
গত বছরের অক্টোবর। ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘লেকিপ’ জেরেমি জ্যাকের কাছে জানতে চেয়েছিল, শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে কোন ডিফেন্ডারদের তিনি অনুসরণ করেন?
উত্তর এল, ‘(ভার্জিল) ফন ডাইক ও ইব্রাহিম (কোনাতে)।’
চার মাস পরের কথা। জানুয়ারির দলবদলের মৌসুমে আজ শেষ দিনে জেরেমিকে ফন ডাইক ও ইব্রাহিমের সতীর্থ বানানোর সব বন্দোবস্ত চূড়ান্ত করেছে লিভারপুল। ৬ কোটি পাউন্ডে (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা) ফরাসি ক্লাব রেনে থেকে ২০ বছর বয়সী এ সেন্টারব্যাককে কিনতে সম্মত হয়েছে অ্যানফিল্ডের ক্লাবটি। আগামী ১ জুলাই থেকে লিভারপুলে তাঁর চুক্তির মেয়াদ শুরু হয়ে শেষ হবে ২০৩১ সালে। চাইলে এই চুক্তির মেয়াদ আরও ১২ মাস বাড়ানোর সুযোগও রেখেছে লিভারপুল। কেন—সেই প্রশ্নের উত্তর পরে দেওয়া যাবে। আগে এটুকু জেনে রাখুন, ফন ডাইকের পর লিভারপুলের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দামি সেন্টারব্যাক এখন জেরেমি জ্যাকে।
ইউরোপের সংবাদমাধ্যমের খবর, জেরেমিকে চলতি মৌসুমেই চেয়েছিল লিভারপুল। কিন্তু রেনে তাঁকে এখনই ছাড়তে রাজি হয়নি। জেরেমির সুনাম বাড়ার সঙ্গে বেশ কিছু ক্লাব তাঁকে নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত লড়াইটা গিয়ে ঠেকে লিভারপুল ও চেলসির মধ্যে। স্টামফোর্ড ব্রিজের ক্লাবটি গত মাসেই তাঁকে কেনার জন্য দর-কষাকষি শুরু করেছিল। কিন্তু জেরেমি নিজেই রেনের ক্রীড়া পরিচালক রিচার্ড হিউজকে জানান, অ্যানফিল্ডই তাঁর পছন্দের গন্তব্য।এরপর চেলসির আর বলার কিছু ছিল না।
কিন্তু লিভারপুল সমর্থকদের বলার ছিল। মাত্র ২০ বছর বয়সী কাউকে লিভারপুলের মতো ক্লাব ৬ কোটি পাউন্ড খরচায় কিনলে একটু ভ্রুকুটি তো জাগেই। নিশ্চয়ই ছেলেটির মধ্যে বিশেষ কিছু আছে! অবশ্যই, তা তো আছেই। তবে জেরেমি ইউরোপিয়ান ফুটবলে একদম অচেনা, সেটাও বলা যায় না। এ মৌসুমে রেনের হয়ে ১১৯টি ডুয়েলের (বল দখলের লড়াই) ৮০টি জেতেন যে খেলোয়াড়, তাঁকে স্কাউটদের চোখে পড়াই স্বাভাবিক। লিভারপুলের স্কাউটরাও উত্তর-পশ্চিম ফ্রান্সের ক্লাবটির এই খেলোয়াড়কে চোখে চোখে রাখার পর অবশেষে ঘরে তুলতে পারলেন।
সেটার কারণও আছে। বিবিসি জানিয়েছে, লিভারপুল জেরেমির জন্য এত অর্থ খরচকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখছে। কারণটা বলেছেন ইএসপিএনের সাংবাদিক ও ফরাসি ফুটবল বিশেষজ্ঞ জুলিয়েন লরেন্স, ‘অর্থের পরিমাণ অনেক। কিন্তু আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম সেরা সেন্টারব্যাক হওয়ার সব উপকরণই জেরেমি জ্যাকের মধ্যে মজুত আছে। সে তর্কযোগ্যভাবে তাঁর প্রজন্মের সেরা সেন্টারব্যাক। লম্বা, গতিময় এবং শক্তিশালী। আর বাতাসে কিংবা মাটিতে ডুয়েলে সে যন্ত্রের মতো। খেলাটা ভালো বোঝে এবং বল দখলেও ভালো...কৌশলগতভাবে তাকে আরও উন্নতি করতে হবে এবং যেহেতু সে স্মার্ট তাই সেটা করে ভার্জিল ফন ডাইকের মতো হতে পারবে।’
সহজ কথায়, লিভারপুল আসলে ৩৪ বছর বয়সী ফন ডাইকের বিকল্প আগেভাগেই ঘরে মজুত করে রাখল। মাঝের এই সময়ে লিভারপুল কোচ আর্নে স্লট নিশ্চয়ই তাঁকে ঘষে-মেজে আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করবেন। তাঁর দরকারই আসলে সবচেয়ে বেশি। প্রিমিয়ার লিগে এ মৌসুমে ২৪ ম্যাচে ৩৩ গোল হজম করেছে লিভারপুল। রক্ষণভাগে কেউ চোট পেলে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। আর এ কারণে রেনের মূল দলে মাত্র ৩১ ম্যাচ খেললেও জেরেমির প্রতিভায় আস্থা রেখে তাঁকে এত দামে কিনতে বাধেনি লিভারপুলের। সবকিছু ঠিক থাকলে পার্মা থেকে যোগ দেওয়া আরেক সেন্টারব্যাক জেরেমি লেওনির সঙ্গে আগামী মৌসুমে লিভারপুলের রক্ষণে জুটি বাঁধতে দেখা যেতে পারে জেরেমিকে।
ফ্রান্সের বন্ডিতে জন্ম নেওয়া জেরেমির পূর্বপুরুষেরা এসেছেন ক্যারিবিয়ান গুয়াদেলুপ দ্বীপ থেকে। লিভারপুলের তাঁর ওপর নজর পড়ে অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরোয়। ফ্রান্সের রক্ষণ সামলে সেবারের ইউরোয় উয়েফার সেরা দলেও ছিলেন জেরেমি।
মজার বিষয় হলো, জেরেমির কিন্তু ডিফেন্ডার হওয়ার কথা ছিল না। রেনের বয়সভিত্তিক দলে তাঁর শুরু হয় মিডফিল্ডার হিসেবে। সম্ভবত এ কারণে ডিফেন্ডার হয়েও লাইন ব্রেকিং পাসটা খুব ভালো পারেন। সেন্টার ব্যাক হয়েছেন বেশ পরে। রেনের ২০০৫ প্রজন্মের একাডেমি গ্র্যাজুয়েট হিসেবে তাঁর ব্যাচমেট পিএসজির দেজিরে দুয়ে, টটেনহাম হটস্পারের মাতিয়াস তেল এবং বায়ার লেভারকুসেনের জিনুয়েল বেলোসিয়ান। সবাই তাঁর আগে পেশাদার ফুটবলার হলেও বেড়ে ওঠা–সম্পর্কিত অসুস্থতায় জেরেমির পেশাদার ফুটবলার হিসেবে পা রাখতে দেরি হয়।
ফ্রান্সের বন্ডিতে জন্ম নেওয়া জেরেমির পূর্বপুরুষেরা এসেছেন ক্যারিবিয়ান গুয়াদেলুপ দ্বীপ থেকে। লিভারপুলের তাঁর ওপর নজর পড়ে অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরোয়। ফ্রান্সের রক্ষণ সামলে সেবারের ইউরোয় উয়েফার সেরা দলেও ছিলেন জেরেমি। তখন থেকেই লিভারপুল তাঁর উন্নতিতে চোখ রেখেছে বলে জানিয়েছে ‘দ্য অ্যাথলেটিক’।
গত মৌসুমে লিগ টু-র ক্লাব ক্লেরমঁ ফুটে ধারে যোগ দিয়ে দারুণ পারফরম্যান্সের পুরস্কারস্বরূপ এবারের মৌসুমে লিগ আঁতে রেনের একাদশে তাঁর জায়গা পোক্ত হয়। লিগ আঁতে এবারের মৌসুমে ২০ ম্যাচের ১৮টিতেই একাদশে ছিলেন।
মৌসুম শেষেই কোনাতের সঙ্গে লিভারপুলের চুক্তির মেয়াদ ফুরোবে। এখন পর্যন্ত খবর হলো, তাঁর সঙ্গে লিভারপুলের চুক্তির মেয়াদ না বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। সে ক্ষেত্রে দলে জায়গা পোক্ত করতে নিজের আদর্শ ফন ডাইকের সঙ্গে লড়তে হতে পারে জেরেমিকে। ফন ডাইক ৩৫–এ পা রাখবেন আগামী জুলাইয়ে, চুক্তির মেয়াদ ফুরোবে ২০২৭ সালে।
রেনেতে তিনজনের ডিফেন্স লাইনে খেলেছেন বর্তমানে ফ্রান্স অনূর্ধ্ব-২১ দলে খেলা জেরেমি। ক্লেরমঁ ফুটে তাঁকে ধারে পাঠানোর কারণ ছিল নিয়মিত খেলতে চাইতেন। অর্ধেক মৌসুম সেখানে খেলার পর গত বছর জানুয়ারিতে তাঁকে ফিরিয়ে আনে রেনে। ফলটা একদম হাতেনাতেই পেয়েছে রেনে। বাতাসে জেরেমি এত ভালো যে এ মৌসুমে বাতাসে ৭৫.৫১ শতাংশ ডুয়েলই জিতেছেন—যা লিগ আঁ ডিফেন্ডারদের মধ্যে সর্বোচ্চ।
‘বল পায়ে আমি শান্ত থাকি। একটু খেয়ালিও মনে হতে পারে। কিন্তু আমি মনোযোগী। ভালোভাবে খেলানো এবং সঠিক পাসে (প্রতিপক্ষের রক্ষণ) লাইন ভাঙাটাই আমার খেলাজেরেমি জ্যাক, মিডফিল্ডার
ইউরোপে শীর্ষ পাঁচ লিগ মিলিয়ে এ মৌসুমে জেরেমির চেয়ে বেশি সময় মাঠে ছিলেন মাত্র তিনজন অনূর্ধ্ব-২১ পর্যায়ের খেলোয়াড়। আগ্রাসী ডিফেন্ডার হিসেবে জেরেমি কতটা ভালো সেটা বুঝে নেওয়া যায় তাঁর গত মৌসুমের পারফরম্যান্স থেকে—৯৯টি ট্যাকলের মধ্যে ৭৫টিতে সফল। ৯৯ বার দল বল হারানোর পর ৬৬ বার তা পুনর্দখল করেছেন। চলতি মৌসুমে ট্যাকলে তাঁর সফলতার হার ৬৭ শতাংশ।
তবে ভুল যে করেন না, সেটাও না। এ মৌসুমে শট নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনবার ভুল করেছেন, ফ্রান্সের শীর্ষ লিগে এ বিষয়ে তাঁর চেয়ে বেশি ভুল করেছেন মাত্র ৭ জন খেলোয়াড়।
নিজের খেলার স্টাইল নিয়ে লেকিপকে জেরেমি বলেছেন, ‘বল পায়ে আমি শান্ত থাকি। একটু খেয়ালিও মনে হতে পারে। কিন্তু আমি মনোযোগী। ভালোভাবে খেলানো এবং সঠিক পাসে (প্রতিপক্ষের রক্ষণ) লাইন ভাঙাটাই আমার খেলা।’