অনুশীলনে হাইতির ফুটবলাররা
অনুশীলনে হাইতির ফুটবলাররা

ভূমিকম্প, যুদ্ধ পেরিয়ে বিশ্বকাপে: হাইতির যে গল্প নিয়ে হতে পারে সিনেমা

যুদ্ধ। ভূমিকম্প। পরবাসে খেলার যন্ত্রণা। এত কিছু পেরিয়ে একটা দল জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বকাপে, তা–ও আবার ৫২ বছর পর! স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে আগামীকাল ভোরে যখন মাঠে নামবে ক্যারিবিয়ান দ্বীপদেশ হাইতি, তাদের গল্পটা আপনাকে রোমাঞ্চিত না করে পারবে না।

১৯৭৪ সালে হাইতি যখন প্রথম বিশ্বকাপে খেলেছিল, সেই স্মৃতি এখন হাইতিবাসীর অনেকেরই হয়তো মনে নেই। যাঁদের মনে আছে, তাঁরাও বোধ হয় ভুলে যেতে চাইবেন।

স্বৈরশাসক পরিবার দুভালিয়েরের অধীনে থাকা দেশটির বিশ্বকাপের শুরুটা হয়েছিল স্বপ্নের মতো। ইতালির বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে এমানুয়েল সানোঁর গোলে এগিয়ে যায় হাইতি, যদিও পরে হেরে যায় ৩-১ গোলে। তবে ঘটনা সেটি নয়; ঘটনা হলো, ওই ম্যাচের পর ডিফেন্ডার আর্নস্ট জাঁ-জোসেফের ডোপ টেস্টে নিষিদ্ধ পদার্থ পাওয়া যায়। এরপরের গল্পটা যেকোনো ক্রাইম থ্রিলারের মতোই।

দুভালিয়েরের গোপন পুলিশ বাহিনী পরদিন মিউনিখে হাইতি দলের হোটেল থেকে ধরে নিয়ে যায় জোসেফকে। তাঁকে মারধর করে বিমানবন্দরের একটি হোটেলে রাতভর আটকে রাখা হয়, পরদিন সকালে বিমানে পাঠিয়ে দেওয়া হয় দেশে। নির্ঘুম রাত কাটা হাইতির খেলোয়াড়েরা সেই ধাক্কা সামলে উঠতে পারেননি। পরের ম্যাচে পোল্যান্ডের কাছে বিধ্বস্ত হয় ৭-০ গোলে। পরে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে বিদায় নেয় টুর্নামেন্ট থেকেই।

এরপর চলে গেছে অনেক দিন। বিশ্বকাপে সংগ্রাম করতে থাকা হাইতি ২০১০ সালে পড়ে মহাবিপর্যয়ে। ভয়ংকর এক ভূমিকম্পে দেশের অনেক স্থাপনার মতো দেশটির ফুটবল কাঠামোও ভেঙে পড়ে, ধসে পড়ে ফেডারেশনের সদর দপ্তর। প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারা প্রাণ হারান। বলতে গেলে আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হয় তাদের।

হাইতি ফুটবল দল

সেই হাইতি ঠিকই ঘুরে দাঁড়ায়। ২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইয়ে কোস্টারিকা, হন্ডুরাস ও নিকারাগুয়ার মতো দলের সঙ্গে লড়াই করে গ্রুপ শীর্ষে থেকে চূড়ান্ত পর্বের টিকিট নিশ্চিত করে। তবে এর মধ্যেও যেতে হয়েছে আরেক অনিশ্চয়তার মধ্যে। অভ্যন্তরীণ সহিংসতা ও সশস্ত্র সংঘাতের কারণে রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সের একমাত্র জাতীয় স্টেডিয়ামটিতে চলে ভাঙচুর, হয়ে পড়ে ব্যবহারের অযোগ্য।

পুরো বাছাইপর্বে হাইতি তাই তাদের সব ‘হোম’ ম্যাচ খেলেছে এবারের বিশ্বকাপের আরেক দ্বীপদেশ কুরাসাওতে। তাদের ফ্রেঞ্চ কোচ সেবাস্টিয়ান মিনিয়ে কখনো হাইতিতেই যেতে পারেননি। ইউরোপিয়ান লিগ থেকে হাইতির বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করে তাঁকে গড়তে হয় দল।

আগামীকাল সকালে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে হাইতির একজনের ওপর চোখ রাখতে হবে আলাদা করেই। বাছাইপর্বে ছয় গোল করে দেশটির সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন বলে শুধু নয়, স্ট্রাইকার ডাকেন্স নাজুনের গল্পটাও রীতিমতো একটা সিনেমা।

ইরানের ক্লাব এস্তেগলালে খেলতেন হাইতির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা নাজুন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের সময়েই বিশ্বকাপের জন্য ভিসা সংগ্রহে প্যারিসে যাওয়ার চেষ্টায় ছিলেন তিনি। তেহরান বিমানবন্দরে বিমানে সিটবেল্ট বাঁধা অবস্থায় বসে থাকার সময়ই ইসরায়েলে থাকা এক বন্ধুর কাছ থেকে যুদ্ধের সাইরেনের খবর পান।

মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়—কেবিন ক্রু ঘোষণা দেন, সবাইকে নামতে হবে, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, আকাশসীমা বন্ধ। শুরু হয়ে যায় নাজুনের মিশন ইম্পসিবল। চোখের সামনে বোমা পড়তে থাকার আতঙ্ক নিয়ে শেষ পর্যন্ত ইরান থেকে আজারবাইজান হয়ে কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফেরেন তিনি।

হাইতির গল্পও এ রকমই নাটকীয়। যে দলের বিশ্বকাপে উঠে আসাটাই একটা সিনেমা, তারা তো জিতে যায় মাঠে নামার আগেই!