‘বক্সিং ডে’তে ভারতকে হারানোর গল্প

ফুটবলের দুনিয়ায় অতি প্রিয় একটা দিন ‘বক্সিং ডে’। ক্যালেন্ডারের পাতায় ২৬ ডিসেম্বর। কেবল ফুটবল দুনিয়ায় কেন, খেলার জগতেই তো বক্সিং ডে নিয়ে খুব হইচই। বড়দিনের পরের এ তারিখে উৎসবমুখর আবহে যেকোনো খেলা আয়োজনের একটা চল আছে পৃথিবীময়।

হঠাৎ বক্সিং ডে প্রসঙ্গ আসার কারণ, এ তারিখেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভারতের বিপক্ষে প্রথম জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। ১৯৯১ সালের ২৬ ডিসেম্বর এক শীতকাতুরে বিকেলে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা উৎসবে মেতেছিলেন ভারতকে হারিয়ে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সেই জয় রীতিমতো আরাধ্য ছিল। আর সেই জয়ের একক নায়ক বলা চলে রিজভি করিম রুমিকে।

নব্বইয়ের দশকে দেশের ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা রুমি। ঝাঁকড়া চুল দুলিয়ে মাঠে সারাক্ষণ প্রতিপক্ষের আতঙ্ক হয়ে থাকা এই ফরোয়ার্ডের ড্রিবলিং, শুটিং—সবকিছুই ছিল ছবির মতো সুন্দর। অনেকেই বলেন, বাংলাদেশের ফুটবলে তাঁর মতো স্টাইলিশ খেলোয়াড় আর আসেনি। আজ থেকে ৩০ বছর আগে শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে ভারতকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিলেন রুমি। তাঁর জোড়া গোলেই সেদিন ভারত-রহস্যের সমাধান হয়েছিল। ডিসেম্বরের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন বিকেলটি তাই অন্য রকম অনুভূতিই ছড়ায় বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের একটা প্রজন্মের মধ্যে।

রিজভী করিম রুমি

ম্যাচটি আপ্লুত করে রুমিকেও। খুব দীর্ঘ ক্যারিয়ার তাঁর ছিল না। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে হুট করেই ফুটবল ছেড়ে কানাডায় প্রবাসজীবন বেছে নিয়েছিলেন তিনি। সেখানে পরিবার ও পেশাদারি জীবন নিয়ে থিতু রুমি প্রথম আলোকে বলেছেন সেই ম্যাচ জয়ের অনুভূতির কথা, ‘আমরা ভারতকে হারাতে পারছিলাম না। বেশ কয়েকটি ম্যাচে খুব কাছে গিয়েও জেতা হয়নি। ১৯৯১ সালে সেই জয় এল, আর তা আমারই জোড়া গোলে। এখনো মনে পড়ে সেই জয়ের কথা। আগের ম্যাচেই পাকিস্তানের বিপক্ষে হেরেছিলাম আমরা। সে সময় সাফ গেমসে গ্রুপে একটা ম্যাচ হারলেই সোনার পদকের লড়াই থেকে বিদায় ঘণ্টা বেজে যেত। পাকিস্তানের বিপক্ষে হেরে তাই সবার মন খুব খারাপ ছিল। ঠিক করেছিলাম, ভারতের বিপক্ষে জিতে সোনার পদক হারানোর কষ্টটা ভুলব। মাঠে নেমেই মনে হলো দিনটা আমাদের। সবাই অসাধারণ খেলেছিল। আমি দুই গোল করলাম। তবে জেতার পর মন ভালো হওয়ার বদলে আরও খারাপ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, পাকিস্তানের বিপক্ষে কেন হারলাম! আমি তো মনে করি সাফ গেমস-শ্রেষ্ঠত্বের সেরা সুযোগ ছিল কলম্বোতেই, ১৯৯১ সালে।’

‘আমি আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটা দেখেছি। বাংলাদেশ ভালোই খেলেছে। ট্যাকটিক্যালি বাংলাদেশ দল আমাদের সময়ের চেয়েও এগিয়ে, এটা আমি এখন বিশ্বাস করি। তবে আফগানদের বিপক্ষে আমরা যদি একটু আক্রমণাত্মক হতাম, তাহলে ভালো হতো।
রুমি, জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক

রুমির মতোই ভারতের বিপক্ষে সেই জয় ফুটবলপ্রেমীদের আক্ষেপটা আরও বাড়িয়েছিল। সে সময় সাফ গেমস ফুটবলে শ্রেষ্ঠত্বের জন্য যে মরিয়া ছিল বাংলাদেশ! তাই ৩০ বছর আগে ভারতের বিপক্ষে প্রথম জয়ও সাফল্য-বুভুক্ষু ফুটবলপ্রেমীদের খুব খুশি করতে পারেনি। তখন কি ফুটবলপ্রেমীরা জানতেন পরের ৩০ বছরে ভারতের বিপক্ষে আর মাত্র দুটি জয়ই হবে সম্বল!

ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম জয়ের নায়ক রুমি।

রুমি সে ম্যাচে দুরন্ত শটে দূরপাল্লার এক গোল করেছিলেন। আন্তর্জাতিক ফুটবল রুমির দেশের হয়ে আরও গোল আছে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ১৯৯৩ সালে জাপানের বিপক্ষে দুবাইয়ের মাটিতে করা একটি গোল তো ইউটিউবেই আছে। কিন্তু রুমি নিজে ভারতের বিপক্ষে গোলটিকে রেখেছেন হৃদয়ে আলাদা স্থান দিয়ে, ‘আসলাম ভাইয়ের বাড়িয়ে দেওয়া বল পেয়ে যাই ভারতের ডি বক্সের কিছুটা বাইরে। আমি যেখানে বলটা পাই, সেখান থেকে গোলপোস্ট পরিষ্কার দেখছিলাম। সিদ্ধান্তটা নিয়েছি কয়েক সেকেন্ডে সরাসরি পোস্টে মারার। তবে আমি ভাগ্যবান ছিলাম। গোলটা তো না-ও হতে পারত। বলের ঠিক জায়গাতেই মারতে পেরেছিলাম। তাই বুলেটগতিতে তা ভারতীয় গোলকিপারকে বোকা বানিয়েছিল।’

ওই ম্যাচে আরও একটা স্মৃতি রুমিকে নাড়া দেয়। তিন দশক পরও সেটি মনে রেখেছেন তিনি, ‘মহসিন ভাই আমাদের অধিনায়ক ছিলেন। দলে কায়সার ভাই, সাব্বির, মামুন জোয়ার্দার, গাউস, মাসুদ রানা, নকীবরা ছিল। কেবল মোনেম মুন্না ভাই চোটের কারণে দলে ছিলেন না। তারপরও দলটা খুব ব্যালান্সড ছিল। সে ম্যাচে আমরা আরও গোল পেতে পারতাম। আমি পেতে পারতাম হ্যাটট্রিক। আমি সুযোগ কাজে লাগাতে পারিনি। আসলাম ভাইয়ের একটা শট তো গোললাইন থেকে ফিরিয়েছিল ভারতীয় ডিফেন্ডার ব্রুনো কুতিনিও।’

রুমি চান বাংলাদেশ আজ আক্রমণাত্ম ফুটবল খেলুক।

শহীদউদ্দিন সেলিম ছিলেন বাংলাদেশের সেই দলের কোচ। আসলেই বাংলাদেশ দলটা ছিল খুবই ভারসাম্যপূর্ণ। স্ট্রাইকিংয়ে শেখ মোহাম্মদ আসলাম ও রুমি। একের পর এক বল তৈরি করেছেন রুম্মান বিন ওয়ালি সাব্বির। রক্ষণে কায়সার হামিদ, জুয়েল রানা ও আতাউর রহমান। মধ্যমাঠে পরিশ্রমী সত্যজিৎ দাস রুপু। তবে সবকিছু ছাপিয়ে সে ম্যাচটা পুরোপুরি হয়ে উঠেছিল রুমির ম্যাচ।

৩০ বছর পর আজ কাতারের দোহায় আরও একটি ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচ। বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের প্রথম পর্বে কলকাতায় ভারত বাংলাদেশকে হারাতে পারেনি। যদিও ১-১ গোলে ড্র হওয়া সেই ম্যাচে ৮৮ মিনিটে গোল করে হার বাঁচিয়েছিল ভারত। গত ১২ বছরে বাংলাদেশকে হারাতে পারেনি ভারত। এ সময় অনুষ্ঠিত তিন ম্যাচেই শেষের দিকে গোল করে বাংলাদেশকে জয়বঞ্চিত করেছে ভারত। আজকের ম্যাচটা তাই জিততে ভারত মরিয়া হয়ে উঠবে, এ কথা বলাই যায়। এ ম্যাচে বাংলাদেশকে নিয়ে আশাবাদী রুমি, ‘আমি আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটা দেখেছি। বাংলাদেশ ভালোই খেলেছে। ট্যাকটিক্যালি বাংলাদেশ দল আমাদের সময়ের চেয়েও এগিয়ে, এটা আমি এখন বিশ্বাস করি। তবে আফগানদের বিপক্ষে আমরা যদি একটু আক্রমণাত্মক হতাম, তাহলে ভালো হতো। আমি নিশ্চিত কোচ জেমি ডে, এটা নিয়ে ভাববে। আজ ভারতের বিপক্ষে আমাদের ঘরও সামলাতে হবে, আক্রমণেও থাকতে হবে। মোটকথা, চেপে বসতে দেওয়া যাবে না। আমি আশাবাদী।’

আজ দোহায় বাংলাদেশ দলের কেউ ‘রুমি’ হয়ে উঠলেই আর চিন্তা নেই ফুটবলপ্রেমীদের।