারান আরেক ওপেনার তানজিদ হাসানকে। ট্রেন্ট বোল্ডের আউট সুইংয়ে ব্যাট ছুঁইয়ে স্লিপে ক্যাচ তোলেন এই বাঁহাতি। চারে নামা তাওহিদ হৃদয়ের সঙ্গেও নাজমুলের জুটিটা দীর্ঘ হয়নি। ক্রিজে এসেই দ্রুত ১৭ বলে ১৮ রান যোগ করেন তাওহিদ। কিন্তু তিনি দারুণ শুরুর পরও খেই হারান আলগা শট খেলে। অ্যাডাম মিলনের ফুল লেংথের বলে স্কয়ার ড্রাইভ করে পয়েন্টে সহজ ক্যাচ তোলেন তিনি।

ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক নাজমুল ছাড়া বাংলাদেশের কেউ বড় ইনিংস খেলতে পারেননি

৩৫ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ দল তখন আরও একটি ব্যাটিং বিপর্যয়ের দুয়ারে। মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে ৫৩ রান যোগ করে তা কিছুটা সামাল দেন নাজমুল। কিন্তু ফার্গুসনের মাঝের ওভারের আগুনে বোলিং সামলাতে পারেননি মুশফিক। কিউই অধিনায়কের বাড়তি বাউন্সার মেশানো একটি বল ঠেকালেও তা মাটিতে পড়ে স্টাম্পের দিকে যায়। পা দিয়ে বল সরানোর চেষ্টা করেও পারেননি মুশফিক। ২৫ বলে ১৮ রান করা মুশফিকের ইনিংসের থামে এভাবেই।

নাজমুলকে সঙ্গ দিয়েছেন আরেক অভিজ্ঞ মাহমুদউল্লাহও। তবে সেটা বেশিক্ষণের জন্য নয়। দুজন মিলে ৪৯ রান যোগ করে বিচ্ছিন্ন হন। মিলনের বলে কট বিহাইন্ড হওয়ার আগে ২৭ বলে ২১ রান করেছেন মাহমুদউল্লাহ। ছোট্ট ইনিংসটির সৌজন্যে ওয়ানডেতে চতুর্থ বাংলাদেশি হিসেবে পাঁচ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন এই অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। বাংলাদেশের রান তখন ৫ উইকেটে ১৩৭। এরপর বাংলাদেশ দলের লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যানদের কেউই বলার মতো কিছু করতে পারেননি।