এক্সপ্লেইনার

ইরান কি বিশ্বকাপে খেলবে, না খেললে কী হবে

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে উড়ছে যুদ্ধবিমান, বাতাসে বারুদের গন্ধ।

ইরানজুড়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তার আঁচ গিয়ে লেগেছে ফুটবল বিশ্বেও। ইরানি সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু এবং পাল্টাপাল্টি হামলার এই ডামাডোলে বড় এক প্রশ্নচিহ্ন ঝুলে গেছে আগামী জুনে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে হতে যাওয়া ফুটবল বিশ্বকাপের ওপর। ইরান রেড ক্রিসেন্টের তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় এ পর্যন্ত ৫৫৫ জন ইরানি নিহত হয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, এই যুদ্ধের ক্ষত নিয়ে কি আদৌ ফুটবল উৎসবে যোগ দেবে ইরান?

কেন ইরানের বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে এই অনিশ্চয়তা

ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে তিনটি প্রধান কারণ সামনে আসছে:

১. ইরানের বয়কট: নিজের দেশের ওপর এমন ভয়াবহ হামলার পর ইরান নিজেই প্রতিবাদস্বরূপ বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়াতে পারে।

২. নিরাপত্তাঝুঁকি: ফিফা বা অন্যান্য সংস্থা মনে করতে পারে যে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানি ফুটবলারদের নিরাপত্তা দেওয়া অসম্ভব।

৩. মার্কিন নিষেধাজ্ঞা: ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এরই মধ্যে ইরানি নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। যদিও ক্রীড়া দলের জন্য বিশেষ ছাড়ের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু যুদ্ধের এই আবহে সেই প্রতিশ্রুতি কতটা টিকবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।

ফিফা বলছে, ‘সব ঠিক আছে’, ইরান বলছে উল্টো কথা

ফিফার সাধারণ সম্পাদক মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রোম অবশ্য ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করছেন। গত শনিবার তিনি বলেছেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো সবাইকে নিয়ে একটি নিরাপদ বিশ্বকাপ আয়োজন করা।’ ফিফার একটি সূত্রও জানাচ্ছে, এখন পর্যন্ত সূচিতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

কিন্তু ইরানের ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদি তাজ শুনিয়েছেন আশঙ্কার কথা। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘এই হামলার পর আমাদের কাছ থেকে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার আশা করাটা বাড়াবাড়ি।’ তাঁর কথা, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন দেশটির ‘ক্রীড়া নীতিনির্ধারকদের’ হাতে।

ট্রাম্পের ‘খামখেয়ালি’

হোয়াইট হাউসের মসনদে বসার আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প কথা দিয়েছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপ হবে সবার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু সেই ট্রাম্পই এখন ইরানি নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছেন। যদিও খেলোয়াড়দের জন্য কিছুটা ছাড়ের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু গত ডিসেম্বরে ড্র অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চাওয়া ইরানি প্রতিনিধিদের ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্সের প্রধান অ্যান্ড্রু জিউলিয়ানির যুক্তি ছিল—‘প্রতিটি ভিসার সিদ্ধান্তই আসলে জাতীয় নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরান না থাকলে কী করবে ফিফা

বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘জি’–তে ইরানের খেলা ছিল নিউজিল্যান্ড (১৫ জুন), বেলজিয়াম (২১ জুন) এবং মিসরের (২৬ জুন) বিপক্ষে। এখন ইরান যদি নাম প্রত্যাহার করে, তবে ফিফার সামনে দুটি পথ খোলা আছে:

তিন দলের গ্রুপ: ইরানকে বাদ দিয়ে গ্রুপ ‘জি’-কে তিন দলের গ্রুপ হিসেবে গণ্য করা।

বিকল্প দল নেওয়া: ইরানের পরিবর্তে অন্য কোনো দেশকে সুযোগ দেওয়া।

ফিফার ২০২৬ বিশ্বকাপের নীতিমালার ৬.৫ ও ৬.৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি বা ‘ফোর্স মাজেউর’ ঘটলে ফিফা সম্পূর্ণ নিজস্ব ক্ষমতাবলে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

বিকল্প কারা হতে পারে

ইরান যদি শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ায়, তবে তার জায়গা কোন দল নেবে? এশীয় অঞ্চলের বাছাইপর্বের হিসাব বলছে, কাতার ও উজবেকিস্তান সরাসরি জায়গা করে নিলেও কপাল পুড়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের। তারা প্লে-অফে হেরেছিল ইরাকের কাছে। ইরাক আবার চলতি মাসের শেষ দিকে মেক্সিকোতে বলিভিয়া বা সুরিনামের বিপক্ষে ইন্টারকন্টিনেন্টাল প্লে-অফ খেলবে।

যদি ইরাক সেই ম্যাচে জেতে, তবে আমিরাতের দাবি জোরালো হবে। আর ইরাক হারলে তারাই হতে পারে বদলি দল। তবে ফিফা চাইলে এশিয়ার বাইরে থেকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল প্লে-অফে হেরে যাওয়া দলকেও ডেকে নিতে পারে।

সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফার সদর দপ্তর

ইতিহাস কী বলে

বিশ্বকাপের আধুনিক ইতিহাসে বাছাইপর্ব পেরিয়ে নাম প্রত্যাহারের উদাহরণ নেই বললেই চলে। সবশেষ ১৯৫০ সালে ভারত, স্কটল্যান্ড ও তুরস্ক নাম প্রত্যাহার করায় মাত্র ১৩টি দল নিয়ে বিশ্বকাপ হয়েছিল। সাম্প্রতিক উদাহরণ খুঁজতে গেলে তাকাতে হবে ২০২৫ ক্লাব বিশ্বকাপের দিকে। সেখানে মেক্সিকান ক্লাব ‘লিওঁ’ বাদ পড়ায় তাদের বদলে ‘এলএএফসি’কে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ক্লাব বিশ্বকাপ আর ফুটবল বিশ্বকাপের ব্যাপ্তি ও আয়োজনের তফাত আকাশ-পাতাল।

আয়োজক কি বদলাবে

বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র চার মাস আগে একটি অংশগ্রহণকারী দেশের ওপর আয়োজক দেশের এমন ভয়াবহ হামলার নজির ফুটবল ইতিহাসে নেই। তবে ফুটবল বোদ্ধারা মনে করছেন, এই কারণে আমেরিকার কাছ থেকে বিশ্বকাপ সরিয়ে নেওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ফিফার এমন কোনো কঠোর নিয়মও নেই, যা দিয়ে আয়োজক দেশকে দণ্ড দেওয়া যায়। অন্য দেশগুলোও এখন পর্যন্ত গণ–বয়কটের ডাক দেয়নি।