হ্যারি কেইনের বাঁ পায়ে ব্যান্ডেজ। কিন্তু মুখে হাসি। পরম ভালোবাসায় চুমু খাচ্ছেন স্ত্রী কেটি গুডল্যান্ডকে। ইংল্যান্ড দল ডালাস স্টেডিয়াম ছাড়ার আগে এমন ছবি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
ব্যান্ডেজ দেখে ইংল্যান্ড সমর্থকদের দুশ্চিন্তার কিছু নেই। ম্যাচের ৮৯তম মিনিটে ক্রোয়েশিয়ার কড়া ট্যাকলের শিকার হন। সামান্য আঘাত পেয়েছেন কেইন। তবে বলকান দেশটির বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ৪–২ গোলের জয়ে কেইনের খেলা দেখে যেকোনো ইংল্যান্ড সমর্থকের ভালো লাগার কথা!
কেইন জোড়া গোল করেছেন—শুধু সে জন্য নয়। ইংলিশ সমর্থকরা তাঁকে যে উচ্চতায় দেখতে চান, ক্রোয়াটদের বিপক্ষে তেমনই দুটি ‘বেদি’তে দাঁড়িয়েছেন ইংল্যান্ডের জার্সির এই সর্বোচ্চ গোলদাতা। বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে সর্বোচ্চ গোল এখন কেইনের। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের জার্সিতে সর্বোচ্চ গোলও তাঁর। তবে এই জায়গাটায় ভাগীদার তিনি একাই নন। আপাতত আছেন আরও একজন। ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার গ্যারি লিনেকার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, ইংল্যান্ডের লাল রংয়ের জার্সি পরে কেইন–বেলিংহামদের খেলা দেখছেন লিনেকার।
ক্রোয়েশিয়ার জালে কেইন দ্বিতীয় গোল করার পর লিনেকারের উদ্যাপনে এতটুকু কৃত্রিমতা ছিল। দুই হাতের দশটি আঙুল তুলে ধরেন। ইংল্যান্ডের সমর্থক মাত্রই জানেন, ওই দশটি আঙুল আসলে ১০ গোলের অনুচ্চারিত সংকেত। বিশ্বকাপে লিনেকার ও কেইনের গোল এখন সমান ১০টি। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড দলের হয়ে আর কেউ এত গোল করতে পারেননি।
অর্থাৎ কেইন এবং লিনেকার এখন সমানে সমান। সেটা শুধু গোলসংখ্যায় নয়। খেলার ধরনেও। দুজনেই স্ট্রাইকার। ১০ নম্বর জার্সি পরেছেন দুজনেই—সেখানে অবশ্য একটু পার্থক্য আছে। লিনেকার ইংল্যান্ডের হয়ে শুধু ১০ নম্বর জার্সি পরে খেলেছেন, কেইন ১০ পরে এখন ৯ নম্বরে থিতু হয়েছেন। পাশাপাশি দুজনেই টটেনহামের সাবেক খেলোয়াড়।
বিশ্বকাপে ‘গোল্ডেন বুট’ ট্রফি আছে দুজনের শোকেসেই। ’৮৬ আসরে লিনেকার সর্বোচ্চ ৬ গোল করে জেতেন সোনার সেই বুট। কী আশ্চর্য, ২০১৮ বিশ্বকাপে কেইনও গোল্ডেন বুট জেতেন ৬ গোল করে! মিল আছে আরও। সেটা ঘটে গেল গতকাল রাতে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ ১০ গোল করার পথে লিনেকার ম্যাচ খেলেন ১২টি। কেইনও গতকাল রাত পর্যন্ত বিশ্বকাপে ১০ গোল করতে ম্যাচ খেললেন ১২টি!
কিন্তু কেইন যে লিনেকারের পাশে থাকবেন না, তা এতক্ষণে সবার বুঝে ফেলার কথা। এবার বিশ্বকাপে কেবল এক ম্যাচ খেলল ইংল্যান্ড। কেইন সেখানে যেভাবে আলো জ্বাললেন, তাতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, ক্লাব ফুটবলে গত মৌসুমে ৫১ ম্যাচে ৬১ গোলের ফর্ম টেনে এনেছেন বিশ্বকাপেও।
অতএব, লিনেকারের পেছনে পড়া এখন কেবলই সময়ের ব্যাপার। তাতে ইংল্যান্ড কিংবদন্তির খুশিই হওয়ার কথা। বিশ্বকাপ শুরুর আগে সংবাদমাধ্যম টকস্পোর্টকে বলেছেন, ‘আমি সত্যিই চাই সে আমাকে ছাড়িয়ে যাক। তা না হলে আমরা (বিশ্বকাপ) জিততে পারব না। আমাদের কোনো সম্ভাবনা তৈরি করতে হলে কেইনকে সেরা ফর্মে থাকতে হবে।’
প্রথম ম্যাচে কেইন সে দাবি মিটিয়েছেন। সেরা ফর্মের কেইনকেই তো দেখা গেল—যিনি ভুল শুধরে নিতে জানেন। যেমন ধরুন ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ১২ মিনিটে পাওয়া পেনাল্টিটি। কেইনের প্রথম শট মোটেও সন্তোষজনক ছিল না। বেশ দুর্বল শট, সেটা বলেছেন ধারাভাষ্যকারই। ভাগ্যিস, ক্রোয়েশিয়া গোলকিপার দমিনিক লিভাকোভিচ কেইন শট নেওয়ার আগে গোললাইন ছেড়ে বের হওয়ার ভুলটা করেছিলেন। এ কারণে পেনাল্টিটি আবারও নেওয়ার সুযোগ পায় ইংল্যান্ড। কেইন দ্বিতীয়বার দুর্বল শট নেওয়ার ভুল করেননি। গোলকিপারের ডান দিক দিয়ে জোরাল শটে সোজা জালে।
পেনাল্টি থেকে করা এই গোলেও রেকর্ড গড়েন কেইন। বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে সর্বোচ্চ গোল এখন কেইনের। সেটা টাইব্রেকারের হিসাব বাদে।
বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি ও কেইন সর্বোচ্চ ৬টি করে পেনাল্টি শট নিয়েছেন। মেসির দুটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন প্রতিপক্ষ গোলকিপার। কিন্তু কেইন তাঁর ৬ পেনাল্টি শটের ৫টিতেই গোল করেছেন, অন্যটি বাইরে মেরেছিলেন। বিশ্বকাপে কেইনই এখন পেনাল্টি থেকে সর্বোচ্চ গোলদাতা।
বিশ্বকাপে চার পেনাল্টি শটের সবগুলোতেই গোল করেছেন পর্তুগালের ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ ইউসেবিও। বিশ্বকাপে ডাচদের হয়ে দুবার ফাইনাল খেলা সাবেক লেফট উইঙ্গার রব রেনসেব্রিঙ্ক ও আর্জেন্টিনার সাবেক স্ট্রাইকার গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতাও চার পেনাল্টি শটে সবগুলোতে গোল পেয়েছেন।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো চার পেনাল্টি শটের তিনটিতে গোল পেয়েছেন। একটি শট সেভ হয়েছে। ঘানার সাবেক মিডফিল্ডার আসামোয়া জিয়ানের আরেকটু বেশি দুর্ভাগ্য। চারটি পেনাল্টি শটের দুটিতে গোল পেয়েছেন। একটি মেরেছেন পোস্টে, অন্যটি ক্রসবারে!