কীভাবে আতলেতিকোর শত্রু হয়ে গেলেন আলভারেজ, কী হবে শেষ পর্যন্ত

ব্যালকনি থেকে বিষাক্ত গালিগালাজ বর্ষণ হচ্ছে। যাঁকে উদ্দেশ্য করে হচ্ছে, সেই তরুণ ফুটবলার টানেল দিয়ে একা হেঁটে যাচ্ছেন, মাথাটা একদম নিচু। ক্লাবের প্রেস অফিসার তাঁর হাত ধরে নিরাপদে বের করে আনছেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও যিনি ছিলেন ওই গ্যালারির নয়নের মণি, তিনি এখন পুরোপুরি ব্রাত্য। ফুটবলারের নাম হুলিয়ান আলভারেজ।

মেত্রোপলিতানো স্টেডিয়ামের সেই দৃশ্যটা সহজে ভোলার নয়। ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে ম্যাচ। বেঞ্চে বসে থাকা আলভারেজের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই শোনা গেল শিস আর দুয়ো। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি নামানোর আগে তাঁকে গরম করতে ডাকা হলে সেই শব্দ আরও তীব্র হয়। মাঠে নামার পরও থামেনি কিছুই। ‘আতলেতি হ্যাঁ, ভাড়াটে না’ স্লোগান তো ছিলই, আরও কটু সুরও ভেসে এসেছে গ্যালারি থেকে।

গত জুনে আলভারেজ ট্রান্সফার চেয়ে আবেদন করেন ক্লাবের কাছে।

ম্যাচটা শেষ হয়েছে ২-২ সমতায়। কিন্তু আলভারেজের জন্য যেন সেটা আরেকটা হার। ম্যাচ শেষে সতীর্থদের সঙ্গে দর্শকদের অভিবাদন নেওয়ার সুযোগও হয়নি। ক্লাবের এক কর্মকর্তা তাঁকে সরিয়ে নিয়ে যান। মাথা নিচু করে একাই হেঁটে যান টানেলের দিকে। পেছন থেকে তখনো ঝরে পড়ছে তির্যক মন্তব্য। কেউ তাঁর গায়ে ছুড়ে মেরেছেন স্কার্ফও।

আগামী মঙ্গলবার ট্রান্সফার উইন্ডো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই গ্রীষ্মে দলবদলের বাজারে সবচেয়ে বড় নাটকটির শেষ কোথায়, কেউ জানে না।

এই সপ্তাহে তিনটি অনুশীলন মিস করেছেন আলভারেজ। ক্লাব বলছে অসুস্থতা। গতকাল সেভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের দলেও ছিলেন না। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের গুঞ্জন, মানসিক অবসাদ ও বিষাদ কাটছেই না ২৬ বছর বয়সী এই তারকার। প্রশ্ন জাগে, ফুটবলের এই মধুর সম্পর্ক হঠাৎ কীভাবে এমন বিষাক্ত গল্পে রূপ নিল?

টানাপোড়েনের শুরু

গল্পটা শুধু মাঠের নয়। গ্রীষ্মজুড়েই আলভারেজকে নিয়ে টানাটানি চলছে। রবার্ট লেভানডফস্কি এমএলএসে পাড়ি দেওয়ার পর থেকে বার্সেলোনা মরিয়া হয়ে একজন স্ট্রাইকার খুঁজছে। বলা ভালো, অন্য কোনো স্ট্রাইকার নয়, তারা আলভারেজকেই চাইছে। বার্সা স্প্যানিশ চ্যাম্পিয়ন, ওদের খেলার ধরন আলভারেজের জন্য মানানসই। কিন্তু আতলেতিকো কোনো দামেই তাঁকে বার্সেলোনা বা রিয়াল মাদ্রিদের কাছে বেচতে রাজি নয়। তাদের সোজা কথা, ২০৩০ সাল পর্যন্ত চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ করতে হবে আলভারেজকে।

হুলিয়ান আলভারেজ

গত জুনে আলভারেজ নিজেই চেষ্টা করেছিলেন। ট্রান্সফার চেয়ে আবেদন করেন ক্লাবের কাছে। বিশ্বকাপ চলাকালে বলেছিলেন, ‘আমি যাদের সঙ্গে কথা বলা দরকার, বলেছি। সবার জন্য ভালো হবে যদি দলবদলটা হয়। আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।’

বার্সেলোনার সভাপতি হোয়ান লাপোর্তা একাধিকবার প্রকাশ্যে আগ্রহ দেখিয়েছেন। কিন্তু তাদের নানা চেষ্টার মুখে পাহাড়ের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আতলেতিকো মাদ্রিদ। ক্লাবের প্রধান নির্বাহী গিল মারিন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বার্সেলোনা তাদের অবমূল্যায়ন করছে, অসম্মান করেছে। স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে রাখা হয়েছে, বার্সার সঙ্গে আলভারেজকে নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি, হবেও না।

বিশ্বকাপে সাংবাদিকদের কাছে আলভারেজ প্রকাশ করেন যে স্বপ্ন পূরণের জন্য তিনি আতলেতিকো ছাড়তে চান।

আগুনে ঘি ঢেলেছে যেসব ঘটনা

নাটকটির পেছনের ঘটনাক্রম একনজরে দেখে নেওয়া যাক—

মে ২০২৬: আলভারেজের জন্য ১০ কোটি ইউরোর প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানায় বার্সেলোনা। আতলেতিকো তা অস্বীকার করে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় লামিনে ইয়ামালকে কেনার ভুয়া পোস্ট দিয়ে বার্সাকে ট্রল করে।

জুন ২০২৬: রিয়াল মাদ্রিদ সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ জানান, তাঁরা আলভারেজের জন্য ১৫ কোটি ইউরো দিতে প্রস্তুত। আতলেতিকো আবার তাদের প্রত্যাখ্যান করে।

জুন ২০২৬: বিশ্বকাপে সাংবাদিকদের কাছে আলভারেজ প্রকাশ করেন যে স্বপ্ন পূরণের জন্য তিনি আতলেতিকো ছাড়তে চান। পরবর্তী সময় বার্সেলোনার অনৈতিক ও অপেশাদার আচরণের বিরুদ্ধে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের কাছে অভিযোগ জানায় আতলেতিকো।

জুলাই ২০২৬: আলভারেজের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, তিনি আতলেতিকোর ওপর চরম বিরক্ত ও প্রতারিত বোধ করছেন। কারণ, তাঁকে আগে বলা হয়েছিল, ভালো প্রস্তাব পেলে ছেড়ে দেওয়া হবে।

আগস্ট ২০২৬: লন্ডনে গিয়ে আর্সেনালের সঙ্গে বৈঠক করেন আতলেতিকো পরিচালক। এদিকে আতলেতিকোর হয়ে মৌসুমের প্রথম ম্যাচে মাঠে নেমে সমর্থকদের দুয়োধ্বনির মুখে পড়েন আলভারেজ। একই সময় লাপোর্তা প্রকাশ্যে আলভারেজকে নেওয়ার আগ্রহ আবার প্রকাশ করেন। আতলেতিকো স্পষ্ট জানায় বার্সার কাছে বেচার সম্ভাবনা ‘০%’। অসুস্থতার কারণে অনুশীলন বর্জন করেন আলভারেজ।

ফেরার পথ কি আছে

আতলেতিকো নিজেদের এই নাটকের ‘ভুক্তভোগী’ বলছে। চুক্তি আছে ২০৩০ পর্যন্ত, তাই খেলোয়াড় ধরে রাখার অধিকারও তাদের আছে। কিন্তু প্রশ্নটা শুধু আইনের নয়, মানুষেরও। একজন ফুটবলারের মানসিক অবস্থার দায় কি ক্লাব এড়িয়ে যেতে পারে?

এই মুহূর্তে আলভারেজ যেন নিজের ক্লাবেই একঘরে। তাঁকে না খেলিয়ে রাখা, আবার ছাড়তেও না চাওয়া, এতে লাভ কী? মাঠে না নামলে শত কোটি ইউরোর স্ট্রাইকারের মূল্যই–বা কোথায়?

আতলেতিকো মাদ্রিদের আর্জেন্টাইন তারকা হুলিয়ান আলভারেজ

ভক্তদের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে গেলে ফেরানো কঠিন। ইতিহাস তাই বলে। তবু সিমিওনে আশা ছাড়ছেন না। তাঁর কথায়, ‘জীবনে সবকিছুই পাল্টানো সম্ভব।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘হুলিয়ান অনুশীলনে ফিরলে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, যেন সে আবার আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।’

সিমিওনের সামনে আঁতোয়ান গ্রিজমানের উদাহরণ আছে। ২০১৮ সালে বার্সায় যাওয়ার নাটকের পর ফিরে এসে হয়েছেন ক্লাবের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা।

আর্সেনাল কি সমাধান

সম্ভাবনার আরেকটা দরজা খোলা আছে। আর্সেনাল। লন্ডনে গিয়ে বৈঠক করেছেন আতলেতিকোর পরিচালক। শোনা যাচ্ছে, ১৫ কোটি ইউরো পেলেই আর্সেনালের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসতে রাজি আতলেতিকো।

আলভারেজের জন্য ১৫ কোটি ইউরো পেলেই আর্সেনালের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসতে রাজি আতলেতিকো।

আর্সেনাল আক্রমণভাগে নতুন তারকা খুঁজছে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দিকেও তাকিয়েছিল তারা, যদিও ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড চুক্তি বাড়িয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে। তবে আলভারেজ নিজে আবার ইংল্যান্ডে ফিরতে খুব আগ্রহী নন বলেও খবর। ম্যানচেস্টার সিটিতে দুই মৌসুম কাটিয়েছেন তিনি। তবু ফুটবলে কখনো কখনো পছন্দের চেয়ে প্রয়োজন বড় হয়ে দাঁড়ায়।

শেষ পর্যন্ত আলভারেজের কী হবে? আতলেতিকোতে থেকে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর চেষ্টা হবে, বার্সায় গিয়ে স্বপ্ন পূরণ হবে, নাকি আর্সেনালই হবে আপসের পথ? শেষ দৃশ্যের অপেক্ষায় থাকতেই হচ্ছে।