এমন পরিস্থিতিতেই সবাই অপেক্ষায় থাকে একজন নায়কের, একজন ত্রাতার। যিনি এগিয়ে এসে দলকে উদ্ধার করে তরি ভেড়াবেন বন্দরে। আজ ইংল্যান্ড দলও তাকিয়ে ছিল তেমন এক নায়ক ও ত্রাতার দিকে। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা যত টিকটিক করে সামনে এগোচ্ছিল, ততই বাড়ছিল শঙ্কা।
মনে হচ্ছিল, শেষ পর্যন্ত ‘ইটস কামিং হোম’ আবারও স্রেফ একটি নামসর্বস্ব স্লোগান হিসেবে থেকে যাবে। তখন অনেক ইংলিশ সমর্থকদের মনে উঁকি দিচ্ছিল ‘আইসল্যান্ড ২০১৬’ ট্র্যাজেডি। ২০১৬ ইউরোতে আইসল্যান্ডের কাছে শেষ ষোলোতে হেরে বিদায় নিয়েছিল ‘থ্রি লায়ন্স’রা।
ম্যাচ যখন দ্বিতীয়ার্ধের ৭০ মিনিট পেরিয়ে যায়, তখন এমন কিছুর শঙ্কা আরও বেড়ে যায়। এমনকি অনেকে ইংল্যান্ডের বিদায়ী এপিটাফ লিখতেও বসে যান। বারবার সবার সামনে ভেসে উঠেছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিব্রতকর বিদায়ের দুঃসহ চিত্র। তবে সেই শঙ্কাকে বাস্তবে রূপ নিতে দেননি একজন অতিমানব। তিনি হ্যারি কেইন।
ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ভরসার প্রতীক জ্বলে উঠলেন সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মুহূর্তে। প্রথমে ম্যাচের ৭৫ মিনিটে শক্তিশালী এক হেডে করেন সমতাসূচক গোলটি। অ্যান্থনি গর্ডনের নিখুঁত ক্রসে দুর্দান্ত টাইমিংয়ের সঙ্গে শক্তি যোগ করে কেইন হার মানান ডিআর কঙ্গোর পোস্টের নিচে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লিওনেল এমপাসিকে।
এরপর ম্যাচের ৮৬ মিনিটে জয়সূচক গোলটি ছিল আরও অসাধারণ। গোলের দিকে পিঠ রেখে বল নিয়ন্ত্রণে নেন কেইন, এরপর চারজন নীল জার্সিধারী ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করেন। তারপর প্রায় ৬০ মাইল বেগে এত জোরালো শট নেন যে এমপাসির পক্ষে বল আটকানোর চেষ্টাই করতে পারেননি। এই গোলেই ভেস্তে যায় কঙ্গোর ইতিহাস গড়ে শেষ ষোলোয় যাওয়ার স্বপ্ন। আরও সহজভাবে বললে, একজন কেইনের হাতেই শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয়েছে কঙ্গোকে। আর এই পারফরম্যান্সে কেইনও বুঝিয়ে দিয়েছেন, কেন তিনি এ সময়ের সেরা স্ট্রাইকার!
এই ম্যাচের আগে এই বিশ্বকাপে হ্যারি কেইনের গোল ছিল তিনটি। তবু মনে হচ্ছিল, তাঁর কাছ থেকে আরও বড় কিছু পাওয়ার বাকি আছে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে করেছিলেন জোড়া গোল, পানামার বিপক্ষে যোগ করেছিলেন আরেকটি। তবে ঘানার বিপক্ষে ছিলেন অনেকটাই নিস্তেজ। সেই ম্যাচে শেষ মুহূর্তের ভলিটি যদি জালে জড়াতে পারতেন, তাহলে গল্পটা হয়তো অন্য রকম হতো। সেদিন না হলেও আজ ঠিকই গল্পটা নিজের হাতে লিখলেন কেইন।
নিখাদ প্রতিভার প্রদর্শনী কেমন হতে পারে, দেখালেন সেই নিদর্শন। সত্যিকারের অধিনায়কোচিত এক পারফরম্যান্স, যা ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ ইতিহাসের স্মরণীয় পারফরম্যান্সগুলোর একটিও বটে। একই সঙ্গে এই ম্যাচ আবারও মনে করিয়ে দিল, ইংল্যান্ডের খেলায় যত দুর্বলতাই থাকুক না কেন, যতক্ষণ দলে কেইন আছেন, ততক্ষণ তাদের আশা বেঁচে থাকবে।
এই ম্যাচে জোড়া গোল করে কেইন শুধু দলকেই জেতাননি, ভেঙেছেন বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ডও। এই ম্যাচে করা দ্বিতীয় গোলটির মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপে গোলসংখ্যায় পেলেকে ছাড়িয়ে গেছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। কেইনের মোট গোল এখন ১৩টি, আর এবারের আসরে ৫টি।
ম্যাচ শেষে ইংলিশ কিংবদন্তি অ্যালেন শিয়ারার বলেছেন, ‘এই বিশ্বকাপে বড় তারকাদের নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, আর আজকের পারফরম্যান্সের পর হ্যারি কেইনের নামও সেই তালিকায় আরও জোরালোভাবেই উঠে আসবে। তাঁর দুটি গোলই ছিল অসাধারণ। প্রথম গোলের সময় হেড নেওয়ার জন্য তাঁর দারুণ মুভমেন্ট ছিল চোখে পড়ার মতো। আর দ্বিতীয় গোলটি? বিশ্বের খুব কম স্ট্রাইকারই এমন মুহূর্ত তৈরি করতে পারেন। যেভাবে তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন, ভারসাম্য ধরে রেখে ডিফেন্ডারদের এড়িয়ে গেলেন, তারপর নিখুঁত দিকনির্দেশনা ও দুর্দান্ত শক্তিতে বল জালে পাঠালেন—সত্যিই অনন্য এক গোল ছিল।’
প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কেইনের ইংল্যান্ড সতীর্থ এলিয়ট অ্যান্ডারসন বলেছেন, ‘অবিশ্বাস্য! ওর সঙ্গে খেলাটা সত্যিই বিশেষ এক অনুভূতি। বলটা ওর পায়ে তুলে দিয়ে এরপর শুধু তাকিয়ে থাকতে হয়—কীভাবে সে নিজের জাদু দেখায়। বল জালে জড়ানোর মুহূর্তে আমাদের সবার স্বস্তিটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’
কঙ্গো চ্যালেঞ্জ পার করার পর এবার কেইনের সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন পরীক্ষা। শেষ ষোলোতে কেইনের ইংল্যান্ড ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে নামবে স্বাগতিক মেক্সিকোর বিপক্ষে। সেই আজতেকা, যেখানে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনা নামের এক জাদুকরের দুটি বিশেষ মুহূর্তের কাছে ধরাশায়ী হয়েছিল ইংল্যান্ড। ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘শতাব্দীর সেরা গোল’–এর যে ক্ষত ইংল্যান্ড গত ৪০ বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছে, কেইন তাতে প্রলেপ দিতে পারবেন কি না, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।