আমেরিকান ব্যবসায়ী জশুয়া কুশনার
আমেরিকান ব্যবসায়ী জশুয়া কুশনার

বিশ্বকাপ বিক্রির বিতর্কে নতুন নাম, কে এই জশুয়া কুশনার

দুই দিন আগেও ফুটবল সমর্থকদের বড় একটি অংশ হয়তো তাঁর নামই শোনেননি। অথচ এখন সেই জশুয়া কুশনারই বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত মানুষদের একজন।

বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতা পরিচালনার জন্য ‘ফিফা ইভেন্টস অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট’ (এফএফই) নামে একটি নতুন কোম্পানি গঠন করে তার ২০ শতাংশ শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা করছে ফিফা। প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার মূল্যায়নে হওয়া এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে, ১২২ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফিফার একটি অংশে বেসরকারি মালিকানা যুক্ত হবে।

আর সেই বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে জশুয়া কুশনারের প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ক্যাপিটাল।

কে এই জশুয়া কুশনার?

৪১ বছর বয়সী জশুয়া কুশনার যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পরিবার কুশনার পরিবারের সদস্য। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ছোট ভাই। সে হিসেবে ট্রাম্পের বড় মেয়ে ইভাঙ্কা ট্রাম্প তাঁর ভাবি।
তবে পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো রাজনীতিতে নয়, জশুয়া নিজের পরিচিতি গড়েছেন প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগকারী হিসেবে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার পথে হাঁটেন জশুয়া। ২০০৯ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে প্রতিষ্ঠা করেন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ক্যাপিটাল। ২০২৩ সালের একটি চুক্তিতে থ্রাইভের মূল্য ধরা হয়েছিল ৫৩০ কোটি ডলার, যা এখন বাড়ার কথা। এটি প্রযুক্তি খাতের অন্যতম সফল বিনিয়োগকারী হিসেবে পরিচিত।

থ্রাইভ ক্যাপিটাল শুরুতেই বিনিয়োগ করেছিল ইনস্টাগ্রাম, স্পটিফাই, স্ল্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানে। ওপেনএআইতেও প্রতিষ্ঠানটির বড় বিনিয়োগ রয়েছে। বছর তিনেক আগে সাবেক ডিজনি প্রধান নির্বাহী বব আইগার, ভারতের শীর্ষ ধনীদের একজন মুকেশ আম্বানি, ফ্রান্সের জাভিয়ের নিয়েল এবং ব্রাজিলীয় ব্যবসায়ী জর্জ পাওলো লেমানও থ্রাইভে বিনিয়োগ করেছেন। ফোর্বসের হিসাবে জশুয়া কুশনারের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫২০ কোটি ডলার।

খেলাধুলায় অপরিচিত নন

২০১৯ সালে এনবিএর মেমফিস গ্রিজলিজের ২ দশমিক ৫ শতাংশ মালিকানা কিনেছিলেন জশুয়া কুশনার। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসারে, এনবিএর মায়ামি হিট এবং মেজর লিগ বেসবলের সান ফ্রান্সিসকো জায়ান্টসেও তাঁর সংখ্যালঘু মালিকানা রয়েছে। ফলে ক্রীড়া ব্যবসায় তাঁর আগ্রহ নতুন নয়।

তবে ফিফায় বিনিয়োগ সফল হলে সেটিই হবে জশুয়ার সবচেয়ে বড় ও আলোচিত ক্রীড়া বিনিয়োগ।

এই বিনিয়োগের জন্য থ্রাইভ ক্যাপিটাল নতুন একটি ইউনিটও গঠন করেছে, যার নাম থ্রাইভ ইটারনাল। এই ইউনিটের মাধ্যমেই ফিফার নতুন প্রতিষ্ঠানে অংশীদার হতে চায় তারা।

ট্রাম্প পরিবারের সদস্য, কিন্তু...

কুশনার পরিবারের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্ক বহুদিনের। জশুয়ার বড় ভাই জ্যারেড কুশনার ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা ছিলেন এবং ইভাঙ্কা ট্রাম্পের স্বামী। তাঁর বাবা চার্লস কুশনার যুক্তরাষ্ট্রের পরিচিত রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী। নির্বাচনী তহবিলে অবৈধ অনুদান, কর ফাঁকি ও সাক্ষীর সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে দণ্ডিত হলেও ২০২০ সালে ট্রাম্প তাঁকে ক্ষমা করে দেন। বর্তমানে তিনি ফ্রান্স ও মোনাকোয় নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত।

তবে রাজনৈতিকভাবে জশুয়া কুশনার পরিবারের অন্য সদস্যদের পথ অনুসরণ করেননি।

সুপারমডেল কার্লি ক্লসের সঙ্গে বিবাহিত জশুয়া রাজনৈতিকভাবে ডেমোক্র্যাটপন্থী। সর্বশেষ নির্বাচনগুলোয় তিনি ট্রাম্পকে সমর্থন করেননি। তাঁর স্ত্রী কার্লি ক্লস প্রকাশ্যে হিলারি ক্লিনটন, জো বাইডেন ও কমলা হ্যারিসকে সমর্থন করেছিলেন। ২০১৭ সালে ট্রাম্পের অভিষেকের পর আয়োজিত উইমেনস মার্চেও অংশ নিয়েছিলেন জশুয়া।

কেন এত বিতর্ক?

ফিফা ১২২ বছর ধরেই অলাভজনক সংস্থা হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। সুইজারল্যান্ডে এটি নিবন্ধিত একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানও। সেই প্রতিষ্ঠান প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য মালিকানার দরজা খুলতে চাইছে। তাই পরিকল্পনাটি ঘোষণার পর থেকেই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, উয়েফা ও কনক্যাকাফ ক্ষোভ জানিয়েছে, এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা করা হয়নি।
অবশ্য খেলাধুলায় প্রাইভেট ইকুইটির বিনিয়োগ একেবারে নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বেসবল, বাস্কেটবল, আমেরিকান ফুটবল ও আইস হকিতে গত এক দশকে নিয়ম পরিবর্তন করে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। স্পেনের লা লিগা ও ফ্রান্সের লিগ আঁতেও আগে সিভিসি ক্যাপিটাল পার্টনার্সের কাছে নিজেদের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অংশ বিক্রি করেছে।

লা লিগা বা লিগ আঁর ক্ষেত্রে এমন মডেল আগে দেখা গেছে। কিন্তু বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, ফুটবলের সবচেয়ে বড় আবেগও। সেই আবেগের বাণিজ্যিক মালিকানায় বাইরের বিনিয়োগকারীদের জায়গা করে দেওয়ার পরিকল্পনাই এখন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিতর্ক। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রেই উঠে এসেছেন জশুয়া কুশনার।