বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়া মুহূর্তটা টিভিতে সরাসরি দেখাই ছিল কষ্টকর। খেলতে খেলতে মাঠে হার্ট অ্যাটাকের শিকার হয়ে কোনো ফুটবলারের হঠাৎ লুটিয়ে পড়া, দৃশ্যটা দুঃস্বপ্নসম মনে হয়েছে টিভিতে ম্যাচটা দেখতে থাকা কোটি দর্শকের কাছে। তখন মাঠে থাকা বাকি ২১ ফুটবলারের কী রকম লেগেছিল!
ইউরোর দ্বিতীয় দিনে ফিনল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে সেদিন দুঃস্বপ্নের মুহূর্তটার শিকার হয়েছিলেন ক্রিস্টিয়ান এরিকসেন। প্রায় ১৫ মিনিট ধরে মাঠেই চিকিৎসা চলে। সে সময় তো সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদের শঙ্কাই পেয়ে বসেছিল!
বার্সেলোনায় খেলা ডেনমার্কের স্ট্রাইকার মার্টিন ব্রাথওয়েইটেরও তা-ই মনে হয়েছিল। মাঠে ছিলেন বলে একেবারে কাছ থেকেই তো এরিকসেনকে দেখেছেন ব্রাথওয়েইট। এত দিন পর দুঃস্বপ্নের মতো মুহূর্তটার বর্ণনা দিলেন বার্সেলোনার স্ট্রাইকার। এরিকসেনকে একঝলক দেখে ব্রাথওয়েইটের মনে হয়েছিল, এরিকসেন আর নেই!
ম্যাচের ৪০ মিনিটের সময় সেদিন ফিনল্যান্ড বক্সের সামনে পার্শ্বরেখার কাছাকাছি গিয়ে হঠাৎ মুখ থুবড়ে পড়েন ডেনমার্কের প্লেমেকার। সঙ্গে সঙ্গেই দৌড়ে আসেন ডেনমার্কের খেলোয়াড়েরা। ডেনমার্ক অধিনায়ক সিমন কিয়ের এসে এরিকসেনের জিহ্বা যাতে ভেতরে ঢুকে না যায়, তা নিশ্চিত করলেন। সিপিআর (বুকে হাত দিয়ে চেপে শ্বাসপ্রশ্বাস চালু করার চেষ্টা) দিতে শুরু করেন। ততক্ষণে ডাক্তাররা দৌড়ে চলে এসেছেন।
ডেনমার্ক গোলকিপার ক্যাসপার স্মাইকেল এসে সতীর্থদের জড়ো করলেন, যাতে সবাই ডাক্তারদের আর এরিকসেনকে ঘিরে রাখেন। ম্যাচটা ডেনমার্কেরই কোপেনহেগেনে হচ্ছিল বলে স্বাগতিক দর্শকই বেশি ছিল। ড্যানিশদের পাশাপাশি স্টেডিয়ামে থাকা ফিনিশ দর্শকরাও তখন দুশ্চিন্তায়। প্রার্থনায়।
১৫ মিনিট ধরে প্রাথমিক চিকিৎসায় শ্বাসপ্রশ্বাস ফেরে এরিকসেনের। কিছুটা স্থিতিশীল হলে তাঁকে পরে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। কিন্তু এর আগপর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তই কেটেছে ভয়াবহ কোনো দুঃস্বপ্নের মতো।
একই অবস্থা ছিল ব্রাথওয়েইটেরও। মাঠে চোখের সামনেই এরিকসেনকে পড়ে যেতে দেখেছেন। ডাক্তাররা প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার সময়ে যখন এরিকসেনকে ঘিরে রেখেছিল ডেনমার্কের পুরো দল, তখনো একঝলক এরিকসেনকে দেখেছিলেন ব্রাথওয়েইট। যা দেখেছেন, সেটি এখনো ভুলতে পারছেন না বার্সেলোনা স্ট্রাইকার।
তাঁকে নিয়ে চার পর্বের একটি সিরিজ বানাচ্ছে ৪৩৩ নামের ওয়েবসাইট। সেখানেই এরিকসেনকে ঘিরে দুঃস্বপ্নসম মুহূর্তটার বর্ণনা দিয়েছেন ব্রাথওয়েইট, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে জঘন্য মুহূর্তগুলোর একটির সাক্ষী হয়েছি সেদিন। যেটা কিনা ডেনমার্কের খেলাধুলার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল, সেটি রূপ নিল দুঃস্বপ্নে! সে রাতে যা ঘটেছিল, সেটা অনেক মানুষকেই স্তম্ভিত করে দিয়েছিল।’
এরিকসেনকে একঝলক দেখার মুহূর্তটাও এখনো ভুলতে পারেন না ব্রাথওয়েইট, ‘একবার একমুহূর্তের জন্য আমি ক্রিস্টিয়ানের দিকে তাকিয়েছিলাম। দেখে মনে হচ্ছিল, ও আর নেই! আপনি যখন মৃত কোনো মানুষের শরীর দেখেন, আপনার মনে কোনো সংশয় থাকে না যে ওই মানুষটা মৃত। দেখেই বুঝতে পারেন। ওই মুহূর্তে আমারও তা-ই মনে হয়েছিল।’
কিন্তু মুহূর্তটা এমন ছিল, যেখানে ব্রাথওয়েইটের কিছু করার ছিল না। ডাক্তাররা সবটুকু দিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছেন। তাতে ডাক্তারদের বিজয়ের আগপর্যন্ত মুহূর্তটাতে কতটা অসহায় অনুভূতি হচ্ছিল, সেটাও উঠে এল ব্রাথওয়েইটের বর্ণনায়, ‘ওই দৃশ্যটা (এরিকসেনের দিকে তাকানো) যখন দেখলাম, আমি সবটুকু দিয়ে প্রার্থনাই করে যাচ্ছিলাম শুধু। মনে হচ্ছিল, ওই মুহূর্তে একটা কাজই আমি করতে পারি—ঈশ্বরের কাছে চাওয়া!’
ঈশ্বর ব্রাথওয়েইটসহ সবার প্রার্থনা শুনেছেন। এরিকসেন সুস্থ হয়ে ফিরেছেন। এটাই ব্রাথওয়েইটের কাছে সবকিছু, ‘মাঠে যত ডাক্তার ছিলেন, সবাই ওকে নিয়ে প্রাণান্ত লড়ছিলেন। অমন মুহূর্ত আর কারও সঙ্গে না হোক, শুধু এটাই চাই। শেষ পর্যন্ত সবকিছুর শেষটা সুন্দর হয়েছে, ক্রিস্টিয়ান ভালো আছে, ওর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। ওই মুহূর্তে শুধু এটাই চাইতে পারতাম।’
এরিকসেন এরপর হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। আর তাঁর জন্য একটা দল হয়ে খেলা ডেনমার্ক ইউরোতে আলো ছড়িয়ে সেমিফাইনাল পর্যন্ত গেছে! টুর্নামেন্টে আলো ছড়িয়েছেন ব্রাথওয়েইটও। ৩০ বছর বয়সী স্ট্রাইকার গোল ১টি করেছেন, তবে ডেনমার্কের আক্রমণে দারুণ ভরসা হয়েছিলেন টুর্নামেন্টজুড়েই!
ইউরোতে আলো ছড়িয়ে ইউরোপের ক্লাবগুলোর নজরেও এসেছেন ব্রাথওয়েইট। বেতনের ভারে জর্জরিত, আর্থিকভাবে পঙ্গু বার্সেলোনা ব্রাথওয়েইটকে বিক্রি করতে চায়। এখন পর্যন্ত গুঞ্জন, ইংলিশ ক্লাব ওয়েস্ট হাম ১ কোটি ৫০ ইউরোতে তাঁকে কিনতে চায়।