অ্যালেক্স ভিয়াপ্লেনের জীবনের গল্প শুনলে বুঝবেন, এই বিশেষণটা মাঝেমধ্যে কতটা ভয়ংকর আর বীভৎস হতে পারে।
অ্যালেক্স ভিয়াপ্লেনের জীবনের গল্প শুনলে বুঝবেন, এই বিশেষণটা মাঝেমধ্যে কতটা ভয়ংকর আর বীভৎস হতে পারে।

বিশ্বকাপে ফ্রান্সের প্রথম অধিনায়ক, তারপর নৃশংস খুনি ও ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যু

বিশ্বকাপ মানে তো শুধু মাঠের লড়াই নয়; এর আশপাশে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য গল্পের কোলাজ। যে গল্পের কোনোটিতে ঐতিহাসিক বিতর্ক আছে, আছে রোমাঞ্চ কিংবা অজানা চমক। বিশ্বকাপের তেমন কিছু গল্প নিয়ে এ আয়োজন—

ফুটবল মাঠে আমরা মাঝেমধ্যেই শুনি—নায়ক থেকে একনিমেষেই ভিলেন হয়ে গেলেন অমুক খেলোয়াড়। হয়তো ৮৯ মিনিট পর্যন্ত গোল করে দলকে জেতাচ্ছিলেন, শেষ মিনিটে পেনাল্টি দিয়ে বসলেন। কিন্তু ‘ভিলেন’ শব্দটা কি সব সময় এত হালকা? অ্যালেক্স ভিয়াপ্লেনের জীবনের গল্প শুনলে বুঝবেন, এই বিশেষণটা মাঝেমধ্যে কতটা ভয়ংকর আর বীভৎস হতে পারে।

একদিকে ১৯৩০ সালের ১৩ জুলাই—বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম ম্যাচে মেক্সিকোর বিপক্ষে ফ্রান্সকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এক তরুণ। ৪-১ গোলের সেই জয়ে খেললেন দারুণ।

অন্যদিকে ১৯৪৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর—ফরাসি ইতিহাসের নিকৃষ্টতম বিশ্বাসঘাতক হিসেবে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে সেই একই মানুষ। গুলি করে ঝাঁজরা করে দেওয়া হলো তাঁর বুক।

এই যে আকাশ থেকে পাতালে পতন, এর মাঝখানে লুকিয়ে আছে এক রক্তাক্ত ইতিহাস।

শুরুটা ছিল স্বপ্নের মতো

১৯০৫ সালে আলজেরিয়ায় জন্ম ভিয়াপ্লেনের। উত্তর আফ্রিকান বংশোদ্ভূত প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে তিনি ফ্রান্সের জার্সি গায়ে জড়িয়েছিলেন। ১৬ বছর বয়সে চাচার সঙ্গে থাকতে চলে যান ফ্রান্সের দক্ষিণ উপকূলে। স্থানীয় ক্লাব এফসি সেতেতে যোগ দেন। ক্লাবের স্কটিশ খেলোয়াড় কাম কোচ ভিক্টর গিবসন তাঁর মধ্যে দেখলেন অসাধারণ প্রতিভার ঝলক। সোজা প্রথম দলে তুলে নিলেন।

বিশ্বকাপের ফ্রান্সের প্রথম অধিনায়ক অ্যালেক্স ভিয়াপ্লেন।

তখনো ফ্রান্সে পেশাদার ফুটবল শুরু হয়নি। তবে ক্লাবগুলো নানা ফাঁকফোকর দিয়ে খেলোয়াড়দের অর্থ দিত। ১৯২৭ সালে সেতের প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব নিমস একটা চাকরির প্রলোভন দিয়ে ভিয়াপ্লেনকে নিজেদের দলে টানল। আসলে চাকরিটা নামমাত্র, কিন্তু বেতনটা মোটা। ক্লাবের হয়ে খেলাটাই আসল কাজ। মাঝমাঠে ভিয়াপ্লেন ছিলেন এক তেজি ঘোড়া। কড়া ট্যাকল, দুর্দান্ত হেডিং ও পাসিং। নিমসে থাকতেই ভিয়াপ্লেন হয়ে উঠলেন জাতীয় তারকা।

মোট ২৫টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন ভিয়াপ্লেন।

১৯২৬ সালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে জাতীয় দলে অভিষেক, মোট ২৫টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। আর প্রথম বিশ্বকাপের ঠিক আগে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হলো অধিনায়কের আর্মব্যান্ড। মন্টেভিডিওতে মেক্সিকোর বিপক্ষে মাঠে নামার সেই মুহূর্তকে ভিয়াপ্লেন নিজেই বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের দিন।’

কিন্তু সেই সুখের আড়ালে ছিল অন্য এক জীবনের ছায়া।

মাঠের বাইরে অন্য এক মানুষ

১৯২৯ সালে রেসিং ক্লাব দ্য প্যারিসে যোগ দিয়েই বিলাসবহুল জীবন শুরু করেন ভিয়াপ্লেন। ফ্রান্সের ফুটবলে পেশাদারত্ব শুরু হতে তখনো তিন বছর বাকি, অথচ ভিয়াপ্লেনের জীবন ছিল রাজকীয়। ক্যাবারে, বার আর ঘোড়দৌড়ের মাঠে তাঁর আনাগোনা ছিল সবার চোখে পড়ার মতো। আর এখানেই তাঁর পরিচয় হলো অন্য এক জগতের মানুষদের সঙ্গে। অন্ধকার জগতের মানুষ।

ভিয়াপ্লেন যখন আসামী।

১৯৩২ সালে পেশাদার ফুটবল বৈধ হলে তিনি নাম লেখান আঁতিবে। সেখানেও বিতর্ক পিছু ছাড়েনি। আঁতিব সেবার চ্যাম্পিয়ন হলেও পরে জানা যায় ওদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটাই ছিল পাতানো। কোচের ওপর দোষ চাপানো হলেও জনশ্রুতি ছিল ভিয়াপ্লেনই ছিলেন নাটের গুরু। এরপর নিস এবং দ্বিতীয় বিভাগের বাস্তিদিয়ান দে বোর্দোতে গিয়ে নিজের ক্যারিয়ার ধ্বংসের শেষ সীমায় নিয়ে যান তিনি। অনুশীলন ফাঁকি দেওয়া, মাঠে আলসেমি করা আর ফিটনেস হারানো ভিয়াপ্লেন ১৯৩৫ সালে ফুটবল থেকে হারিয়ে গেলেন।

তারপর ১৯৩৫ সালে আবার খবরের কাগজে নাম। এবার ফুটবলের পাতায় নয়—প্যারিস ও কোত দাজুরে ঘোড়দৌড়ে কারচুপির অভিযোগে কারাগারে!

যুদ্ধ এল, এল সুযোগ

১৯৪০ সালে নাৎসিরা যখন প্যারিস দখল করল, পুরো শহর যখন কান্নায় ভেঙে পড়েছে, ভিয়াপ্লেনের কাছে সেটি এল এক নতুন সুযোগ হয়ে। নাৎসিদের দরকার ছিল স্থানীয় সহযোগী। সেখানে উদয় হলেন অঁরি লাফো নামের এক দাগি অপরাধী। লাফো ছিলেন অনেকটা ‘কাসাব্লাঙ্কা’ ছবির সিগনর ফেরারির মতো—অবৈধ সব কাজের হর্তাকর্তা। আর কোনো এক সময়ে এই দলে ঢুকলেন ভিয়াপ্লেনও। তাঁর সে সময়ের কারবারের মধ্যে ছিল সোনা পাচারও।

এই গ্যাং ঘাঁটি গাড়ল ৯৩, রু লোরিস্তঁ-এ। প্যারিসের ইতিহাসে সবচেয়ে কুখ্যাত ঠিকানা। এরাই পরিচিত হলো ‘ফ্রেঞ্চ গেস্তাপো’ (নাৎসি জার্মানির গোপন পুলিশ) নামে। তাদের কাজ ছিল নাৎসিদের মদদ দেওয়া এবং এর বিনিময়ে নিজেদের পকেট ভারী করা। আদর্শ বলতে তাঁদের কিছু ছিল না, স্রেফ টাকার লোভে ইহুদি আর বিপ্লবীদের ধরিয়ে দিতেন তাঁরা। রু লোরিস্তঁর সেই অন্ধকার কুঠুরিতে কত মানুষের ওপর যে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়েছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

নাৎসি সহযোগী হয়ে নিষ্ঠুরতা

১৯৪৪ সালে হিটলারের বাহিনী যখন উত্তর আফ্রিকানদের দিয়ে একটি আলাদা সেনাদল গড়ার সিদ্ধান্ত নেয়, সেই ‘ব্রিগেড নর্ড আফ্রিকান’ (বিএনএ)-এর নেতৃত্বে বসানো হলো ভিয়াপ্লেনকে। রাতারাতি তিনি হয়ে গেলেন ‘এসএস সাব-লেফটেন্যান্ট’। তাঁর নিষ্ঠুরতা দেখে খোদ নাৎসিরাও হয়তো চমকে যেত।

নাৎসিদের সহযোগী হয়ে গিয়েছিলেন ভিয়াপ্লেন।

১১ জুন ১৯৪৪। দোরদোনের মুসিদান গ্রামে ফ্রান্সের ১১ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারা হলো। অভিযোগ আছে, ভিয়াপ্লেন নিজেও ট্রিগার চেপেছিলেন। লাফো-বোনি গ্যাং নিয়ে ১৯৭০ সালে প্রকাশিত ফিলিপ আজিজের নির্ভরযোগ্য বই ‘ইউ উইল বিট্রে উইথআউট শেইম’-এ এক রোমহর্ষ ঘটনার বর্ণনা আছে। এক ইহুদিকে আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে জেনেভিভ লিওনার্ড নামে এক নারীর বাড়িতে চড়াও হন ভিয়াপ্লেন। ৫৯ বছর বয়সী সেই নারীর চুল ধরে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে গিয়ে তাঁকে বাধ্য করেন দুই কৃষকের ওপর হওয়া নির্যাতন দেখতে। সেই কৃষকদের মারধর করে গায়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ভিয়াপ্লেন তখন অট্টহাসি হাসছিলেন। শেষে সেই নারীকে ভয় দেখিয়ে আদায় করেছিলেন দুই লাখ ফ্রাঁ।

শেষ পরিণতি: এক বিশ্বাসঘাতকের মৃত্যু

প্যারিস যখন মুক্ত হলো ভিলাপ্লেনের বিচার শুরু হলো আদালতে। প্রসিকিউটর তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ওরা লুট করেছে, ধর্ষণ করেছে, খুন করেছে। ভিয়াপ্লেন এসবের মাঝে দাঁড়িয়েও হাসত, যেন এসব দেখে পৈশাচিক আনন্দ পেত সে।’

চতুর ভিয়াপ্লেন বুঝেছিলেন জার্মানি হেরে যাচ্ছে। তাই শেষ দিকে নিজেকে ভালো মানুষ প্রমাণের জন্য কিছু সাজানো ‘দয়া’ দেখিয়েছিলেন। গ্রামে গিয়ে মানুষকে ভয় দেখিয়ে বলতেন, ‘জার্মানরা আপনাদের মেরে ফেলবে। আমি নিজের জীবন ঝুঁকি নিয়ে ৫৪ জনকে বাঁচিয়েছি, আপনাদেরও বাঁচাতে চাই। শুধু ৪ লাখ ফ্রাঁ দিন!’

কিন্তু নিয়তিকে তো ফাঁকি দেওয়া যায় না। ১৯৪৪ সালের আগস্টে প্যারিস মুক্ত হলো। নাৎসি বাহিনীর সন্দেহভাজন সহযোগীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হলো রক্তাক্ত প্রতিশোধ। তবে ফ্রেঞ্চ গেস্তাপোর মাথা ছিলেন যাঁরা, তাঁদের সঙ্গে সঙ্গেই পিটিয়ে মারা হয়নি। তাদের খুঁজে বের করে বিচারের সামনে দাঁড় করানো হলো। মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা হলো।

১৯৪৪ সালের বড়দিনের ঠিক পরদিন, ২৬ ডিসেম্বর। ভিয়াপ্লেন, লাফো, বোনি ও আরও পাঁচজনকে নিয়ে যাওয়া হলো শহরের উপকণ্ঠে ফোর্ট দ্য মঁরুজে।

ফায়ারিং স্কোয়াডের গুলির শব্দে শেষ হলো ভিয়াপ্লেন নামে এক নৃশংস খুনির জীবন।