অনুশীলনে মরক্কো দল
অনুশীলনে মরক্কো দল

ব্রাজিলের জন্য কতটা ভয়ংকর হতে পারবে এই মরক্কো

২০২২ সালের ডিসেম্বরের রাত। কাতারের মাঠে তখনো খেলা শেষ হয়নি, কিন্তু মরক্কোর মারাকেশের প্রধান চত্বর জেমা এল-ফনা সরগরম ড্রাম, গান আর স্লোগানের কোরাসে।

পর্তুগালকে হারিয়ে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে মরক্কো উঠে গেল সেমিফাইনালে, উৎসবে ফেটে পড়ল মারাকেশ। শুধু মারাকেশ নয়, সেদিন কাসাব্লাঙ্কা, রাবাত, ফেজ জেগে রইল সারা রাত। চার বছর পর হয়তো আরও একবার রাত জাগতে হবে মরক্কোকে—ব্রাজিলকে বিশ্বকাপে হারানোর সুযোগ তো সব সময় আসে না!

ব্রাজিল–মরক্কো ম্যাচটা এই বিশ্বকাপে আলাদা মনোযোগ দাবি করছে অনেক কারণেই। মরক্কোর সর্বশেষ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে ওঠাটা যে কোনো অঘটন ছিল না, মরক্কো গত চার বছরে তা প্রমাণ করেছে। সেই বিশ্বকাপে পর্তুগালকে হারানোর আগে গ্রুপ পর্বে বেলজিয়াম আর দ্বিতীয় রাউন্ডে স্পেনকে হারিয়েছিল তারা। কাকতালীয়ই বটে, এই পর্তুগাল আর স্পেনের সঙ্গে মিলে ২০৩০ বিশ্বকাপ আয়োজন করবে মরক্কো।

এই বছর মরক্কো আলোচনায় এসেছে আফকনের সেই বিতর্কিত ফাইনালের কারণে। রাবাতের প্রিন্স মুলায় আবদেহাল স্টেডিয়ামে রিভিউতে গোল বাতিলের পর প্রতিবাদে ফাইনালে মরক্কোর প্রতিপক্ষ সেনেগাল মাঠই ছেড়ে গিয়েছিল।

এরপর সেনেগাল মাঠে ফেরে এবং শেষ পর্যন্ত মরক্কোকে হারিয়ে শিরোপাও জেতে। কিন্তু সেই ম্যাচের মাস দুয়েক পর আফ্রিকান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন মাঠ ছেড়ে যাওয়ার জন্য সেনেগালকে শিরোপাবঞ্চিত করে মরক্কোকে জয়ী ঘোষণা করে। ৫০ বছর পর আফকনের শিরোপা এমনভাবে মরক্কো পায়, যেটা হয়তো তারা কখনোই চায়নি।

মরক্কোর সর্বশেষ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে ওঠাটা যে কোনো অঘটন ছিল না, মরক্কো গত চার বছরে তা প্রমাণ করেছে

তবে বিশ্বকাপে তেমন কিছু হোক, মরক্কো নিশ্চয়ই চাইবে না। গতবারের মতো তাদের এবারের দলটাও দারুণ শক্তিশালী। দলের বিজ্ঞাপন হয়ে ওঠা আশরাফ হাকিমি মাত্রই টানা দ্বিতীয় চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন পিএসজির হয়ে। রিয়াল মাদ্রিদের দিয়াজকে পেয়ে শক্তিশালী হয়েছে আক্রমণভাগ।

গোলপোস্টের নিচে ভরসা হয়ে থাকা ইয়াসিন বনু তো আছেনই। একটাই দুশ্চিন্তা হতে পারে মরক্কোর নতুন কোচ মোহাম্মদ উয়াহবির জন্য। রক্ষণের স্তম্ভ নাইফ আগের্দ আর আক্রমণে আবদে এজ্জালজুলি চোটে ছিটকে পড়েছেন বিশ্বকাপ থেকে, বিশ্বকাপের আগে তাদের জন্য ধাক্কাই বটে!

মরক্কান ফুটবল এমন অনেক ধাক্কা খেতে খেতেই এখন ছুটছে এক্সপ্রেস গতিতে। এর পেছনে আছে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক দূরদর্শিতা। খেলোয়াড় টানার কথাই ধরা যাক। এই হাকিমি, দিয়াজ, আমরাবাতরা কেউই মরক্কোতে জন্ম নেননি।

ইউরোপে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলারদের একই পতাকার নিচে আনার কাজটা মরক্কো শুরু করেছে অনেক আগেই। সেটার ফল তারা পাচ্ছে এখন, জাতীয় দলের বাইরে যেটির অন্যতম বড় প্রমাণ গত বছর ফিফা অনূর্ধ্ব ২০ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়া। সেই দলের কোচ উয়াহবিই এখন জাতীয় দলের দায়িত্বে, বিদায় নিয়েছেন গত বিশ্বকাপে মরক্কোর কোচ ওয়ালিদ রেগুরাই।

এই মাঠেই ব্রাজিলের মুখোমুখি হবে মরক্কো

ভিনদেশি খেলোয়াড় নিয়ে আসার কাজটা এখন অনেক দেশই করে। তবে মরক্কোর ফুটবল-শক্তি হয়ে ওঠার কাজের বড় প্রমাণ আফ্রিকায় ফিফার সদর দপ্তর তাদের এখানে নিয়ে আসা। ২০৩০ বিশ্বকাপ আয়োজনের কথা তো আগেই বলা হয়েছে, অনেক দিক দিয়েই মরক্কো এখন আফ্রিকান ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দু। ফুটবল এখন রাজা মোহাম্মদের মরক্কোর জন্য ভূরাজনীতিতে প্রভাব রাখার একটা ‘অস্ত্র’ও বটে।

সে জন্য আয়োজনও ভালোই চলছে। কাসাব্লাঙ্কার কাছেই বেনস্লিমানে নির্মিত হচ্ছে ১ লাখ ১৫ হাজার আসনের স্টেডিয়াম, যেখানে হতে পারে ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনাল। রাবাত, ফেজ, তাঞ্জিয়ার, মারাকেশ, আগাদিরের স্টেডিয়াম সংস্কার, রেল ও সড়ক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে পাঁচ-ছয় বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চলছে, যেটা শুরু হয়েছে এই বছরের আফকনে।

তবে সবকিছুর পর এই মরক্কোকে সবাই মনে রাখবে কাতারের সেই আনন্দদায়ী ফুটবলের জন্য। আর আনন্দদায়ী ফুটবল বললেই যে দেশটির নাম সবচেয়ে বেশি আসে, সেই ব্রাজিলের বিপক্ষে তো সেটির পুনরাবৃত্তি করতে চাইবেই তারা।