বর্তমানের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা মাথায় রেখেই ২৫ বছর বয়সী গর্ডনকে দলে নিয়েছে বার্সেলোনা।
বর্তমানের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা মাথায় রেখেই ২৫ বছর বয়সী গর্ডনকে দলে নিয়েছে বার্সেলোনা।

রাশফোর্ডকে ছেড়ে গর্ডনকে কেন বেছে নিয়েছিল বার্সেলোনা, মিলছে উত্তর

ফুটবলে কিছু সিদ্ধান্তের উত্তর পাওয়া যায় সঙ্গে সঙ্গেই।
কিছু সিদ্ধান্তের উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হয়। আবার কিছু সিদ্ধান্ত এমন, যেগুলো নেওয়ার সময় মনে হয় বিরাট এক জুয়া খেলতে নেমেছে ক্লাব। সফল হলে দূরদর্শিতা, ব্যর্থ হলে নির্বুদ্ধিতা!

সর্বশেষ গ্রীষ্মকালীন দলবদলে বার্সেলোনা যখন মার্কাস রাশফোর্ডকে স্থায়ীভাবে না রেখে অ্যান্টনি গর্ডনের পেছনে বিপুল অর্থ খরচ করার সিদ্ধান্ত নিল, তখন সেটিকে জুয়া বলেই মনে হয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, যে খেলোয়াড় ইতিমধ্যে নিজেকে প্রমাণ করেছেন, তাঁকে ছেড়ে কেন এমন একজনের পেছনে ছুটছে বার্সেলোনা, যাঁকে নতুন করে সবকিছু প্রমাণ করতে হবে?

মৌসুমের মাত্র ১০ ম্যাচ পেরিয়েছে। এখনই চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় আসেনি। তবে গর্ডন এরই মধ্যে এমন কিছু করে দেখিয়েছেন, যাতে বার্সেলোনার সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তিটা পরিষ্কার হতে শুরু করেছে।

গত মৌসুমে লিগসহ বার্সেলোনার দুটি শিরোপা জয়ের পথে ইংলিশ ফরোয়ার্ড রাশফোর্ডের অবদান ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ধারে খেলতে এসে ৪৯ ম্যাচে ১৪ গোল করেছেন, সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ১৫টি। সব ম্যাচে শুরুর একাদশে জায়গা নিশ্চিত না থাকলেও সুযোগ পেলেই নিজের কার্যকারিতা বুঝিয়েছেন।

৮ কোটি ইউরোতে বার্সেলোনা কিনেছিল গর্ডনকে।

গতি, গোল করার দক্ষতা আর ফাঁকা জায়গা কাজে লাগানোর ক্ষমতা দিয়ে বার্সেলোনার আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন রাশফোর্ড। সবচেয়ে বড় কথা, হান্সি ফ্লিকের খেলার ধরনটাও তাঁর চেনা হয়ে গিয়েছিল। তার ওপর মাত্র ৩ কোটি ইউরোয় তাঁকে স্থায়ীভাবে দলে নেওয়ার সুযোগ ছিল বার্সেলোনার সামনে। বর্তমান ফুটবলের দলবদলের বাজারে এমন একজন খেলোয়াড়ের জন্য অঙ্কটা খুব বেশি নয়।

তারপরও বার্সেলোনা অন্য পথে হাঁটল। ৮ কোটি ইউরোতে কিনল গর্ডনকে। কেন? উত্তরটা লুকিয়ে আছে ফ্লিকের ফুটবলদর্শনে।

জার্মান কোচের ফুটবলে শুধু বল পায়ে ভালো খেললেই চলে না। বল পায়ে না থাকলেও খেলতে হয় সমান তীব্রতায়। প্রতিপক্ষের পায়ে বল থাকলে তাকে তাড়া করতে হয়। জায়গা বন্ধ করতে হয়। আক্রমণ শুরুর আগেই আক্রমণ থামানোর চেষ্টা করতে হয়।

রাশফোর্ডের সীমাবদ্ধতা ছিল এখানেই। বিশেষ করে প্রতিপক্ষ যখন নিচে নেমে জমাট রক্ষণ গড়ে তুলত, তখন তাঁর কার্যকারিতা কমে যেত। বল ছাড়া তাঁর নড়াচড়া কিংবা প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার তীব্রতাও সব সময় ফ্লিকের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারত না। গত মৌসুমে রাফিনিয়া চোটে পড়ার পর রাশফোর্ড তাঁর জায়গায় খেলেছিলেন। কিন্তু বল ছাড়া রাফিনিয়া যে পরিমাণ পরিশ্রম করতেন, রাশফোর্ডের খেলায় সেটির ঘাটতি চোখে পড়েছিল।
আর ঠিক এই জায়গাতেই গর্ডন আলাদা।

গর্ডন আসলে কী দিচ্ছেন বার্সেলোনাকে

রাশফোর্ডকে ছেড়ে অ্যান্টনি গর্ডনকে দলে ভেড়ানো বার্সেলোনার জন্য একসময় বিরাট জুয়া বা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলেই মনে হয়েছিল।

নিউক্যাসলের সাবেক উইঙ্গার গর্ডনকে শুধু গতির জন্য দলে নেওয়া হয়নি। তাঁকে নেওয়া হয়েছে এমন এক ফুটবলার হিসেবে, যিনি ফ্লিকের ফুটবলদর্শনের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারবেন।
মৌসুমের প্রথম ১০ ম্যাচের ৭টিতেই শুরুর একাদশে ছিলেন ২৫ বছর বয়সী ইংলিশ উইঙ্গার। সব মিলিয়ে খেলেছেন ৯ ম্যাচ। গোল করেছেন ২টি, করিয়েছেন ৫টি। সংখ্যাগুলো ভালোই। তবে তাঁর আসল অবদান বুঝতে হলে শুধু গোল আর অ্যাসিস্টের হিসাবে চোখ রাখলে চলবে না। দেখতে হবে, বল যখন তাঁর পায়ে থাকে না, তখন তিনি কী করেন।

প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের তাড়া করেন গর্ডন। বিপক্ষের ফুলব্যাককে অনুসরণ করে নিজেদের রক্ষণে সাহায্য করেন। সুযোগ পেলেই রক্ষণভাগের পেছনের ফাঁকা জায়গায় দৌড় দেন। কখনো তাঁর সেই দৌড়েই তৈরি হয় আক্রমণের সুযোগ, কখনো আবার সতীর্থদের জন্য খুলে যায় জায়গা।
ফ্লিকের ফুটবলে এই ছোট ছোট কাজের মূল্য অনেক। কারণ, বার্সেলোনার আক্রমণাত্মক ফুটবলের অন্যতম ভিত্তি প্রতিপক্ষকে ক্রমাগত চাপে রাখা। বল হারানোর পর যত দ্রুত সম্ভব সেটি ফিরে পাওয়া। গর্ডন এই কাজটা করেন স্বাভাবিক দক্ষতায়।

নিউক্যাসলে থাকার সময় থেকেই বল ছাড়া তাঁর পরিশ্রমের সুনাম ছিল। স্পেনে এসে সেটিকে যেন আরও এক ধাপ ওপরে নিয়ে গেছেন। তবে গর্ডনের আরেকটি বড় অবদান আছে। সেটি বার্সেলোনার আক্রমণে ভারসাম্য এনে দেওয়া।

ডান প্রান্তে লামিনে ইয়ামাল থাকলে কী হয়, সেটা এখন আর কাউকে বুঝিয়ে বলতে হয় না। তরুণ এই উইঙ্গার বল পায়ে পেতে ভালোবাসেন। প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে ভেতরে ঢোকেন। সুযোগ তৈরি করেন। আক্রমণের অনেক কিছুই আবর্তিত হয় তাঁকে ঘিরে। কিন্তু দুই প্রান্তের দুই উইঙ্গারই যদি সব সময় বল পায়ে চান, তাহলে আক্রমণে কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়। গর্ডন সেই সমস্যার সমাধান দিচ্ছেন।

ইয়ামাল যখন ডান দিকে বল নিয়ে প্রতিপক্ষের মনোযোগ নিজের দিকে টেনে নেন, গর্ডন তখন বাঁ প্রান্তে ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেন। কখনো রক্ষণভাগের পেছনে ছুটে যান, কখনো এমন জায়গায় অবস্থান নেন, যেখান থেকে পেদ্রি কিংবা অন্য কোনো সৃজনশীল মিডফিল্ডার সহজেই তাঁকে বল বাড়াতে পারেন। অর্থাৎ ইয়ামাল যেখানে বল পায়ে জাদু দেখাতে চান, গর্ডন সেখানে বল ছাড়াই নিজের কাজটা করে যান। দুজনের খেলার ধরন আলাদা। কিন্তু সেই পার্থক্যটাই বার্সেলোনার আক্রমণকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলছে।

গর্ডনকে পেয়ে আক্রমণভাগে দারুণ বৈচিত্র্য খুঁজে পেয়েছে বার্সেলোনা।

রাশফোর্ডকে স্থায়ীভাবে না রাখার মানে এই নয় যে বার্সেলোনা তাঁর সামর্থ্য নিয়ে সন্দিহান ছিল। বরং কাতালানরা এমন একজনকে চেয়েছে, যিনি বর্তমানের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের পরিকল্পনাতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন। সে কারণেই রাশফোর্ড নন, ২৫ বছর বয়সী গর্ডন।
তবে ফুটবলে অন্য একটা পথও আছে। আজ যে সিদ্ধান্তকে দূরদর্শিতা মনে হচ্ছে, কাল সেটিই ভুল প্রমাণিত হতে পারে। আবার আজকের প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তই একদিন হয়ে উঠতে পারে সাফল্যের সবচেয়ে বড় কারণ। গর্ডন এখন সেই দুই সম্ভাবনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে।

বার্সেলোনা আপাতত উত্তর পেতে শুরু করেছে। পুরো উত্তরটা লিখতে হবে গর্ডনকেই।