
বাবা চলে গিয়েছে...। বাড়ির মেজ ছেলেটার তখনো এটা বোঝার বয়স হয়নি। তখন থেকেই স্বামীকে হারিয়ে উত্তাল সাগরে জীবনের নাও ভাসিয়েছেন মা হামিদা বেগম। স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী হওয়ায় পারিবারিক অঙ্কের মারপ্যাঁচে জোটেনি কোনো সহায়-সম্বলও। তাই কোনো গতি না দেখে ছেলেদের মানুষ করতে এক হোটেলে রান্নাবান্নার কাজ নেন তিনি। আর যা-ই হোক, ছেলেদের মুখে তো তুলে দিতে হবে দুমুঠো ভাত। টিকিয়ে রাখতে হবে তাদের মানুষ করার স্বপ্ন। সেই মেজ ছেলের নাম মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান। চেনা চেনা লাগছে? ঠিকই ধরেছেন, এএফসি অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে তাঁর আত্মঘাতী গোলেই বাংলাদেশের ড্রয়ের স্বপ্নটা বিলীন হয়ে গিয়েছে চোখের নিমেষে। যে হারের শিরোনাম হয়েছে শেষ মিনিটের দুঃখগাথা। পুরোটা সময় বাংলাদেশের সীমান্ত দুর্দান্ত পাহারা দিলেও বেদনার মহাকাব্যে ‘ট্র্যাজিক হিরো’ তো আত্মঘাতী গোলদাতা ডিফেন্ডার আতিকই, যাঁর জীবনের গল্পটাও বিয়োগান্ত ঘটনায় ঠাসা।
কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাবাকে হারানো। শুধু কি বাবার আদরমাখা হাতই হারিয়েছিলেন আতিক! বাবার দ্বিতীয় ঘরের ছেলে হওয়ায় জীবনধারণের কোনো অবলম্বনই জোটেনি। ফুটবলার হওয়াটা তো দূরের কথা, দুমুঠো খেয়ে জীবন চালানোটাই ছিল অনেক কঠিন। মায়ের হার না-মানা মানসিকতায় অনেক সংগ্রামের বিনিময়ে লেখা হয়েছে তাঁর জীবনের বাঁকবদলের গল্পগুলো। ভাগ্যের কী লীলা, সে সংগ্রামের গল্পই দুশানবের এক পাঁচতারকা হোটেলে বসে শোনাতে পারলেন আতিক, ‘বাবা মারা যাওয়ার পর মা অনেক কষ্ট করেছেন। আমাদের মানুষ করতে হোটেলের বাবুর্চি হলেন। একটু বোঝার পরে আমি শুধু বলতাম, আমাকে ফুটবল খেলতে দাও। আমি বড় ফুটবলার হলে তোমার কোনো দুঃখ থাকবে না। এখনো বড় খেলোয়াড় না হতে পারলেও মাকে তো আর হোটেলে কাজ করতে হয় না।’
অথচ আতিকের বাবা বদিউজ্জামান ছিলেন গ্রামের মেম্বার (ইউপি সদস্য)। সহায়-সম্পত্তি ছিল ভালোই। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পরে দ্বিতীয় স্ত্রীর ছেলে হওয়ায় জোটেনি কিছুই। তা ছাড়া বাবা মারা যাওয়ার আগেই বড় ভাই অল্প বয়সে বিয়ে করেই আলাদা। তাই আতিক ও ছোট ভাই মেহেদীকে নিয়ে কষ্টের জীবনই কাটাতে হয়েছে মাকে।
পরিবারের সেই কষ্টের মধ্যেই আতিকের ফুটবলে হাতেখড়ি। এর পেছনেও একটা গল্প আছে। নিজ জেলা শেরপুর স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলা দেখতে গিয়ে একদিন জেলা অনূর্ধ্ব-১৩ ফুটবল লাইনে দাঁড়িয়ে যান আতিক। এরপর সাধনদা নামের স্থানীয় এক কোচের নজরে পড়া। তাঁর হাত ধরেই সামনে এগিয়ে চলা। ঘরে খাবার না থাকায় অনুশীলনের পরে নাশতার ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন সাধন। তাঁর উদ্যোগেই ঢাকায় আসা এবং ২০১৩ সালে অনূর্ধ্ব-১৬ টুর্নামেন্টে মোহামেডানের জার্সিতে সেরা খেলোয়াড় হওয়া। একই বছর অনূর্ধ্ব-১৬ সাফ দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন। ২০১৫ অনূর্ধ্ব-১৬ সাফ শিরোপাজয়ী দলেরও সদস্য ছিলেন। চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে খেলেছেন ভিক্টোরিয়ার হয়ে। পরে আরামবাগ ক্রীড়া সংঘে নাম লেখান। আয়-রোজগার এখন যা হয়, তাতেই দিনবদলের শুরু আতিক ও তাঁর মায়ের। এখন অন্তত মাকে হোটেলে রান্না করতে হয় না। এ নিয়েই আতিকের বুকভরা গর্ব।
সোমবার সন্ধ্যায় আতিকের মায়ের কাছে পৌঁছে গিয়েছে ছেলের আত্মঘাতী গোলে বাংলাদেশের হারের খবর। ছেলেকে সান্ত্বনা দিয়ে মা বলেছেন, ‘তোমার এই আত্মঘাতী গোলে আমিই যখন কষ্ট পাইনি, তুমিও পেয়ো না। এইটা তো খেলারই অংশ।’
বাস্তবতা বুঝে অনেক দূর থেকে মা-ই ছাতা ধরেছেন মাথার ওপর। এর চেয়ে বড় সান্ত্বনা আতিকের জন্য আর কী হতে পারে!