
>ফুটবলার সোহেল রানা সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন স্ত্রী ও একমাত্র ছেলেকে। ভয়াবহ এই ঘটনা থেকে সোহেলকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে স্ত্রীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা। জীবনসঙ্গীর স্বপ্ন পূরণে সোহেল খেলতে চান জাতীয় দলে
‘বাবা ভু. . বাবা ভুহহহ...’
বাবার কোলে চড়ে এভাবেই কল্পিত গাড়ি চালায় দুই বছরের আবদুল্লাহ আফরান। আর মোটরসাইকেল দেখলে চড়ে বসার বায়না তো আছেই। একমাত্র ছেলের মনের কথা খুব সহজেই বুঝতে পারেন সোহেল রানা। ছেলের ‘ভু. . ভু...’ ডাকের মায়ায় ভুলে একদিন কিনেই ফেললেন মোটরসাইকেল। উঠোনে নতুন ‘ভু. . ’ দেখে খুশিতে আত্মহারা আফরানের হাসিমুখ দেখে ভীষণ তৃপ্তি পেয়েছিলেন ফুটবলার সোহেল। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, এক বছরের ব্যবধানে সেই মোটরসাইকেলই হলো আফরানের যমদূত!
আফরানের সঙ্গে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন তার মা তাসলিমা আফরিন ঝুমাও। আর সোহেল এ দুজনকে হারিয়ে নিঃস্ব, নিজমুখেই শোনালেন সেই বিষাদের গল্প।
গত ২৪ নভেম্বর সোহেলের জীবনের কালো দিন। ফেডারেশন কাপের ছুটি শেষ করে স্ত্রী ও তিন বছরের ছেলেকে নিয়ে মোটরসাইকেল চেপে মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকার বসুন্ধরার বাসায় ফিরছিলেন শেখ রাসেলের এই মিডফিল্ডার। পথিমধ্যে সাভার নবীনগরের নয়ারহাটে রাস্তায় ঘটল ভয়ানক দুর্ঘটনা। ট্রাককে জায়গা দিতে গিয়ে ব্রেক কষেছিলেন, তাতে কাত হয়ে মোটরসাইকেল থেকে পরে যান ছেলে। ছেলেকে ধরতে গিয়ে বুঝি পড়ে যান মা ঝুমাও! চিৎকার কানে আসতেই সোহেল পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখতে পান, ট্রাকের চাকার তলে প্রিয়তম স্ত্রী ও বুকের ধন ছেলেটা।
সোহেলের শুধু মনে পড়ে মোটরসাইকেল থেকে পড়ে যাওয়ার সময় ‘আফরানের বাবা’ বলে জীবনসঙ্গীর সেই চিৎকার, ‘আমি খুব ধীরে ধীরেই বাইক চালাচ্ছিলাম। ছেলেকে বাইকে উঠে ঘুমালে আমার সঙ্গে হেলান দিয়ে থাকে। কিন্তু সেদিন দেয়নি। হঠাৎ “আফরানের বাবা” বলে চিৎকার কানে আসল। পেছনে তাকাতেই দেখি ওরা ট্রাকের চাকার নিচে। চোখের পলকে সব শেষ হয়ে গেল। আমার জীবনে প্রথম অ্যাকসিডেন্টে দুজন মানুষ চলে যাবে ভাবা যায় না।’
পারিবারিক আয়োজনে সোহেল ও ঝুমার প্রেমের বিয়ে ২০১৪ সালের পয়লা মে। পরের বছর ১৫ই ডিসেম্বর তাঁদের কোলজুড়ে আসে আফরান। খেলার সুবাদে সোহেলকে ক্লাবেই থাকতে হতো বেশি। আর তাই মানিকগঞ্জ থেকে পরিবারকে নিয়ে এসেছিলেন ঢাকায়। একসঙ্গে তাঁদের নতুন সংসার টিকেছে প্রায় দুই মাসের মতো। কিন্তু সুখ সইল না, ‘আমাদের উচ্চ বিলাসী কোনো স্বপ্ন ছিল না। একটু সুখে থাকতে চেয়েছিলাম, পেয়েছিলামও। কিন্তু সইল না। নিজের হাতে বাসাটা গোছানোর পরই ও চলে গেল।’ এই কথাগুলো বলার সময় সোহেল নিজেকে আর সংবরণ করতে পারেননি। শেখ রাসেল ক্লাবে পাঁচতলা ভবনে কামরার দেয়াল আটকে দিয়েছে তাঁর অঝোর কান্নার শব্দ।
বিয়ের বয়স পাঁচ বছরও হয়নি। সামনে ছিল অনাবিল সম্ভাবনা। কিন্তু এখন মাঝরাতে কখনো কখনো ‘আফরানের মা’ বলে চিৎকার দিয়ে ঘুম ভাঙে সোহেলের, ‘প্রায় সাড়ে চার বছর আমাদের বিয়ের বয়স। ওর কোনো চাওয়া ছিল না। আমার ভালোই ছিল ওর সুখ। আমাকে শুধু খেলায় মনোযোগ দিতে বলত। আর বলত, আফরানের বাবা তুমি জাতীয় দলে খেলবা না!’
বেঁচে থাকলে আফরান এত দিনে তিন বছর পেরিয়ে যেত। নতুন বছরে ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করানোর ইচ্ছে ছিল সোহেলের। এসব ইচ্ছের অপমৃত্যু ঘটায় সোহেলের এখন মনে হয় ‘বুকের ওপর দিয়ে রেলগাড়ি যায়। পৃথিবীটা যে এত কষ্টের, বুঝিনি। এইভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো।’
কিন্তু এরপরও মানুষ বেঁচে থাকে। সোহেলও আছে, গড়তে হবে প্রিয়তমা স্ত্রীর স্বপ্ন। ঝুমা যে তাঁকে বলতেন, আফরানের বাবা, তুমি জাতীয় দলে খেলবা না! দুই চোখের মণিকে হারিয়ে গায়ে শোকের চাদর থাকলেও সোহেল এখন স্ত্রীর স্বপ্নপূরণে মরিয়া। জীবনসঙ্গীর প্রতি এই ভালোবাসাটুকই তাঁকে নতুন করে সবকিছু শুরু করতে সাহায্য করেছে। চার বছর আগে অনূর্ধ্ব-২২ দলের প্রতিনিধিত্ব করা সোহেল এই ধ্বংসস্তূপ থেকেই গড়তে চান স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার সৌধ—সেটি অবশ্যই জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার মাধ্যমে।
মোটরসাইকেল চালকদের প্রতি সোহেলের বার্তা:
আপনারা যারা মোটরসাইকেল চালান, সবাইকে অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে। পারতপক্ষে মোটরসাইকেল ব্যবহার না করলেই ভালো। আর যাদের মোটরসাইকেল চালানো ছাড়া উপায় নেই, তাঁরা অবশ্যই হাইওয়ে বাদ দিয়ে চালাবেন। আমরা ভাগ্যকে দোষারোপ করি ঠিক আছে। তবে মোটরসাইকেলও দুর্ভাগ্য ডেকে আনে। আগে আমি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ভয়াবহতার কথা শুনেছি, দেখেছি। এবার নিজেই শিকার হলাম। আমি চাই না আমার মতো কেউ নিঃস্ব হয়ে যাক কিংবা আপনাকে (মোটরসাইকেল চালক বা আরোহী) হারিয়ে কেউ নিঃস্ব হয়ে পড়ুক।