এক ম্যাচেই ভোজিনিয়াকে চিনে ফেলল বিশ্ব
এক ম্যাচেই ভোজিনিয়াকে চিনে ফেলল বিশ্ব

মাকে না দেখলে কেমন লাগে, বিশ্বকাপ তার কতটা জানে

মুহূর্তটা উষ্ণ করে হৃদয়কে, কিন্তু কথাগুলো মর্মন্তুদ। তখন ভোজিনিয়াকে আরও বেশি আপন লাগে। মনে হয়, আমাদের মতোই কেউ।

কিন্তু ভোজিনিয়া তা নন। দেশে আপন ঘরানায় বিশ্বকাপের আগেই কিংবদন্তি। কেপ ভার্দে বলেই তাঁর নামটা দেশের বাইরে ফোটেনি। বাবা-মা তো সেখানে দূর অস্ত! গুগল করলে দেখায়, ভোজিনিয়ার মা–বাবার সুনির্দিষ্ট নাম মিডিয়ায় বা অফিশিয়ালি প্রকাশ হয়নি।

খেলা শেষে ভোজিনিয়া যখন সতীর্থকে জড়িয়ে ধরে মনে ভেজান, তখন মনে হলো কোথাও উথালপাতাল ঢেউ উঠেছে। ভোজিনিয়ার চোখের জলে সেই জায়গাও টলটলে স্পষ্ট হলো। অন্তর। সবারই থাকে। তখন তাঁকে আরও বেশি সাধারণ লাগে।

মনে হয়, এমন মুহূর্তে এমন সব আবেগেই তো আমরা ভেসে যাই। তারকাখ্যাতিতে অভ্যস্তরা তা পারেন না। কিন্তু ভোজিনিয়াও ততক্ষণে তারকা। ইনস্টাগ্রামে অনুসারী বাড়ছিল রকেটের গতিতে।

যখন লেখাটি পড়ছেন, হয়তো তখনো। ম্যাচের আগে অনুসারী ৪৫ হাজার। ম্যাচ শেষে ১০ লাখ পেরিয়ে। আজ বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত ৫৯ লাখ। হয়তো আজই কোটি পেরোবে।

দেয়ালের নাম ভোজিনিয়া!

অর্থাৎ ভোজিনিয়ার কেবল শুরু। তাই আবেগের বাঁধ ভেঙেছে। সেটা হতো না হয়তো, যদি আগেই দুনিয়া তাঁকে চিনত। চেনে না বলেই, চেনার পর ভোজিনিয়ার কথাগুলো একদম মর্মমূলে আঘাত করে, ‘খেলা শেষে কেঁদেছি কারণ, দাদা-দাদির কাছে বড় হয়েছি, তাঁরা থাকতে পারলেন না।

কয়েক বছর আগে গত হয়েছেন। ভিসার সমস্যায় মা-ও এখানে থাকতে পারেনি। (ভিসার জন্য) যে টাকাটা দিতে হতো, আমরা এবার সেটা জোগাড় করতে পারিনি।’
ভোজিনিয়া এক এক করে ভেতরের ভাঙা পাড়গুলো দেখিয়ে দেন।

চার বছর আগের বিশ্বকাপ দেখেছে প্রায় ৫০০ কোটি মানুষ। হিসাব না করেও বলে দেওয়া যায়, এর মধ্যে সাধারণই বেশি। সেসব মানুষ যখন দেখেন, তাঁদের ভেতর থেকেই কেউ, যাঁকে এত দিন কেউ চিনত না, তেমন কেউ বিশ্বকাপে ‘অতিমানব’ হয়ে ওঠেন—তখন দর্শকের আগ্রহের পাড় ভাঙাও স্বাভাবিক।

নিত্য ভাঙা-গড়ার জীবন তো তাঁদেরও। সেই জীবন থেকেই ৪০ বছর বয়সী কেউ বিশ্বকাপে খেলবেন, সেটাও তাঁর দেশের অভিষেক ম্যাচ, আর সেখানে ‘সুপারম্যান’ হয়ে দুই হাতে ঠেকাবেন ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে—কেমন রূপকথা রূপকথা লাগে, বুকের ভেতর সুখের ব্যথা বাজে! ঘোরলাগা বিস্ময়ে মনে হয়, ভোজিনিয়ার মা তো বিশ্বকাপ দেখা বিশ্বজনতারই মা!

প্রিয়, বিশ্বকাপ ‘আমাদের’ সেই মাকে কেপ ভার্দের পরের ম্যাচে গ্যালারিতে এনে দেওয়া যায় না?

ভিসার ব্যাপারটা দেখে আয়োজক দেশ। ফিফা তাতে হস্তক্ষেপ করে না বলে জানিয়ে দিয়েছে সোমালিয়ার সেই রেফারি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে যাওয়ার পরপরই। সেখানে মাকে নিতে ১৫ হাজারের ডলারের (১৮ লাখ টাকার কিছু বেশি) বন্ড (ফেরতযোগ্য) জমা দিতে হতো ভোজিনিয়াকে।

সেটাই তিনি পারেননি। বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র গত জানুয়ারিতে যে কয়েকটি দেশের জন্য এই নিয়ম বেঁধে দেয়, কেপ ভার্দে তার একটি।

স্পেন কিছুতেই ভোজিনিয়ার চোখ ফাঁকি দিতে পারেনি

বিশ্বকাপে ভোজিনিয়া তাই কেপ ভার্দের ‘জাতীয় বীর’ হলেও ভেতরে–ভেতরে আসলে সাধারণ মানুষের মতোই হেরে গেছেন। জীবনের সেরা সময়ে যেকোনো কারণেই হোক, বাবা-মা পাশে না থাকলে কেমন লাগে? এই প্রশ্নের উত্তর জানলে ভোজিনিয়াকেও চেনা যায়। অতিমানব নয়, মানুষই।

শৈশবে আরও সরল। বন্ধুরা তাঁকে ‘ভোজিনিয়া’ নামে খেপিয়েছে। স্থানীয় মিশ্রিত ভাষায় (ক্রিওল) এর অর্থ ‘নানি/দাদি’। বয়সে বড়দের সঙ্গে খেলতেন। ভালো খেলতেন। তাতে লাথিও খেতে হয়েছে।

কখনো কখনো এর জবাব দিতে না পারলে থমথমে মুখে বাড়ি ফিরতেন। খেলার সাথিরা তখন তাঁকে ওই নামে ডাকলে খেপে যেতেন।

ভোজিনিয়া আসলে তাঁর আসল নাম নয়। ওই নামের খোলসে ঢাকা পড়া ব্যক্তিটির নাম জোসিমার হোসে এভোরা দিয়াস। সামরিক বাহিনীতে চাকরি করা বাবা নামটা দেন। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের মধ্যে ৩ জুন জন্ম।

বাবা প্রথমে ভেবেছিলেন, রিয়াল মাদ্রিদ ও আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকার হোর্হে ভালদানোর নামে ছেলের নাম রাখবেন। দেশে ফিরে নামটা নিবন্ধন করানোর অনুমতি পাননি। ওদিকে সেই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের রাইটব্যাক জোসিমারকেও তাঁর পছন্দ। অতএব জোসিমারের নামেই রাখা হলো নাম।

এলাকার সেরা গোলকিপার হয়েও ২৫ বছর বয়সের আগে জোসিমার পেশাদার ফুটবলে পা রাখেননি। ঘুরেছেন অ্যাঙ্গোলা, মলদোভা, সাইপ্রাস, স্লোভাকিয়ার ঘরোয়া ফুটবলে। এখন থিতু পর্তুগালে দ্বিতীয় বিভাগের দল চাভেসে।

অ্যাঙ্গোলার ক্লাব প্রোগ্রেসোয় থাকতে সেখানে জোসিমার নামে আরও এক গোলকিপার ছিলেন। জার্সিতে জোসিমার টু লিখতে চাননি। ভেবেছিলেন কেপ ভার্দেতে সবাই ‘ভোজিনিয়া’ নামে চেনে। তাই ওই নামই সই। এখন তো চেনে সারা বিশ্ব!

কিন্তু চেনার কথা ছিল না। ভোজিনিয়া ফুটবলই ছেড়ে দিয়েছিলেন! ২০২৫ আফকন বাছাইপর্বে বেশির ভাগ ম্যাচ খেলেননি। কেপ ভার্দে চূড়ান্ত পর্বে উঠতে না পারার পর ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। সামনে বিশ্বকাপ, বোঝান সতীর্থরাও।

ভোজিনিয়ার কেবল শুরু

ওই একটি স্বপ্ন পূরণই বাকি ছিল ভোজিনিয়ার, ‘(জাতীয় দলে) থেকে গেছি ওটার (বিশ্বকাপ) কারণে। ওটা আমার স্বপ্ন, আমাদের সবার।’

জনসংখ্যার বিচারে কেপ ভার্দে বিশ্বকাপে দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। অনেকে হয়তো বিশ্বকাপেই প্রথম নাম শুনেছেন। সেই দেশের কেউ চল্লিশ পেরিয়ে বিশ্বকাপে পোস্টে দাঁড়িয়ে একাই ঠেকিয়েছেন স্প্যানিশ আর্মার্ডাকে, ভাবা যায়!

যায় না বলেই, গোটা বিশ্বকাপের ইতিহাসে চল্লিশ পেরিয়ে ম্যাচে ন্যূনতম সাতটি সেভ করা দ্বিতীয় গোলকিপার ভোজিনিয়া। উত্তর আয়ারল্যান্ডের প্যাট জেনিংস উচ্চতাটি দশে তুলেছিলেন তাঁর জন্মের বছরের বিশ্বকাপে।

ভোজিনিয়া শৈশবে কখনোই ভাবেননি জীবন তাঁকে এতটা উচ্চতায় তুলবে। সে জন্য ১৮ বছর বয়সী ভোজিনিয়াকে ধন্যবাদ দিন। তাঁর পরিশ্রমেই তো আজকের ভোজিনিয়া। সেই পরিশ্রমের লক্ষ্য? স্পেনকে ঠেকিয়ে বলেছেন, ‘আমরা জীবনে খাটাখাটনি করিই এসব মুহূর্তের জন্য।’

এমন মুহূর্তে মাকে না দেখলে মানুষের কেমন লাগে, ‘বিশ্বকাপ’ তার কতটা জানে!