ব্রাজিলের ছোট পাখি গারিঞ্চা
ব্রাজিলের ছোট পাখি গারিঞ্চা

কফিতে গলা আটকা আর কুকুরের অন্য রকম কৃতজ্ঞতা

বিশ্বকাপ মানে তো শুধু মাঠের লড়াই নয়; এর আশপাশে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য গল্পের কোলাজ। যে গল্পের কোনোটিতে ঐতিহাসিক বিতর্ক আছে, আছে রোমাঞ্চ কিংবা অজানা চমক। বিশ্বকাপের তেমন কিছু গল্প নিয়ে এ আয়োজন—

কফিতে গলা আটকা

ফুটবল মাঠে জেতার জন্য কোচরা কত কিছুই না করেন। জটিল তো বটেই, কখনো কখনো কুটিল কৌশল গড়েন, ভিডিও বিশ্লেষণে রাত পার করেন, আবার প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে মনোবিজ্ঞানেরও আশ্রয় নেন। তবে ১৯৬২ বিশ্বকাপে চিলির কোচ ফার্নান্দো রিয়েরা বেছে নিয়েছিলেন অন্য রকম এক পথ—রান্নাঘর।

রিয়েরার তত্ত্বটা ছিল সহজ, কিন্তু অভূতপূর্ব। ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষ দেশের জাতীয় খাবার বা পানীয় পরিবেশন করা। দর্শনটা অনেকটা এ রকম—প্রতিপক্ষকে শুধু মাঠে নয়, আক্ষরিক অর্থেই হজম করে ফেলো।

১৯৬২ বিশ্বকাপে চিলির কোচ ফার্নান্দো রিয়েরা।

এই অদ্ভুতুড়ে কাণ্ডটির শুরু ৩০ মে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচ ছিল এটি। ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে রিয়েরা চিলির সব খেলোয়াড়কে এক টুকরা গ্রুইয়ের চিজ খাওয়ালেন। সেদিন বিকেলেই চিলি সুইজারল্যান্ডকে হারায় ৩-১ গোলে। ‘ইনক্রেডিবল স্টোরিজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ’ বইয়ে এ বিবরণ বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করা আছে।

‘ব্যাটল অব সান্টিয়াগো’

চিলির পরের ম্যাচ ছিল ইতালির বিপক্ষে। সেদিন ম্যাচের আগে লাঞ্চে খেলোয়াড়দের সামনে দেওয়া হলো পাস্তা। বুঝতেই পারছেন, প্রতিপক্ষ ছিল ইতালি। পাস্তা খাওয়ার পর বিকেলে সেই কুখ্যাত ‘ব্যাটল অব সান্তিয়াগোতে’ চিলি ইতালিকে হারায় ২-০ গোলে। ধারাবাহিকতা মেনে জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দের সামনে এল সসেজ আর সাওয়ারক্রাউট। তবে এদিনের ‘রান্নার জাদু’ কাজ করেনি, চিলি হেরে যায় ২-০ গোলে। অবশ্য এই হারে চিলির তেমন ক্ষতি হয়নি। এর আগেই কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল তাদের।

এরপর এল আসল পরীক্ষা। কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ সোভিয়েত ইউনিয়ন। সে সময়ের শক্তিশালী দল, যাদের গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে কিংবদন্তি গোলকিপার লেভ ইয়াশিন। রিয়েরা সেদিন চিলির খেলোয়াড়দের হাতে তুলে দিলেন রুশ ভদকা। কাজে লেগে গেল এটাও। চিলি জিতে গেল ২-১ গোলে।

চিলির খেলোয়াড় লিওনেল সানচেজের সঙ্গে কোচ ফার্নান্দো রিয়েরা।

সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ ব্রাজিল। গারিঞ্চা, ভাভা, অ্যামারিলদোর সেই দুর্দান্ত দল। সেদিন পরিবেশন করা হলো কফি। কিন্তু তরল পানীয়টা হজম হলো না। চিলি ম্যাচ হেরে গেল ৪–২ গোলে। লাতিন আমেরিকার লেখক এদুয়ার্দো গালেয়ানো তাঁর বিখ্যাত বই ‘ফুটবল ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’তে চিলি কোচের এই ‘গ্যাস্ট্রোনমিক স্টিমুলেশন’ নিয়ে একটি লাইন লিখেছিলেন। অমর হয়ে যাওয়া সেই লাইনটা এ রকম—‘তারা (ইতালির) স্প্যাগেটি, (সুইজারল্যান্ডের) চকলেট আর (সোভিয়েত ইউনিয়নের) ভোদকা গিলেছিল, কিন্তু (ব্রাজিলের) কফিতে গলা আটকে গেল।’

কুকুরের কৃতজ্ঞতা!

১৯৬২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। চিলির মাঠে মুখোমুখি ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল আর ইংল্যান্ড। পেলে আগেই চোটে ছিটকে গেছেন। কিন্তু গারিঞ্চা আছেন এবং সেটাই ব্রাজিলের জন্য যথেষ্ট। তবে সেদিনের ম্যাচে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এল যে, সে ব্রাজিলের কেউ নয়, ইংল্যান্ডেরও নয়—চার পায়ে মাঠে ঢুকে পড়া একটি নেড়ি কুকুর।

এই প্রাণীটা মাঠে ঢুকে পড়লে রেফারি খেলা থামিয়ে দেন। এবার কাজ হচ্ছে কুকুরটাকে মাঠ থেকে তাড়ানো। ইংলিশ গোলরক্ষক রন ছুটলেন, ছুটলেন গারিঞ্চাও; কিন্তু কুকুরটা সবাইকে বোকা বানিয়ে দৌড়াচ্ছে তো দৌড়াচ্ছেই। তখন ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার জিমি গ্রিভস একটা অদ্ভুত কাজ করলেন। হাঁটু গেড়ে চার হাত-পায়ে বসে কুকুরটিকে ডাক দিলেন তিনি। বেশ কাজে দিল কৌশলটা।

ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার জিমি গ্রিভস ।

কুকুর এল। গ্রিভস কোলে তুলে নিলেন। কিন্তু প্রাণীটি কৃতজ্ঞতা জানাল অন্যভাবে। গ্রিভস নিজেই পরে বলেছেন, ‘ওকে কোলে নিয়ে জড়িয়ে ধরতেই পুরো জার্সিতে প্রস্রাব করে দিল। সেই যুগে বদলি জার্সি থাকত না, জার্সি ওই একটাই। ওই অবস্থায় বাকি ম্যাচ খেলতে হলো। গন্ধটা ভয়ানক ছিল। তবে একটা সুবিধা হয়েছিল, ব্রাজিলের ডিফেন্ডাররা আমার ধারেকাছে ঘেঁষছিল না।’

গারিঞ্চা

সেদিন ব্রাজিল জিতল ৩-১ গোলে। গারিঞ্চা একাই করলেন দুটি গোল। ম্যাচ শেষে গ্রিভস পরিচিত হলেন এক অদ্ভুত উপাধিতে—ব্রাজিলে তাঁকে ডাকা হতে লাগল ‘গারিঞ্চার ডগ ক্যাচার’ নামে।

‘গারিঞ্চার ডগ’ কেন?

কারণ, বিশ্বকাপের পর গারিঞ্চা কুকুরটিকে দত্তক নিয়ে নিজের শহর পাউ গ্রান্দেতে নিয়ে যান। নাম রাখেন ‘বাই’। যার অর্থ দুই, সেবারই যে ব্রাজিল তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপটি জিতেছিল!