পুরো দেশ তাকিয়ে ছিল ফাইনালে, জেল ভেঙে পালালেন কয়েদি

বিশ্বকাপ মানে তো শুধু মাঠের লড়াই নয়; এর আশপাশে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য গল্পের কোলাজ। যে গল্পের কোনোটিতে ঐতিহাসিক বিতর্ক আছে, আছে রোমাঞ্চ কিংবা অজানা চমক। বিশ্বকাপের তেমন কিছু গল্প নিয়ে এ আয়োজন—

২০০৬ সালের ৯ জুলাই রাত। বার্লিনের অলিম্পিয়া স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফাইনাল।

একদিকে ইতালি, অন্যদিকে ফ্রান্স। জিনেদিন জিদানের শেষ ম্যাচ, ফাবিও কানাভারোর নেতৃত্বে ইতালির ট্রফি-স্বপ্ন, অতিরিক্ত সময়ে মাথা গরম করে মাতেরাজ্জিকে জিদানের সেই বিখ্যাত ঢুঁশ হেড—সব মিলিয়ে পুরো ফুটবলদুনিয়া যেন টেলিভিশনের সামনে জমে ছিল। এর মধ্যে ফ্রান্স আর ইতালি তো রীতিমতো থমকে ছিল।

আর সেই থমকে থাকা মুহূর্তকেই নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন এক কারাবন্দী।

ইতালির সার্ডিনিয়া দ্বীপের আলঘেরো কারাগারে তখন বন্দী ছিলেন ৩৮ বছর বয়সী রবার্তো লোই। চুরি, ডাকাতি ও সম্পদ-সংক্রান্ত একাধিক অপরাধে তাঁর সাজা চলছিল। মুক্তি মিলবে ২০১৬ সালে। কিন্তু বিশ্বকাপ ফাইনালের রাত তাঁর কাছে যেন অন্য এক দরজা খুলে দিয়েছিল।

পরে ইতালিয়ান সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে, ম্যাচ যত গড়িয়েছে, কারাগারের ভেতরেও তত বেড়েছে উত্তেজনা। ইতালি বিশ্বকাপ জিতবে কি না, সেই দুশ্চিন্তায় তখন পুরো দেশ ডুবে। কারারক্ষীরাও এর বাইরে ছিলেন না। সেই মনোযোগের ফাঁকটাই কাজে লাগান লোই। ঘটনাটা সিনেমার দৃশ্যের মতো শোনালেও, বাস্তবের বিবরণ আরও নাটকীয়।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এলগুয়ের ডট আইটি জানায়, লোই প্রথমে অসুস্থতার কথা বলে কারাগারের চিকিৎসাকেন্দ্রে যান। এরপর কোনোভাবে সবার নজর এড়িয়ে ভবনের ছাদে উঠে পড়েন। সেখান থেকে মূল ভবনের দেয়াল বেয়ে নিচে নামেন। এমনকি একপর্যায়ে সিসিটিভি ক্যামেরাকে পায়ের ভর হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

তারপর?

কারাগারের বাইরে তখন অদ্ভুত নীরবতা। শহরের রাস্তাগুলো প্রায় ফাঁকা। সবাই টেলিভিশনের সামনে। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের পর অতিরিক্ত আধা ঘণ্টার খেলাও ১-১ সমতায় শেষ হয়। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে।

দুই দলের একের পর এক শটের দিকে নিশ্বাস আটকে রেখেছে ইতালি ও ফ্রান্সের মানুষ। ঠিক সেই সময়েই রবার্তো লোই কারাগারের দেয়াল টপকে ‘মুক্ত পৃথিবীতে’ পা ফেলেন।

বিশ্বকাপ ফুটবল অনেকবার মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছে। কোথাও উদ্‌যাপনে, কোথাও অসন্তোষে, কোথাও উল্লাসে। কিন্তু একটি বিশ্বকাপ ফাইনাল যে সরাসরি কারাগার ভাঙার সুযোগ তৈরি করবে, সেটি বোধ হয় খুব কম মানুষই কল্পনা করেছিল।

দুঃখজনক ঘটনা হলো, রবার্তো লুইয়ের স্বাধীনতা খুব একটা দীর্ঘ হয়নি।

পুলিশ দ্রুত তল্লাশি শুরু করে। বন্দর ও বিমানবন্দরগুলোতেও নজরদারি বাড়ানো হয়। পরদিনই তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায় পোর্তো তোরেস এলাকায়, তাঁর সঙ্গিনীর বাসার কাছে। তদন্তে জানা যায়, পালানোর সময় কারাগারের দেয়াল টপকাতে গিয়ে তাঁর পায়ের হাড় ভেঙে গিয়েছিল।

অর্থাৎ বিশ্বকাপ ফাইনাল তাঁকে কয়েক ঘণ্টার জন্য স্বাধীনতা দিলেও সেটি স্থায়ী মুক্তি এনে দিতে পারেনি। তবে যে রাতে ইতালি তাদের চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছে, সেই রাতে সে দেশেরই একজন নাগরিক কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও মুক্তি পেয়েছিলেন—এই ভেবে রবার্তো লোই সান্ত্বনা পেতেই পারেন।