ইতালিকে ছাড়াই হচ্ছে কাতার বিশ্বকাপ
ইতালিকে ছাড়াই হচ্ছে কাতার বিশ্বকাপ

ইতালিকে ছাড়া আরেকটি বিশ্বকাপ

‘পাদ ইতালিয়ে’—সার্বো-ক্রোয়েশিয়ান ভাষায় কথাটির অর্থ ‘ইতালির পতন’। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ‘দ্য ফল অব ইতালি’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নির্মিত এই ছবির একটি পোস্টার বেশ অন্য রকম। ইংরেজি ‘আই’ অক্ষরটা একদিকে হেলানো, যা দিয়ে মূলত ইতালির পতনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গ ভিন্ন হলেও ইতালির ফুটবল যেন এখন ‘দ্য ফল অব ইতালি’র সেই হেলানো আইয়ের মতো। তবে আরেকটু গভীরভাবে দেখলে লর্দান জাফরানোভিচের সিনেমার সেই ‘আই’ ইতালির ফুটবলে এসে আর হেলানো নেই, একরকম ধসে পড়েছে।

ওপরের আলাপটা রূপক, কিছুটা সহনীয়ও। কিন্তু বাস্তবতা অতটা নয়। ইতালির ফুটবলের এমন পতন ইতালিয়ান তো বটেই, যেকোনো ফুটবলপ্রেমী মানুষের জন্যই বেদনাদায়ক। ২০১৮ বিশ্বকাপে প্রথমবার যখন এই বিপর্যয় ঘটে, বিস্ময় ও বিহ্বলতায় হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন অনেকে। এমন কিছু যে ঘটতে পারে, সেটা বিশ্বাস করতেই লেগেছে কয়েক দিন। সম্ভবত কিংবদন্তি সাহিত্যিক কাফকার ‘মেটামোরফোসিস’ গল্পে গ্রেগর সামসার ঘুম থেকে উঠে পোকা হয়ে যাওয়াও এর চেয়ে কম বিস্ময়কর ছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, অদ্ভুতুড়ে কোনো দুঃস্বপ্ন হয়তো হবে, ঘুম ভাঙলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সেদিন আর কে জানত, এই বিস্ময় ও বিহ্বলতা অন্তত এক যুগ স্থায়ী হতে যাচ্ছে। প্রথমবার যেটিকে মনে হয়েছিল আকস্মিক কোনো ঝড়, সেই ঝড়ই এখন অভ্যাস। যা চার বছর পরপর নিয়ম করে ঘটে চলেছে।

বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতালি ও চেকোস্লোভাকিয়া।

এমনকি ইতালির বিশ্বকাপ খেলতে না পারার হতাশা এত এত বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়েছে, যেকোনো বিশেষণই এখন ক্লিশে মনে হবে। পরিচিত একজনকে অনেক আগে থেকে ইতালিকে সমর্থন করতে দেখতাম। ইতালি প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে না পারার কষ্টে তিনি দল বদলে আর্জেন্টিনায় চলে গিয়েছিলেন। এরই মধ্যে উনি আর্জেন্টিনার সমর্থক হিসেবে বিশ্বকাপ জেতার স্বাদও পেয়ে গেছেন; কিন্তু সেই ইতালি আর বিশ্বকাপে ফিরতে পারেনি। এভাবে কত শত সমর্থক গত ১২ বছরে নীল বেদনায় লীন হয়ে দল বদলে ফেলেছেন, তার হিসাবই বা কে রেখেছে!

ফলে টানা তৃতীয়বারের মতো ইতালি বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ায় এবার আর কোথাও ছন্দপতন হয়নি। যেন এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এমনটা মোটেই হওয়ার কথা ছিল না। ফুটবলের প্রতি ইতালিয়ানদের দীর্ঘ ভালোবাসার গল্পগুলোর দিকে তাকালে তেমনটাই মনে হবে। আজ থেকে বহু বছর আগে ফ্লোরেন্সের লোকেরা আদর করে খেলাটির নাম দিয়েছিল ‘কালসিও’। এ নামকেই আপন করে নিয়েছিল গোটা ইতালি। ইতালির অমর চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ছিলেন ফুটবল–অন্তপ্রাণ। প্রখ্যাত দার্শনিক ম্যাকিয়াভেলি নিজে ফুটবল খেলতে ভালোবাসতেন। তাঁদের সেই ভালোবাসা এখন ছাই হয়ে গেছে। ইতালি যেন কখনো ফুটবল খেলতই না!

এবার বিশ্বকাপ বাছাইয়ের প্লে-অফ ফাইনালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার কাছে হেরে বিদায়ের পর ইতালিয়ান দৈনিক কুরিয়েরে দেল্লা সেরা শিরোনাম করেছিল, ‘দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ কার্স’। আহা! চারবারের বিশ্বকাপজয়ী দলটার কাছেই বিশ্বকাপ এখন অভিশাপ। নাকি এটা কোনো অভিশাপের ফল? ইতালি বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর যেমন অনেকে জিনেদিন জিদানের ঢুস প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জিদানকে গালি দিয়ে ঢুস খেয়েছিলেন মার্কো মাতারেজ্জি। সেই ঢুসে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় জিদানকে, তাতে ফসকে যায় ফ্রান্সের বিশ্বকাপও। কারও কারও ধারণা, জিদানকে সেদিন এভাবে বিশ্বকাপবঞ্চিত করার ফলটাই এখন পাচ্ছে ইতালি।

‘অভিশাপে’র মতো বায়বীয় বিষয় নিয়ে হয়তো অনেক কিছু লেখা যায়, খুঁজলে এমন অভিশাপের গল্প আরও অনেক পাওয়া যাবে। তাই বাস্তবতার মাঝেই কারণ অনুসন্ধান করা বরং ভালো। ইতালি জাতীয় দলের ব্যর্থতাকে ইতালির ক্লাব ফুটবলের পারফরম্যান্সের লেন্স দিয়েও দেখা যায়। ২০০৯-১০ মৌসুমে ইন্টার মিলানের পর ইতালির কোনো ক্লাব চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে পারেনি। মাঠের খেলাও একেবারে মুগ্ধ হওয়ার মতো নয়। এবার তো ইতালির কোনো ক্লাব চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালেও যেতে পারেনি। সাদা চোখে ধরা না পড়লেও, এসব কারণ একটি আরেকটির পিঠে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। যার বিস্ফোরণ আমরা গত তিন বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে দেখেছি।

১৯৮২ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ইতালি।

ইউরোপের অন্য শীর্ষ লিগগুলোর সঙ্গে তুলনায়ও ইতালির ফুটবল বেশ পিছিয়ে আছে। অর্থনীতি, কৌশলগত কিংবা ব্র্যান্ডিং—কোনো ক্ষেত্রেই অন্যদের সঙ্গে সেভাবে পেরে উঠছে না ‘আজ্জুরি’রা। এমনকি ক্লাবগুলোতে বড় তারকার উপস্থিতিও সেভাবে নেই। বরং লুকা মদরিচ কিংবা কেভিন ডি ব্রুইনার মতো তারকারা নিজেদের সেরা সময় পার করে এখন ইতালির ফুটবলে যোগ দিয়েছেন।

বড় তারকার অনুপস্থিতির পাশাপাশি নিজেরাও খেলোয়াড় তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। অথচ একসময় স্থানীয় ফুটবলারদের দাপট ছিল, যা এখন আর নেই। সব মিলিয়ে যোগ্যতা ও সামর্থ্যে পিছিয়ে পড়াও দেশটির ফুটবলে বেশ নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

অবকাঠামোগত দিক থেকেও ইতালির ফুটবল বেশ পিছিয়ে পড়েছে। একাডেমি ও ট্রেনিং ব্যবস্থাপনাও মানের দিক থেকে অসম ও সেকেলে। ইংল্যান্ড বা জার্মানির মতো আধুনিক একাডেমিভিত্তিক উন্নয়ন ইতালিতে বড় পরিসরে হয়নি। বড় ক্লাবগুলোর নতুন স্টেডিয়াম বা উন্নয়ন প্রকল্পও প্রায়ই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায়। যেমন মিলানের নতুন স্টেডিয়াম প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে আছে।

ইতালির কোচিং সংস্কৃতিও একরকম ধসে পড়েছে। ইতালিতে কোচদের ওপর স্বল্পমেয়াদি ফলের চাপ খুব বেশি বেড়ে গেছে। খারাপ ফল করলে চাকরি চলে যাচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে কোচরা কাজ করার সুযোগই পাচ্ছেন না। যে কারণে কোচরাও এখন আর ঝুঁকি নিতে চান না। তাঁরা তরুণদের সুযোগ না দিয়ে অভিজ্ঞদের খেলাচ্ছেন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বা ধৈর্য ধরে দল গড়ার পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে বললেই চলে।

১৯৩৪ বিশ্বকাপে এভাবেই মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী স্লোগান দিয়ে খেলা শুরু করতো ইতালি

ইতালির ফুটবল ধসে পড়ার অন্য কারণটা ট্যাকটিক্যাল। ইতালির ঐতিহ্য ছিল রক্ষণভিত্তিক বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবল। একসময় এটি খুব সফলও ছিল। কিন্তু আধুনিক ফুটবল এখন দ্রুতগতি, প্রেসিং ও অ্যাথলেটিসিজমের দিকে চলে গেছে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে ইতালি দেরি করেছে। ফলে তাদের পুরোনো শক্তিই এখন দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে।

খুঁজতে গেলে এমন অনেক কারণ বেরিয়ে আসবে। তবু চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের খেলতে না পারাকে বোধ হয় কোনো কারণ দিয়েই ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। পৃথিবীতে এমন ব্যাখ্যাতীত ঘটনা কদাচিৎই ঘটে। ওই যে গ্রেগর সামসার মানুষ থেকে পোকা হয়ে যাওয়ার মতোই। কিন্তু সেই পোকাটির মতো ইতালির ফুটবলও এখন আর নিজের আপন শরীরে ফিরতে পারছে না।