
টস হবে, অথচ দুই অধিনায়ক হাত মেলাবেন না। কেউ কারও দিকে তাকাবেন না পর্যন্ত। এক সময় যা বললে অদ্ভুত শোনাত, ভারত-পাকিস্তানের কল্যাণে ক্রিকেটে এই দৃশ্য এখন পরিচিত হয়ে গেছে।
২০২৫ এশিয়া কাপে যেটির শুরু, সেটির ধারাবাহিকতা চলেছে ২০২৬ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপেও। টসের সময় দুই অধিনায়কের করমর্দন হয়নি, ম্যাচ শেষে ‘এতক্ষণ মাঠে যা যা হয়েছে, তা শুধুই খেলা’ বার্তা দেওয়া দুই দলের সদস্যদের পরস্পরের সঙ্গে হাত মেলানোও। পরিস্থিতি যা, তাতে আরও অনেক দিন এমনই হবে বলে ধরে নেওয়া যায়।
সবকিছুই যেহেতু শেষ হয়, রাজনৈতিক বৈরিতাকে মাঠে টেনে আনার এই অপসংস্কৃতিও হয়তো শেষ হবে একদিন। ভবিষ্যতে কোনো এক ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে টসের সময় দুই অধিনায়ক হাত মেলাবেন। খুবই স্বাভাবিক, অনুল্লেখযোগ্য সেই ঘটনাও হয়ে উঠবে সংবাদ শিরোনাম।
এই যে ভারত-পাকিস্তান, ভারত-পাকিস্তান লিখে যাচ্ছি, এতে পাকিস্তান আপত্তি তুলতে পারে। এই ‘করমর্দন–বিতর্কে’ পাকিস্তানের তো কোনো দায় নেই। হাত না মেলানোর এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরিই ভারতের। সেটি কী কারণে, তাতে না-ই বা গেলাম। আপনি তা জানেন বলেই ধরে নিচ্ছি।
সেই কারণটা যৌক্তিক কিনা, সেই আলোচনাতেও যেতে চাইছি না। একই ঘটনা একেক দৃষ্টিকোণ থেকে একেক রকম মনে হয়। এটা বোঝার জন্য আপনাকে আকিরা কুরোসাওয়ার রাশোমন সিনেমাটা দেখতেই হবে, এমনও নয়। ঘটনা এখানে এত জটিল বলেও মনে হয় না। ভারত যা করছে, সেটি ঠিক না বেঠিক—সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার তাই আপনার ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।
তবে এটি যে খেলার মূল সুরের সঙ্গে যায় না, স্পোর্টিং স্পিরিট বা খেলোয়াড়ি চেতনার পরিপন্থী—এতে মনে হয় সবাই দ্রুত একমত হয়ে যাবেন। দাঁড়ান, দাঁড়ান, একমত হওয়ার আগে জর্জ অরওয়েলের বহুল উদ্ধৃত সেই বাণীটা মনে করিয়ে দিই। অ্যানিমেল ফার্ম ও নাইনটিন এইটি ফোর উপন্যাসের লেখক খেলা নিয়ে খুব বেশি লেখেননি। তারপরও তাঁর একটা উক্তি খেলা নিয়ে লেখায় হরহামেশাই উদ্ধৃত হয়। সেটি কী? সরল করে বললে, অরওয়েলের মতে ‘সিরিয়াস স্পোর্টস ইজ ওয়ার মাইনাস শুটিং।’
জর্জ অরওয়েলের এই উপসংহারে পৌঁছানোর কারণ বুঝতে পুরো অনুচ্ছেদটাই তুলে দিতে হয়, ‘সিরিয়াস স্পোর্টস হ্যাজ নাথিং টু ডু উইথ ফেয়ার প্লে। ইট ইজ বাউন্ড আপ উইথ হ্যাট্রেড, জেলাসি, বোস্টফুলনেস, ডিসরিগার্ড অব অল রুলস অ্যান্ড স্যাডিস্টিক প্লেজার ইন উইটনেসিং ভায়োলেন্স: ইন আদার ওয়ার্ডস ইট ইজ ওয়ার মাইনাস শুটিং।’
‘দ্য স্পোর্টিং স্পিরিট’ শিরোনামে জর্জ অরওয়েলের যে লেখা থেকে এই অনুচ্ছেদ, সেটি তিনি লিখেছিলেন ব্রিটেনের ট্রিবিউন সংবাদপত্রে। অরওয়েল ছিলেন পত্রিকাটির সাহিত্য সম্পাদক। ‘অ্যাজ আই প্লিজ’ নামে নিয়মিত কলাম লিখতেন। খেলা নিয়ে লেখা এই কলামের পটভূমি ছিল ১৯৪৫ সালে শীতল যুদ্ধের সময়ে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ফুটবল ক্লাব ডায়নামো মস্কোর যুক্তরাজ্য সফর। সেটিকে ঘিরে তিক্ততার প্রবাহ দেখেই জর্জ অরওয়েলের এই উপলব্ধি। অরওয়েল শৌখিন খেলায় কোনো সমস্যা দেখেননি। কিন্তু তাঁর বক্তব্য ছিল, খেলাটা যখন এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের, তখন আর সেটি আর নিছক খেলা থাকে না, পরিণত হয় যুদ্ধে; পার্থক্য বলতে শুধু গোলাগুলিটাই হয় না।
ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে এই দুই দেশে যা হয়, তা দেখলে জর্জ অরওয়েলকে তাঁর দাবি প্রমাণ করতে প্রায় সাড়ে চৌদ্দ শ শব্দ ব্যয় করতে হতো না। শুধু এই উদাহরণটা দিলেই চলত। জাতিতে ইংলিশ জর্জ অরওয়েল অনুমিতভাবেই ক্রিকেট পছন্দ করতেন। ইংল্যান্ডের সঙ্গে ক্রিকেটের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর কিছু লাইন এমন অপূর্ব যে ক্রিকেট সাহিত্যের একনিষ্ঠ অনেক পাঠক তা মুখস্থ বলে যেতে পারেন। তবে ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট বৈরিতা তিনি দেখে যেতে পারেননি। তাঁর জীবদ্দশাতেই ভারত-পাকিস্তান আলাদা দেশ হয়েছে। তবে ক্রিকেট মাঠে ভারত-পাকিস্তান ‘দ্য গ্রেট রাইভারলি’র শুরু অরওয়েল পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রায় তিন বছর পর।
শুরুটাই এমন ছিল যে এখন বলতে হয় প্রভাতি সূর্য ঠিকঠাক পূর্বাভাসই দিয়েছিল। ১৯৫২ সালে ভারতে তিন টেস্টের সিরিজ। দিল্লিতে ভারত প্রথম টেস্ট জেতার পর লখনৌতে দ্বিতীয় টেস্টে পাকিস্তান জিতে যায়। স্বাগতিক দর্শকদের রুদ্ররোষ থেকে কোনোমতে বেঁচে যায় ভারতীয় দল। মুম্বাইয়ের তৃতীয় টেস্টে জয়ে তাই আনন্দের চেয়ে স্বস্তিই বেশি ছিল।
ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার কথাই ধরুন না। এটা তো ক্রিকেটের সবচেয়ে পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার নাম। অ্যাশেজ এখনো ওই দুই দেশের মানুষের কাছে ‘হোলি গ্রেইল’। একটা শেষ হতে না হতেই পরেরটির জন্য অপেক্ষা শুরু হয়ে যায়। মাঠের বাইরে কথার তীব্র লড়াই চলে, দুই দল মাঠে নামে ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচ্যগ্র মেদিনী’ প্রতিজ্ঞায় শাণিত হয়ে। তবে সেটি খেলার মধ্যেই থাকে। ভারত-পাকিস্তানে যেখানে অবশ্যম্ভাবীভাবে মিশে যায় রাজনীতি।
লখনৌয়ের ওই ঘটনাই দুই দলকে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের অর্থ বুঝিয়ে দিয়েছিল। সে কারণে ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানে এবং ১৯৬১ সালে ভারতে পরের দুটি সিরিজ এমন সাবধানী ব্যাটিংয়ের সাক্ষী হয়ে থাকে যে নিষ্প্রাণ বিরক্তকর ড্র হয় দুই সিরিজের পাঁচ-পাঁচ দশটি টেস্টই।
এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের খেলা হলে সেটি যে আর খেলা থাকে না, ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ তাই শুরু থেকেই এর প্রমাণ দিয়ে আসছে। সম্প্রতি আরও বেশি। নির্দিষ্টভাবে ‘ক্রিকেট ম্যাচ’ কথাটা উল্লেখ করার কারণ আছে। ভারত-পাকিস্তান অন্য খেলাতেও তো মুখোমুখি হয়। তাতে বাড়তি কিছু মসলাও হয়তো যোগ হয়, তবে ক্রিকেটের মতো তা এমন ফুলকি ছড়ায় না। ছড়িয়ে দেয় না যুদ্ধের আবহও।
ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার কথাই ধরুন না। এটা তো ক্রিকেটের সবচেয়ে পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার নাম। অ্যাশেজ এখনো ওই দুই দেশের মানুষের কাছে ‘হোলি গ্রেইল’। একটা শেষ হতে না হতেই পরেরটির জন্য অপেক্ষা শুরু হয়ে যায়। মাঠের বাইরে কথার তীব্র লড়াই চলে, দুই দল মাঠে নামে ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচ্যগ্র মেদিনী’ প্রতিজ্ঞায় শাণিত হয়ে। তবে সেটি খেলার মধ্যেই থাকে। ভারত-পাকিস্তানে যেখানে অবশ্যম্ভাবীভাবে মিশে যায় রাজনীতি। ক্রিকেটকে বারবার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দেখে চর্যাপদের কবির অমৃত বচন মনে পড়ে যায়, অপনা মাঁসে হরিণা বৈরী। এই উপমহাদেশে ক্রিকেটের তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তাই হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় শত্রু। নইলে কেন শুধু দ্বিপক্ষীয় ক্রিকেট সিরিজই বন্ধ থাকে, অন্য খেলায় দিব্যি ভারত-পাকিস্তান সফর বিনিময় হয়!
জর্জ অরওয়েলের কথাকে সত্যি প্রমাণ করে এই উপমহাদেশে ক্রিকেট অনেক দিনই আর শুধু খেলা নেই। এটি হয়ে উঠেছে জাতীয়তাবাদী অহংবোধ উসকে দেওয়ার এক উপলক্ষ। সেটিকেও ছাপিয়ে গিয়ে প্রায়ই যা রূপ নেয় জিঙ্গোইজমে। ভারত-পাকিস্তানের সঙ্গে অবশ্যই তুলনা চলে না। তবে এটা তো আর মিথ্যা নয় যে, বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট ম্যাচও বেশ কিছুদিন ধরে একই পথে হাঁটতে শুরু করেছে। তিক্ততা আর উগ্রতার মিশেলে যা ছড়িয়ে দিচ্ছে জাতিগত বিদ্বেষ। টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের সর্বশেষ আসর যেটির তুঙ্গ রূপ দেখেছে। ব্যতিক্রম বলতে এবার তা কোনো ক্রিকেট ম্যাচকে ঘিরে হয়নি।
পুনরাবৃত্তির ভয় থেকে ঘটনার বিস্তারিত বলছি না। তবে একটু তো মনে করিয়ে দিতে হয়ই। ভারত-পাকিস্তান যে বৈরিতা নিয়ে এত কথা বলা হলো, তা দীর্ঘ ভূমিকার মতো মনে হলেও এই লেখায় মনে হয় সেটির প্রয়োজন ছিল। এই বৈরিতার সঙ্গে যে জড়িয়ে গেছে বাংলাদেশও। শুরুতে এমন ত্রিদেশীয় না হয়ে সমস্যাটা বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যেই ছিল। সেখানেও ক্রিকেটের চেয়ে ক্রিকেটের বাইরের উপাদানেরই বেশি ভূমিকা। উগ্রবাদী কিছু গোষ্ঠীর দাবির কাছে নতি স্বীকার করে বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত যেমন ক্রিকেটীয় ছিল না, তেমনি এর প্রতিবাদে বাংলাদেশের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তও না। দুটিতেই মিশে ছিল রাজনীতি।
বাংলাদেশের দাবির প্রতি পাকিস্তানের সমর্থনও কি তা নয়! এই সমর্থন যতটা না বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে, তার চেয়ে অনেক বেশি ভারত–বিরোধিতা থেকে। বাংলাদেশ ইস্যুকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান তাদের হাতের একমাত্র কার্ডটাই খেলেছে। যেকোনো আইসিসি টুর্নামেন্টে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হলো সোনার ডিম পাড়া হাঁস। যে কারণে পাকিস্তান ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের হুমকি দেওয়ার পর থেকে টাকা–পয়সার হিসাবই শুধু শুনেছেন। এই ম্যাচ না হলে কত টাকা ক্ষতি, শুনেছেন সেটির সবিস্তার বিবরণ। যেন খেলার আসল উদ্দেশ্যই হলো টাকা।
পাকিস্তানের এই হুমকি যে শুধুই ফাঁকা বুলি, শেষ পর্যন্ত তারা ঠিকই সুড়সুড় করে ভারতের বিপক্ষে খেলতে নামবে—এই ভবিষ্যদ্বাণী যাঁরা করেছিলেন, পরে তাঁরা ‘কী, আগেই বলেছিলাম না’ বলে মুচকি হেসেছেন। মাঝখান থেকে বাংলাদেশের একটি বিশ্বকাপ খেলা হয়নি। সে জন্য অবশ্য পাকিস্তানকে দোষ দেওয়া ঠিক হবে না। পাকিস্তান তো আর বাংলাদেশকে ভারতে গিয়ে খেলতে বারণ করেনি। উল্টো ওই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বিশ্ব–ক্রিকেটে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়া বাংলাদেশকে একটু সাহস দিয়েছে। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই বেশ উত্তেজনা উপহার দিয়ে সংবাদমাধ্যম সরগরম করে রেখেছে। ইউটিউবারদের অনেক কনটেন্ট তৈরিতেও সাহায্য করেছে।
থাক, এমন সিরিয়াস বিষয় নিয়ে রসিকতা করা ঠিক নয়। বরং মৌলিক দুটি প্রশ্ন তুলি। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ না হলেই যদি ক্রিকেট-অর্থনীতি ধসে পড়ে, একটিমাত্র ম্যাচের ওপর এমন নির্ভরশীলতা কি কোনো খেলার জন্য ভালো কথা? আরেকটি প্রশ্ন, ভারত যদি কোনো বিশ্বকাপে খেলার জন্য বাংলাদেশের মতো এমন কোনো শর্ত দিত, আইসিসি কি তা এভাবে অগ্রাহ্য করতে পারত, ভারতকে বাদ দিয়েই হতো কোনো বিশ্বকাপ?
প্রশ্ন দুটির উত্তর মনে হয় না কারও অজানা। জানা কথা বলার দরকার দেখছি না। এর চেয়ে বরং ভারত-পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাস কোথায় কোথায় ছেদ করেছে, সেদিকে চোখ ফেরানো যাক। এমন তো নয় যে ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে তিন দেশের এমন জড়িয়ে যাওয়া এই টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপেই প্রথম।
বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা পেয়েছে ২০০০ সালে। কিন্তু এক অর্থে বাংলাদেশ তো এর আগেও টেস্ট খেলুড়ে দেশের অংশই ছিল। ১৯২৬ সালে অখণ্ড ভারত যখন টেস্ট স্ট্যাটাস পায়, তখন যেমন, তেমনি দেশভাগের পর পাকিস্তান টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার সময়ও। পাকিস্তান প্রথম হোম টেস্টও খেলেছে এই ঢাকাতেই।
বাংলাদেশ প্রথম এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে পাকিস্তানের সঙ্গে। ভারতের সঙ্গে প্রথম টেস্ট ম্যাচ। এমন কোনো অজানা তথ্য নয়। অস্বাভাবিক কিছুও নয়। এই তিন ভূখণ্ড একসময় অখণ্ড এক দেশ ছিল, এটা মনে রাখলে তো আরও নয়। উপমহাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে অনেক কিছুতেই এই তিন দেশের অংশীদারত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এগিয়ে থাকাও। সাম্রাজ্য বিস্তারের নেশায় ব্রিটিশরা যেখানেই গেছে, ছড়িয়ে দিয়ে এসেছে ক্রিকেটের বীজ। এই উপমহাদেশেও তা-ই। ব্রিটিশদের নিজেদের মধ্যকার খেলার কথা বাদ দেওয়াই ভালো। স্থানীয়দের ক্রিকেট খেলার কথা ধরলে সেই ইতিহাসের নাড়ি পোঁতা বাংলাদেশের ময়মনসিংহে। কটিয়াদী থানার মসুয়া গ্রাম অবশ্য এখন কিশোরগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত। সেখানেই ‘বাংলার ক্রিকেটের ডব্লু জি গ্রেস’ নামে খ্যাতিমান সারদারঞ্জন রায়ের উদ্যোগে প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ হয়েছিল বলে জানা যায়। বিভিন্ন সূত্রে সময়টা ১৮৫৮ সাল বলেই জেনে এসেছি। সারদারঞ্জনের আরেকটা পরিচয় বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর বড় ভাই। ক্রিকেট বনেদিয়ানায় এই বদ্বীপ তাই এগিয়ে থাকার দাবি তুলতেই পারে।
বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা পেয়েছে ২০০০ সালে। কিন্তু এক অর্থে বাংলাদেশ তো এর আগেও টেস্ট খেলুড়ে দেশের অংশই ছিল। ১৯২৬ সালে অখণ্ড ভারত যখন টেস্ট স্ট্যাটাস পায়, তখন যেমন, তেমনি দেশভাগের পর পাকিস্তান টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার সময়ও। পাকিস্তান প্রথম হোম টেস্টও খেলেছে এই ঢাকাতেই।
পাকিস্তান আমলে অন্য সব ক্ষেত্রের মতো ক্রিকেটেও পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ শোনা যায়। হয়তো তা মিথ্যাও নয়। এ অঞ্চল থেকে মাত্র একজনই পাকিস্তানের পক্ষে টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছেন। সেই নিয়াজ আহমেদ সিদ্দিকী আবার ছিলেন অবাঙালি। জন্ম ভারতের বেনারসে। দেশভাগের পর অবশ্য ঢাকায় চলে এসে সে সময়কার পূর্ব পাকিস্তানকেই ঘরবাড়ি করে নিয়েছিলেন। পিডব্লিউডির প্রকৌশলী ছিলেন। ক্রিকেটও খেলেছেন এখানেই। মোটামুটি ব্যাটিং করতে পারলেও মূল পরিচয় ছিল পেস বোলার। বেশ কবার দ্বাদশ ব্যক্তি থাকার পর টেস্ট খেলেছেন দুটি। দুটিই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। প্রথমটি ১৯৬৭ সালে নটিংহ্যামে। দ্বিতীয়টি ১৯৬৯ সালে ঢাকায়। দুটিতেই তাঁর পাকিস্তান দলে অন্তর্ভুক্তিতে রাজনৈতিক কারণ ছিল বলে মনে করা হয়। দ্বিতীয়টিতে তো অবশ্যই। ঢাকার রাজপথ তখন পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল। এতটাই যে, ইংল্যান্ড দল ঢাকায় খেলতে আসার আগে অনেকবার ভেবেছে। তিনবার ব্যাটিং করতে নেমে তিনবারই অপরাজিত ছিলেন নিয়াজ। তবে মোট ১৭ রান আর ৩ উইকেট তাঁর দলভুক্তির সম্ভাব্য অন্য কারণকে নস্যাৎ করে দিতে পারেনি।
পূর্ব পাকিস্তান থেকে টেস্ট খেলা একমাত্র ক্রিকেটার বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানের করাচিতে চলে যান। ৫৪ বছর বয়সে মৃত্যুও সেখানেই, বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার মাস দুয়েক আগে।
সেই টেস্ট মর্যাদা পাওয়ায় ভারত-পাকিস্তানের বড় ভূমিকা ছিল। ১৯৯৯ সালে আইসিসির সভায় বাংলাদেশকে টেস্ট মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল পাকিস্তান, সমর্থন করেছিল ভারত। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড বিপক্ষে থাকায় সেবার হয়নি। পরের বছর আইসিসির পূর্ণ ও সহযোগী সব দেশের সর্বসম্মত ভোটে বাংলাদেশ ক্রিকেটের কুলীন পরিবারের সদস্য হয়ে যায়।
সব দেশই পক্ষে ভোট দিয়েছিল সত্যি, তারপরও বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল, এমন একজনের নাম বলতে হলে বলতে হবে জগমোহন ডালমিয়ার নাম। সাবের হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্ব ও সৈয়দ আশরাফুল হকের বিস্তৃত যোগাযোগ অবশ্যই ভূমিকা রেখেছিল। তবে নেপথ্যে ডালমিয়ার আশীর্বাদ না থাকলে বাংলাদেশের এত তাড়াতাড়ি টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া হতো কি না সন্দেহ।
বাংলাদেশের ক্রিকেট তাই ডালমিয়াকে মনে রাখতে বাধ্য। ভারতীয় ও বিশ্ব ক্রিকেটও। ক্রিকেটের বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে কথা বললে সবার আগে নাম করতে হয় এই ভারতীয় ক্রিকেট প্রশাসকের। এই যে আজ বিশ্ব–ক্রিকেটে ভারতের এমন দাপট, সেটির মূলে তো ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের ফুলেফেঁপে ওঠা কোষাগার। এখানেও ডালমিয়াই পথপ্রদর্শক। ক্রিকেটের আয়ের মূল উৎস টেলিভিশন সম্প্রচার স্বত্ব। এখন হয়তো কারও বিশ্বাস করতেও কষ্ট হবে, ডালমিয়া তৎপর হওয়ার আগে এই খাতে এক টাকাও পেত না ভারতীয় বোর্ড। বরং ভারতের খেলা দেখানোর জন্য রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দূরদর্শনকে উল্টো টাকা দিতে হতো।
ডালমিয়াই প্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ভারতীয় ক্রিকেটের টেলিভিশন সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করার উদ্যোগ নেন এবং প্রবল বাধার মুখে পড়েন। এত বছরের অধিকার কি দূরদর্শন আর সহজে ছেড়ে দিতে চাইবে! ঘটনা তাই আদালতে গড়ায়। সেই আইনি লড়াইয়ের জিতেই বদলে যায় ভারতীয় ক্রিকেটের চেহারা।
পরে আইসিসি থেকে রাজস্বের ভাগ বেশি পেয়ে আরও ধনী হয়েছে ভারতীয় বোর্ড, আইপিএলের কল্যাণে আরও বেশি। তবে বিসিসিআইয়ের রমরমা শুরু ডালমিয়ার সময়েই। আইসিসিকে আয়ের পথ দেখানোর কৃতিত্বও তো তাঁরই। প্রথম এশিয়ান হিসেবে বসেছেন আইসিসির শীর্ষ পদে। দায়িত্ব নেওয়ার সময় আইসিসির অ্যাকাউন্টে ছিল ১৭ হাজার পাউন্ড। তিন বছর পর দায়িত্ব ছাড়ার সময় ‘হাজার’-এর বদলে সেটি মিলিয়ন হয়ে গেছে। মানে ১৭ হাজার পাউন্ড থেকে ১৭ মিলিয়ন পাউন্ড। অঙ্কটা মতান্তরে ‘১৫’, তবে যেটিই ঠিক হোক না কেন, হাজারের মিলিয়ন হয়ে যাওয়া নিয়ে কোনো তর্ক নেই।
এশিয়াকে বিশ্ব ক্রিকেটের কেন্দ্রবিন্দু করে তোলার কাজটাও ডালমিয়ার হাতেই শুরু। ক্রিকেটের সেই শুরু থেকে ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়াই বাকি দেশগুলোর ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে এসেছে। রাজার খেলার কর্তৃত্ব ‘রাজা’দের হাতেই থেকেছে।
বাংলাদেশ অবশ্য জগমোহন ডালমিয়াকে মনে রাখবে অন্য কারণে। আইসিসির প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরই ক্রিকেটের বিশ্বায়নের যে স্লোগান তুলেছিলেন, বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পাওয়াটাকে বলতে পারেন তাঁর সেই প্রকল্পেরই অংশ। ঢাকায় একের পর এক আন্তর্জাতিক ম্যাচ বা টুর্নামেন্ট আয়োজন করে সেই ক্ষেত্র প্রস্তুত করার চিন্তাটাও ডালমিয়ারই মস্তিষ্কপ্রসূত। পরে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি নাম নেওয়া আইসিসি নকআউট বিশ্বকাপের প্রথম আসর হয়েছে ঢাকায়। সেটি ১৯৯৮ সাল। পরের বছর পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল। এর পরের বছরই আবার আইসিসির ক্রিকেট সপ্তাহের মূল আকর্ষণ এশিয়া বনাম অবশিষ্ট বিশ্ব প্রদর্শনী ম্যাচ। ডালমিয়া বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ-ভারতের ক্রিকেট সম্পর্কের এই অবনতি দেখে নির্ঘাত খুব কষ্ট পেতেন।
এশিয়াকে বিশ্ব ক্রিকেটের কেন্দ্রবিন্দু করে তোলার কাজটাও ডালমিয়ার হাতেই শুরু। ক্রিকেটের সেই শুরু থেকে ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়াই বাকি দেশগুলোর ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে এসেছে। রাজার খেলার কর্তৃত্ব ‘রাজা’দের হাতেই থেকেছে। মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব, সংক্ষেপে এমসিসি আর আইসিসি হয়ে থেকেছে প্রায় সমার্থক। দীর্ঘদিন এমসিসি আর আইসিসির অফিস ছিল অভিন্ন এবং সেটি এমসিসির মাঠ লর্ডসে। এমসিসির প্রেসিডেন্টই পদাধিকারবলে আইসিসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতেন। ১৯০৯ সালে প্রতিষ্ঠার সময় আইসিসির পূর্ণ রূপ যে ইম্পেরিয়াল ক্রিকেট কনফারেন্স ছিল, সেটিও অনেক কিছু বলে।
ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার এই আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন জগমোহন ডালমিয়া। সেই চ্যালেঞ্জে জেতায় বড় শক্তি ছিল তাঁরই বানানো শক্তিশালী এশিয়ান ব্লক। ১৯৮৭ সালে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের বাইরে বিশ্বকাপ নিয়ে আসায় তাঁর প্রচ্ছন্ন ভূমিকা ছিল, ভারত-পাকিস্তানে যৌথভাবে আয়োজিত সেই বিশ্বকাপ বাংলাদেশেও ঢেউ তুলে একধাক্কায় ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল। মাঝখানে একটা আসর বিরতি দিয়েই ১৯৯৬ সালে বিশ্বকাপের আবার উপমহাদেশে ফিরে আসায় ডালমিয়ার সবচেয়ে বড় অবদান।
ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সেবার আয়োজক হিসেবে যোগ হয়েছে শ্রীলঙ্কা। এখন শুনতে অবিশ্বাস্য শোনাবে, সহ-আয়োজকের প্রতি সংহতি জানাতে ভারত ও পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা এক দল হয়েও খেলেছে। ঘটনাটা হয়তো আপনার জানা আছে। জানা থাকলে পরের কয়েকটা লাইন পড়ার দরকার নেই। কারও না-ও জানা থাকতে পারে বলে সংক্ষেপে একটু বলি। বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র ১৪ দিন আগে কলম্বোতে স্মরণকালের ভয়াবহ এক বোমা হামলায় ৯১ জন মারা যান, আহত হন ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি। বাংলাদেশ যেমন নিরাপত্তাঝুঁকির কথা বলে গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে খেলতে যায়নি, সেবার অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজও তেমনি শ্রীলঙ্কায় খেলতে যেতে অস্বীকৃতি জানায়।
ওই বোমা হামলার পরও শ্রীলঙ্কা যে ক্রিকেট খেলার জন্য নিরাপদ, তা প্রমাণ করতে তড়িঘড়ি করে গড়া উইলস ভারত-পাকিস্তান একাদশ নামে একটা দল বিশ্বকাপ শুরুর আগে প্রীতি ম্যাচ খেলতে শ্রীলঙ্কায় যায়। কলম্বোতে শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ দলের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ভারত-পাকিস্তান যৌথ একাদশের হয়ে কারা খেলেছিলেন, তা জানার কৌতূহল হতেই পারে। শচীন টেন্ডুলকার, সাঈদ আনোয়ার, আমির সোহেল, মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন, ইজাজ আহমেদ, অজয় জাদেজা, রশিদ লতিফ, ওয়াকার ইউনিস, ওয়াসিম আকরাম, অনিল কুম্বলে ও আশীষ কাপুর। নামগুলো লেখা হয়েছে ব্যাটিং অর্ডার অনুযায়ী। অধিনায়ক ছিলেন মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন।
আজ যখন ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে অধিনায়কেরা টসের সময় হাত পর্যন্ত মেলান না, তখন এই দুই দেশের খেলোয়াড়দের এক দল হয়ে খেলাটা কেমন অবাস্তব লাগে, তাই না!