
বৈচিত্র্য—বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি এখন এটাই। নতুন বলে বোলিং দরকার? শরীফুল–তাসকিন–হাসান মাহমুদরা আছেন। ডেথ বোলিংয়ে মোস্তাফিজুর রহমান তো থাকবেন পৃথিবীর সেরাদের তালিকায়ও। এত দিন বাংলাদেশের জন্য একটা চিন্তার জায়গা ছিল মাঝের ওভারের বোলিং। মাঝে কিছুদিন মাঝের ওভারে ভরসা জুগিয়েছেন ইবাদত হোসেন। ২০২৩ সালে চোটে পড়ে ইবাদত ছিটকে যাওয়ার পর আর এই জায়গায় ভরসা করার মতো কাউকে পাওয়া যায়নি।
তবে এবারের পাকিস্তান সিরিজে সে দুশ্চিন্তাও কেটে যাওয়ার আভাস মিলেছে সাদা বলের ক্রিকেটে নাহিদ রানার নতুন আবির্ভাবে। মোস্তাফিজ–তাসকিনদের শুরুর পর গতি আর বাউন্সে ব্যাটসম্যানদের নাজেহাল করে মাঝের ওভারে তিনি উইকেট এনে দিয়েছেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে ৮ উইকেট নিয়ে তানজিদ হাসানের সঙ্গে যৌথভাবে হয়েছেন সিরিজ সেরাও।
বাংলাদেশের পেসারদের এমন পারফরম্যান্স অবশ্য কয়েক বছর ধরেই। সর্বশেষ চার বছরে বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডে খেলেছেন ১০ জন পেসার। ৬৭ ম্যাচে তাঁরা ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন ৫.৪৬ গড়ে। টেস্ট খেলুড়ে দেশের মধ্যে এই সময়ে বাংলাদেশের পেসারদের চেয়ে ওভারপ্রতি কম বোলিং গড় আছে শুধু অস্ট্রেলিয়ার।
মাঠের বাইরে নিজেদের মধ্যে ভালো বোঝাপড়াটাই পেসারদের জোটবদ্ধ শক্তিটাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। মাঠের পারফরম্যান্সে পড়ছে যার ইতিবাচক প্রভাব। তবে তাঁদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জও অনেক। বাংলাদেশ দল এ বছর আরও ১৯টি ওয়ানডে খেলবে, যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ ২০২৭ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার জন্য। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপেও আছে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। এ বছর অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় দুটি করে মোট চারটি টেস্ট খেলবে বাংলাদেশ। সিরিজগুলোতে প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট নেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় জুটি ভাঙতে পেসারদের কাছেই থাকবে প্রত্যাশা।
কঠিন এই পরীক্ষা সামনে রেখে পেসারদের জন্য সাবেক পেসার ও বর্তমানে বিসিবির পেস বোলিং কোচ তারেক আজিজের পরামর্শ, ‘আমাদের পেসারদের সব ধরনের উইকেটে মানিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য বাড়াতে হবে। দলের ভেতর ভূমিকাটা ঠিক করে দেওয়া এবং সেটার জন্য তৈরি হতে হবে। কী করতে হবে, তা যেন তাদের স্পষ্টভাবে জানা থাকে।’
পেসাররা বাইরে গিয়ে কেমন করে, তা দেখতে হবে। ভারতের উইকেট ভিন্ন ধরনের হবে। দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে আবার আপনাকে লেন্থ বদলাতে হবে। কারণ, ওখানে বল অনেক ফ্লাই করে। একেক জায়গায় একেক রকম চ্যালেঞ্জ থাকে, ওরা কীভাবে মানিয়ে নেয় তা গুরুত্বপূর্ণ।তারেক আজিজ, বিসিবির পেস বোলিং কোচ
যেকোনো পেসারের জন্য চারটি ধাপ মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তারেক—টেকনিক্যাল উন্নতি, টেকটিক্যাল সিদ্ধান্ত নিতে পারা, মানসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও শারীরিকভাবে নিজেকে বুঝতে পারা। এসব ধরে রাখতে পারলে পেসাররা ধারাবাহিকভাবে ভালো করবেন বলে বিশ্বাস এই কোচের।
মিরপুরে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ খেলেছে স্পোর্টিং উইকেটে। ভবিষ্যতেও ঘরের মাঠে এমন উইকেটেই খেলার পরিকল্পনা বিসিবির। দেশের বাইরের সিরিজের কথা বিবেচনা করেই এই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত। বিসিবির আরেক পেস বোলিং কোচ ও জাতীয় দলের সাবেক পেসার তালহা জুবায়ের মনে করেন, বাংলাদেশের বোলারদের মূল চ্যালেঞ্জটা হবে দেশের বাইরের সিরিজগুলোতেই, ‘পেসাররা বাইরে গিয়ে কেমন করে, তা দেখতে হবে। ভারতের উইকেট ভিন্ন ধরনের হবে। দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে আবার আপনাকে লেন্থ বদলাতে হবে। কারণ, ওখানে বল অনেক ফ্লাই করে। একেক জায়গায় একেক রকম চ্যালেঞ্জ থাকে, ওরা কীভাবে মানিয়ে নেয় তা গুরুত্বপূর্ণ।’
পেসারদের নিজেদের ফিট রাখাটাও তাই গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে। কয়েক বছর ধরে অবশ্য পেসারদের ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টটা ভালোভাবেই করছে বিসিবি। জাতীয় দল ও স্থানীয় কোচ–ফিজিও–ট্রেনাররা আলাদা করে পেসারদের ডেটা সংরক্ষণ করছেন। কে কত ওভার বল করলেন, কার কখন বিশ্রাম দরকার—সবই আছে তাঁদের ল্যাপটপে।
পাশাপাশি পেসারদের নিজেদেরও ফিটনেস নিয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন পেস বোলিং কোচ ও জাতীয় দলের সাবেক পেসার নাজমুল হোসেন, ‘ম্যানেজমেন্ট পরামর্শ দেবে, কিন্তু খেলোয়াড়দেরও নিজেদের নিয়মের মধ্যে আনতে হবে। যদি সিরিয়াস না হয়, সচেতন না থাকে, নিজের শরীরকে বুঝতে না পারে—তাহলে ধাক্কাটা তার ওপরই আসবে।’
একসময় নির্বাচক হিসেবে বর্তমানে জাতীয় দলে খেলা পেসারদের খুব কাছ থেকে দেখেছেন হাবিবুল বাশার। সামনে প্রধান নির্বাচকেরও দায়িত্ব নিতে পারেন তিনি। হাবিবুল মনে করেন, পেসারদের উইকেট নেওয়ার সামর্থ্যই এখন বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখছে। তবে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা মাথায় রেখে এখন থেকেই বিকল্প বাড়ানোর পরিকল্পনা করার পরামর্শ তাঁর, ‘সামনের সিরিজগুলো সবই চ্যালেঞ্জিং। এ জন্য আমাদের বড় স্কোয়াড রাখাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সব সংস্করণে সবাই খেললে চোটের ঝুঁকি বাড়বে, আবার সেরা পারফরম্যান্সও পাওয়া যাবে না।’