আমি এখন ৮২ বছর পার করছি, আগামী ২৩ অক্টোবর ৮৩-তে পা দেব। এই বয়সে রাত জেগে বা সকালে নিয়মিত খেলা দেখা কঠিন। তারপরও ফুটবলের টানে চেষ্টা করছি যতটা সম্ভব খেলা দেখার।
এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে সব দলের একটি করে ম্যাচ শেষে আমার মনে হচ্ছে, ফুটবল এখন অনেক বদলে গেছে। বড় দলগুলোর আগের সেই ‘আসব আর আরামসে জিতব’ দিন শেষ।
প্রথম ম্যাচ শেষে বড় দলগুলোর হিসাব মেলালে আমার চোখে আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সই এগিয়ে। সার্বিক পারফরম্যান্স, কোচের কৌশল ও টিমওয়ার্কের বিচারে এই দুই দলকে আমি বেশি নম্বর দেব।
আর্জেন্টিনা প্রথম ম্যাচে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বের হয়ে গেছে। সম্ভবত নিজের শেষ বিশ্বকাপে মেসির রাজসিক আগমন ঘটেছে। মেসি এই দলের প্রাণভোমরা, প্রথম ম্যাচে তার দুটি গোল ছিল দুর্দান্ত ফিনিশিং।
তবে মেসির শক্তির আসল জায়গা টিমওয়ার্ক। মেসি কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, সতীর্থরা তা ভালো করেই জানে, ঠিক সময়ে তাকে বল খুঁজে দিচ্ছে। কোচ স্কালোনি নিজে মেসির টিমমেট ছিলেন, খেলোয়াড়দের মনস্তত্ত্ব ও মেসিকে বোঝার এই ক্ষমতাটাই আর্জেন্টিনার বড় শক্তি।
অন্যদিকে ফ্রান্স যে এবারও শিরোপার অন্যতম বড় দাবিদার, তা প্রথম ম্যাচেই সেনেগালের বিপক্ষে বুঝিয়ে দিয়েছে। ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশমের খেলোয়াড়দের ওপর ভালো প্রভাব আছে।
আর কিলিয়ান এমবাপ্পে তো একাই খেলায় পার্থক্য গড়ে দিল। বিশেষ করে দূর থেকে করা তার গোলটি ছিল অসাধারণ। মেসি, এমবাপ্পে বা ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন, নরওয়ের হলান্ড—সবাই ভালো শুরু করেছে, শুধু রোনালদো ছাড়া।
ইংল্যান্ডের শুরুটাও ভালো হয়েছে। জার্মানি দ্রুত গোল পেয়ে প্রতিপক্ষ নবাগত কুরাসাওকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়ে ৭ গোল দিয়েছে। তাদের খেলা মেশিনের মতো টিমওয়ার্কের। কিন্তু জার্মানি বাদে কয়েকটি বড় দলকে প্রথম ম্যাচে বেশ ভাবনায় পড়তে হয়েছে।
যেমন পর্তুগাল, যাদের মাঝমাঠ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা। পর্তুগালের মাঝমাঠের প্রান্ত বদল করে খেলার ধরন খুবই ভালো। কিন্তু কঙ্গোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো প্রথমার্ধে ১৬ বার বল স্পর্শ করতে পেরেছে।
বয়সের কারণে ও কিছুটা ধুঁকছে, নড়াচড়া ও মুভমেন্ট কম থাকায় জায়গা তৈরি হচ্ছে না। রোনালদোকে শুধু দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না, তাকে সমর্থন করার মতো সতীর্থও লাগবে। পর্তুগালকে এই ফিনিশিংয়ের দুর্বলতা কাটাতে হবে।
স্পেন প্রথম ম্যাচে তাদের চেনা পজেশনাল ফুটবল খেললেও পারফরম্যান্স হতাশ করেছে। তাদের মধ্যে একধরনের অতি আত্মবিশ্বাস বা হালকা মনোভাব ছিল। তবে এটাও ঠিক, বক্সের ভেতর থেকে ৩-৪টি ভালো সেভ করেছে কেপ ভার্দের গোলরক্ষক।
আর ব্রাজিলকে নিয়ে আমার সংশয় অনেক দিনের। ব্রাজিলের এই দলে সেই চিরচেনা ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের অভাব। এক-দুজন ভালো খেলোয়াড় থাকলেও তাদের সমর্থন দেওয়ার মতো মানসম্পন্ন খেলোয়াড় ব্রাজিলের অভাব এই দলটিতে।
তাই ব্রাজিল এবার খুব বেশি দূর এগোবে বলে আমার মনে হয় না। ক্রোয়েশিয়ার ক্ষেত্রে আবার স্পষ্ট একটা প্রজন্মের ব্যবধান চোখে পড়েছে। আগের মতো মানসম্পন্ন খেলোয়াড় তারা আর পাচ্ছে না।
আধুনিক ফুটবলের কৌশলের দিকে তাকালে বুঝবেন, খেলাটা এখন আর শুধু মাঠে নেমে ইচ্ছামতো খেলার বিষয় নেই। এটি হয়ে গেছে দাবার ছকের মতো। বিশ্বকাপে দেখছি, প্রতিটি দল ডাগআউটে ডেটা অ্যানালাইসিস করতে বসে, প্রতিপক্ষের অস্ত্রগুলো যেন কাজ না করে সেই নিখুঁত হিসাব কষে।
আগে যেমন লম্বা বলে খেলা হতো, কোচরা এখন বোঝেন সেটি দেয়ালের বিপরীতে বল মারার মতো অর্থহীন। তাই এখন কেউ বল হারাতে চায় না। হারালেও দ্রুত কেড়ে নিতে প্রেস করে। প্রথম ম্যাচে দেখলাম স্পেন, পর্তুগাল, আর্জেন্টিনা বল পজেশন ধরে রেখে খেলার চেষ্টা করেছে।
ভালো লাগছে এশিয়ান ও আফ্রিকান ভালো করছে দেখে। আসলে বড় ও ছোট দলের পার্থক্য এখন অনেক কমে গেছে। এশীয় দেশগুলোর খেলোয়াড়েরাও ইউরোপের লিগে খেলছে। ফলে আগে ইউরোপীয় বা লাতিনদের যে শক্তির গভীরতা ও গতির কাছে তারা মার খেয়ে যেত, এখন সেই একই গতি ও শক্তিতে পাল্লা দিচ্ছে এশিয়া–আফ্রিকা।
তবে আফ্রিকানদের এখনো কার্ড, ফাউল করা বা টেম্পারামেন্টের কিছুটা সমস্যা আছে। এ ছাড়া এবারের বিশ্বকাপে গোলকিপাররা অসামান্য ভূমিকা রাখছে।
কেপ ভার্দের গোলকিপার রাতারাতি তারকা বনে গেছে। সৌদি আরবের গোলকিপারও খুব ভালো করেছে। আরও অনেক গোলকিপার তাদের দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সবশেষে বলব, দলগুলোর ট্যাকটিক্যাল সচেতনতার কারণে ম্যাচগুলো দারুণ উপভোগ্য হচ্ছে।
লেখক: সাবেক ফুটবলার ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক কোচ