
সাধারণত প্রস্তুতি ম্যাচ বা প্রীতি ম্যাচের পারফরম্যান্স দেখে একটি দলের শক্তি, সামর্থ্য কিংবা সম্ভাবনা যাচাই করা কঠিন। তবে বিশ্বকাপের স্কোয়াড ঘোষণার আগে প্রীতি ম্যাচই হয়ে ওঠে দলকে যাচাইয়ের সবচেয়ে বড় মানদণ্ড। এই ম্যাচগুলো দিয়েই বিশ্বকাপের মতো মহাযজ্ঞের জন্য দল তৈরি করা হয়। ফলে বিশ্বকাপ সামনে রেখে সদ্য শেষ হওয়া প্রীতি ম্যাচগুলোও বিশ্বকাপ নিয়ে বড় ধরনের বার্তা দিয়ে যায়। বিশেষ করে দল ঘোষণার আগে যখন সেগুলো শেষ ম্যাচ হয়।
সদ্য শেষ হওয়া আন্তর্জাতিক বিরতিতে একই রকম বার্তা দিয়ে গেছে আর্জেন্টিনা–ব্রাজিলের ম্যাচগুলোও। এই ম্যাচগুলো যদিও শেষ কথা নয়, তবে বুদ্ধিমানের জন্য নিশ্চিতভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা লুকিয়ে আছে দুই দলের এ চারটি প্রীতি ম্যাচে। চূড়ান্ত স্কোয়াডে কারা থাকবেন, ফরমেশন কী হবে এবং দল কোন কৌশল খেলবে, তা নিয়ে কাটাছেঁড়ার সময়ও দৃষ্টান্ত হিসেবে কোচদের সামনে থাকবে এই ম্যাচগুলো।
বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার জন্য এবার মার্চের আন্তর্জাতিক বিরতিটা অম্ল–মধুর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কেটেছে। এই উইন্ডোতে বিশ্বকাপ সামনে রেখে স্পেনের বিপক্ষে ‘ফিনালিসিমা’ ম্যাচ খেলার কথা ছিল তাদের। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বাতিল হয় দোহায় নির্ধারিত সেই ম্যাচ। একই সঙ্গে বাতিল হয়ে যায় কাতারের বিপক্ষে নির্ধারিত ম্যাচও।
ফলে অনেকটা বাধ্য হয়ে দ্রুত প্রতিপক্ষ বেছে নিতে হয় আর্জেন্টিনাকে। যেখানে প্রীতি ম্যাচ খেলার জন্য আর্জেন্টিনা খুঁজে পায় মৌরিতানিয়া ও জাম্বিয়ার মতো অখ্যাত দুটি দেশকে। এই দুই দলের বিপক্ষে খেলে আর্জেন্টিনার প্রস্তুতির লক্ষ্য কতটা পূরণ হয়েছে বলা কঠিন। তবে এই দুই দলের বিপক্ষে পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলেও আর্জেন্টিনার জন্য আছে সতর্কবার্তা। বিশেষ করে ফুটবল মঞ্চে অপরিচিত মৌরিতানিয়ার বিপক্ষে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের পারফরম্যান্স মোটেই আশানরূপ ছিল না।
মৌরিতানিয়ার সঙ্গে আর্জেন্টিনার র্যাঙ্কিংয়ে অবস্থানগত পার্থক্য ১১২। আর্জেন্টিনার তিনে, মৌরিতানিয়া ১১৫তম। কিন্তু এই দলটির বিপক্ষে দাপট দেখাতে পারেনি আর্জেন্টিনা। ২–১ গোলে জিতলেও আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এই ম্যাচে লিওনেল মেসি বেঞ্চ থেকে নামেন বিরতির পর। প্রথমার্ধে মেসির অনুপস্থিতির প্রভাব ছিল স্পষ্ট। ম্যাচে আর্জেন্টিনার চেয়ে বেশি শটও নিয়েছে মৌরিতানিয়া। এখন মেসি না থাকলে দল যদি ধুঁকতে শুরু করে, তবে তা স্কালোনির কপালের ভাঁজ বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট।
রক্ষণে দুর্বলতা স্পষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সেদিন মিডফিল্ডসহ অন্য পজিশনের খেলাও আর্জেন্টিনার নিয়ন্ত্রণে ছিল না। এমনকি খেলা শেষে আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ফিনালিসিমা না হওয়ায় স্বস্তিও প্রকাশ করেন। বলেন, স্পেনের বিপক্ষে ‘এমন খেললে নির্ঘাত হেরে যেতেন’ তাঁরা। বিশ্বকাপের আগে র্যাঙ্কিংয়ে বিশাল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা একটি দলের বিপক্ষে এই পারফরম্যান্স দলটির জন্য অশনিসংকেতই ছিল। যদিও পরের ম্যাচে জাম্বিয়ার বিপক্ষে ৫–০ গোলে জিতে সেই ধাক্কা কিছুটা সামলে নিয়েছে তারা। তবে র্যাঙ্কিংয়ের ৯২তম জাম্বিয়ার বিপক্ষে বড় জয় কি আসলেই সঠিক বার্তা দিতে পারছে?
এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়ার সুযোগ নেই। বিশ্বকাপে দলের মনোযোগ, লক্ষ্য, প্রস্তুতি ও উদ্দেশ্য সবকিছুই ভিন্ন থাকবে। মেসির উপস্থিতিও আর্জেন্টিনাকে অন্যভাবে উজ্জীবিত করবে। তাই এই দুই ম্যাচের পারফরম্যান্স দিয়ে আগাম ভবিষ্যৎদ্বাণী করার সুযোগ নেই। কিন্তু আর্জেন্টিনা দলের পারফরম্যান্স যদি এমনই হয়, তবে তা যেকোনো বিবেচনায় বিপজ্জনকই।
এই দুই ম্যাচের পারফরম্যান্স মূলত বড় ভূমিকা রাখবে দল গঠনে। গত বুধবার ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে কোচ লিওনেল স্কালোনি স্বীকার করেন যে ৫৫ জন খেলোয়াড়ের একটি তালিকা ইতিমধ্যেই আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশনে (এএফএ) জমা দেওয়া হয়েছে। এরপর তিনি ব্যক্তিগত সক্ষমতা বিবেচনা করে চূড়ান্ত দলে কারা থাকবেন, তা নির্ধারণ করতে শুরু করবেন।
এই তালিকায় ইতিমধ্যেই কয়েকজন খেলোয়াড় আছেন যাঁরা প্রায় নিশ্চিতভাবে টুর্নামেন্টে অংশ নেবেন। এই দুই ম্যাচে পারফরম্যান্স বাদ দিলেও দলের কিছু পজিশনে খেলোয়াড় নিশ্চিত। তবে শেষ পর্যন্ত দেখা মিলতে পারে কিছু চমকেরও। যেমন রিয়াল মাদ্রিদ মিডফিল্ডার ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোর থাকা কিংবা না থাকা দুটোই চমক হয়ে আসতে পারে। একইভাবে চোখ থাকবে জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নির দিকেও। তবে এ দুজন থেকে স্কালোনি হয়তো একজনকেই বেছে নেবেন।
রক্ষণে বলা যায় মার্কোস সেনেসির কথাও। তাঁকে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও নিকোলাস ওতামেন্দির বিকল্প ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু মৌরিতানিয়ার বিপক্ষে পারফরম্যান্সও আশানরূপ ছিল না। ফলে তাঁকে লড়তে হতে পারে ফাকুন্দো মেদিনা ও লিওনার্দো বালের্দির সঙ্গে। দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন ভ্যালেন্টিন বার্কোও, যিনি লেফট ব্যাক বা মিডফিল্ডার হিসেবে খেলতে পারেন, জাম্বিয়ার বিপক্ষে একটি গোলও করেছেন। ফলে ২৬ জনের দলে ডাক পাওয়ার দাবিদার হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বার্কো।
২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে হার দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করে পরে শিরোপা জিতেছিলেন মেসিরা। সেই ম্যাচ মাথায় রাখলে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনাকে বিচার করা কঠিনই। আর বিশ্বকাপ আসতে আসতে আরও অনেক কিছু হয়তো স্পষ্ট হবে। সে পর্যন্ত চোখ রাখাটাই আপাতত বুদ্ধিমানের কাজ।
আর্জেন্টিনার মতো ব্রাজিলকে অবশ্য প্রস্তুতি ম্যাচের দল নিয়ে আক্ষেপ করতে হচ্ছে না। প্রস্তুতির জন্য ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার মতো শক্তিশালী দুই প্রতিপক্ষকেই পেয়েছে তারা। যেখানে ফ্রান্সের কাছে ২–১ গোলে হারের পর ক্রোয়াটদের বিপক্ষে ব্রাজিল জিতেছে ৩–১ গোলে। আর্জেন্টিনার মতো অম্ল–মধুর ফল নিয়েই এখন বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াড গঠনে মনোযোগ দিতে হবে ব্রাজিলকে।
এই মুহূর্তে ব্রাজিলের মূল সমস্যার নাম চোট। চোটের কারণে গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে ব্রাজিল দলে অনুপস্থিত নেইমার। অন্যদিকে রদ্রিগো আগেই বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছেন। চোট নিয়ে আপাতত বাইরে আছেন রাফিনিয়াও। বিশ্বকাপ আসতে আসতে চোট ব্রাজিল দলকে আরও চাপে ফেলে কি না সেই আশঙ্কাও এখন সমর্থকদের মনে জাগতে পারে। তবে চোট সমস্যা বাদ দিলেও কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিল দল এখনো ভক্তদের আশ্বস্ত করার মতো পারফরম্যান্স করে দেখাতে পারেনি।
আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল এখন পর্যন্ত ১০ ম্যাচ খেলেছে। যার ৫টিতে জিতেছে, ৩টিতে হেরেছে এবং ২টিতে ড্র করেছে।
দলের খেলায় ধারাবাহিকতার অভাব স্পষ্ট। এখনো নির্দিষ্ট কোনো কৌশল থিতু হতে পারেনি দলটি। এক ম্যাচে দারুণ কিছু করে দেখাচ্ছে তো পরের ম্যাচে ধসে পড়ছে। আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল এখন পর্যন্ত ১০ ম্যাচ খেলেছে। যার ৫টিতে জিতেছে, ৩টিতে হেরেছে এবং ২টিতে ড্র করেছে। গত বছরের অক্টোবরের কথাই ধরা যাক—দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে মুগ্ধতা ছড়িয়ে ৫–০ গোলে জেতা দলটি পরের ম্যাচে ৩–২ গোলে হেরে যায় জাপানের কাছে। নভেম্বরেও ছিল একই অবস্থা। সেনেগালের বিপক্ষে ২–০ গোলে জেতার পর ১–১ গোলে ড্র করেছে তিউনিসিয়ার সঙ্গে।
তিনটি আন্তর্জাতিক বিরতিতে ব্রাজিলের ছয়টি ম্যাচের পারফরম্যান্সের চিত্র মোটেই আশ্বস্ত করার মতো নয়। বিশ্বকাপে এক ম্যাচ ভালো খেলে অন্য ম্যাচে খারাপ খেলার সুযোগ নেই। ধারাবাহিকভাবে জিতেই শিরোপা জিততে হবে।
ব্রাজিলের এই উত্থান–পতনময় পারফরম্যান্সের পেছনে ভূমিকা রেখেছে দলের খেলোয়াড়দের অধারাবাহিকতা। ভিনিসিয়ুস–রাফিনিয়ারা এক ম্যাচে জাদু দেখানোর পর পরের ম্যাচে নিষ্প্রভ হয়ে পড়ছেন। আগামী কিছুদিন মূলত এই রোগের টোটকা খুঁজে বের করার দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে হবে আনচেলত্তিকে। নয়তো এক ম্যাচে ‘জোগো বনিতো’ বা সুন্দর ফুটবল উপহার দেওয়ার পর আরেক ম্যাচে দেখতে হতে পারে হতাশার বিদায়।
পারফরম্যান্সে উত্থান–পতন থাকলেও ব্রাজিলের দলের স্কোয়াড মোটামুটি অনুমেয়। ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যমের দাবি এরই মধ্যে নাকি ২৪ জনের নাম চূড়ান্ত করেছেন আনচেলত্তি। তবে দল ঘোষণার সময় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকবেন নেইমার। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর আর ব্রাজিল দলে না খেলা নেইমারকে নিয়ে উভয়সংকটে পড়বেন আনচেলত্তি। লম্বা সময় ধরে দলে না থাকা নেইমার বিশ্বকাপে নেমেই কতদূর মানিয়ে নিতে পারবেন, সেই আশঙ্কা আছে। আছে ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার শঙ্কাও। আবার তাঁকে না রাখার আগাম সমালোচনা ও চাপ সইতে হচ্ছে ইতালিয়ান এ কোচকে। দেখা যাবে, ব্রাজিলের সামগ্রিক পারফরম্যান্সকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে নেইমারের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি দিয়ে। তবে আনচেলত্তির জন্য সবচেয়ে স্বস্তির হবে যদি নেইমারকে নিয়েই ব্রাজিল জ্বলে উঠতে পারে। তার আগে অবশ্য নেইমারের দলে জায়গা পাওয়ার মতো ফিট থাকাও জরুরি।
নেইমার ছাড়াও ব্রাজিল দলে আরও কিছু চমক থাকতে পারে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে জয়ে শেষ দিকে নেমে ভূমিকা রাখা এনদ্রিকের জায়গা পাওয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত জায়গা পেতে তাঁকে লড়াই করতে হবে লুকাস পাকেতা এবং ইগর থিয়াগোর সঙ্গে।
দল যেমনই হোক, অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় আইকন হতে পারেন কোচ আনচেলত্তি নিজেই। একাধিক তারকা নিয়ে ধুঁকতে থাকা দলটি শেষ পর্যন্ত আনচেলত্তির অভিজ্ঞতা ও কৌশলে ভরসা রেখে পরিত্রাণ খুঁজেছে। সে জন্য দেশি কোচের ঐতিহ্যও ভেঙেছে তারা। এখন আনচেলত্তি বিশ্বমঞ্চে ব্রাজিলের ত্রাতা হতে পারেন কি না, সেটাই দেখার অপেক্ষা।