
নারী এশিয়ান কাপে টানা দ্বিতীয় হারের পর সংবাদ সম্মেলনে এসে বাংলাদেশ দলের কোচ পিটার বাটলার কোনো রাখঢাক না রেখেই দলের বাস্তবতা তুলে ধরলেন। উত্তর কোরিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ৫-০ গোলের বড় ব্যবধানে হারের পর তিনি শিষ্যদের লড়াইয়ের মানসিকতার প্রশংসা করেছেন। তবে সাংবাদিকদের প্রশ্নে দুই-একবার মেজাজ হারাতে দেখা যায় তাঁকে।
কোচ শুরুতেই স্পষ্ট করে দেন, খেলোয়াড়েরা তাঁদের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়েছেন এবং এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। বাটলার বলেন, ‘আমি মন খারাপ করিনি। আমি মোটেও মন খারাপ করিনি। আসলে আমি এই মেয়েদের নিয়ে খুব গর্বিত। তাই আমি নিশ্চিতভাবেই হতাশ নই। আর উত্তর কোরিয়ার মতো এমন একটি দারুণ দলের কাছে হারলে লজ্জার কিছু নেই।’
দলের গোলরক্ষক মিলি আক্তার আজও দুর্দান্ত ছিলেন পোস্টের নিচে, যা নিয়ে কোচের প্রশংসার শেষ ছিল না। বাটলার বলেন, ‘মিলি একজন সত্যিকারের লড়াকু চরিত্র, সে একজন সৈনিক, একজন যোদ্ধা এবং তার পটভূমি বিবেচনা করলে জীবনের প্রতি তার এই জেদ এবং উৎসাহকে আপনার প্রশংসা করতেই হবে। তাকে আজ রীতিমতো অগ্নিপরীক্ষার মুখে পড়তে হয়েছিল। আমাদের একটা দুর্বল জায়গা ছিল গোলকিপিং বিভাগ, বিশেষ করে যখন আমরা এএফসি এশিয়ান কাপের মতো এই পর্যায়ে পা রেখেছি। তবে মিলির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বলে আমি মনে করি।’
প্রথমার্ধের শেষ দিকে একযোগে তিনজন খেলোয়াড় বদলানোর কৌশল নিয়ে প্রশ্নের জবাবে বাটলার তার যুক্তি তুলে ধরেন, ‘আমার মনে হয়েছিল বিরতিতে যাওয়ার আগে আমাদের নতুনত্বের প্রয়োজন ছিল। আমার মাথায় ছিল যে চীনের বিপক্ষে গত ম্যাচে আমরা ক্লান্তির কারণে বিরতির ঠিক আগে দুটি গোল খেয়েছিলাম। তাই অনেকভাবেই বিষয়টিকে দেখা যায়, তবে আমার মনে হয়েছে তহুরার দম ফুরিয়ে এসেছিল। মনে হয়েছে আমাদের সতেজতার প্রয়োজন। কেউ বলবেন এটা ঠিক ছিল, কেউ বলবেন ভুল; তবে আমার কাছে মনে হয়েছে খেলোয়াড়েরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল এবং বিরতিতে যাওয়ার আগে আমাদের নতুন উদ্দীপনার প্রয়োজন ছিল।’
বাংলাদেশ কেন বারবার অল্প সময়ের ব্যবধানে গোল হজম করছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে কোচ কিছুটা বিরক্ত হলেও বাস্তবতা স্বীকার করে নেন। বাটলারের ভাষায়, ‘এর অনেকটা মনোযোগের অভাব থেকে হয় এবং খেলোয়াড়েরা মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। আপনাকে মনে রাখতে হবে যে ওই দলের অনেক মেয়েই অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ে খেলছে। তারা শীর্ষ মানের খেলোয়াড়, যাদের খেলা দেখার জন্য আমি টাকা খরচ করতেও রাজি। তারা একটি শীর্ষ মানের দল এবং আপনি সেটা অস্বীকার করতে পারেন না বা অজুহাত দিতে পারেন না।’
বাটলার যোগ করেন, ‘আপনি কি কখনো ভেবেছেন যে প্রতিপক্ষ যারা খেলছে তারা প্রথমার্ধের ৩০ মিনিটের মধ্যেই ৩, ৪ বা ৫-০–তে এগিয়ে থাকতে পারত? আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, মেয়েরা তাদের সবটুকু দিয়েছে। আমরা যথেষ্ট ভালো ছিলাম না। বল যখন আমাদের দখলে ছিল তখন আমরা যথেষ্ট ভালো করতে পারিনি, আবার বল যখন আমাদের কাছে ছিল না তখনো আমরা যথেষ্ট পরিশ্রম করিনি। আমরা সেই পর্যায়ে নেই এবং আমরা ভুল করবই, গোলও খাব।’
ম্যাচে বাংলাদেশের আক্রমণভাগ নিয়ে করা সমালোচনার কড়া জবাব দেন বাটলার, ‘আপনি একটি শীর্ষ মানের ফুটবল দলের বিরুদ্ধে খেলেছেন যারা আসলে আমাদের থামিয়ে দিয়েছিল। তারা অন্য গ্রহের দল। আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। আমি এই দলের অংশ হতে পেরে মোটেও লজ্জিত নই। অন্তত আমরা চেষ্টা করছি।’
বাংলাদেশের ফুটবলের বর্তমান কাঠামোগত দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করে বাটলার বলেন, ‘আজ আমি মেয়েদের যে বার্তাটি দিয়েছি তা হলো, আমরা একটি ভিন্ন শক্তির বিরুদ্ধে খেলছি। তারা একটি ভিন্ন পর্যায়ে খেলছে। আমরা এমন দলের বিরুদ্ধে খেলছি, যাদের বিপরীতে আমাদের লিগ মাত্র ১০ ম্যাচের। মাঝে মাঝে সত্যটা তিক্ত হয়। আমাদের প্রস্তুতি খুব একটা ভালো ছিল না। এই মেয়েরা যদি প্রতি সপ্তাহে উচ্চপর্যায়ে বা উন্নত লিগে খেলত, তবে জাতীয় দলে আরও শক্তিশালী অবদান রাখার সুযোগ অনেক বেড়ে যেত।’
আগামী ম্যাচের প্রস্তুতি নিয়ে কোচ জানান, ‘কাল (আজ) আমরা সিডনি যাব এবং নিজেদের প্রস্তুত করব। আমাদের শুধু নিজেদের ঝালিয়ে নিতে হবে। আমাদের দলের গড় বয়স মাত্র সাড়ে ১৯ বছর, যেখানে প্রতিপক্ষের ২৩-২৪ বছর। সুতরাং আমরা একটি ভিন্ন শক্তির বিরুদ্ধে নামছি। হ্যাঁ, আমরা আবার শুরু করব, হাসিমুখে মাঠে নামব। আমরা উৎসাহ নিয়ে আমাদের সেরাটা দেব। যদি ভালো কিছু হয়, দারুণ—আর না হলেও জীবন থেমে থাকবে না।