কিরগিজস্তানের লিগ রানার্সআপ মুরাস ইউনাইটেডের জালে বল জড়িয়ে ইব্রাহিমের উচ্ছ্বাস
কিরগিজস্তানের লিগ রানার্সআপ মুরাস ইউনাইটেডের জালে বল জড়িয়ে ইব্রাহিমের উচ্ছ্বাস

ফর্টিসের জয়ের নায়ক ইব্রাহিম বললেন, ‘মনে হয়েছে, বাংলাদেশের হয়ে খেলেছি’

ঘরের মাঠে ইতিহাস গড়ল ফর্টিস এফসি। এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের মহাগুরুত্বপূর্ণ প্লে-অফ ম্যাচে কিরগিজস্তানের পরাশক্তি মুরাস ইউনাইটেডকে ১-০ গোলে হারিয়ে ঐতিহাসিক জয় তুলে নিয়েছে তারা। এই জয়ে প্রথমবারের মতো এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের মূল গ্রুপ পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করল বাংলাদেশের ক্লাবটি।

ম্যাচের একমাত্র ও জয়সূচক গোলটি আসে জাতীয় দলের বাইরে থাকা ফরোয়ার্ড ইব্রাহিমের পা থেকে। আবাহনী থেকে মাত্র এক মাসের জন্য ধারে ফর্টিস এফসিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। প্রথম ম্যাচেই বাজিমাত করেন এই ফরোয়ার্ড। ম্যাচ শেষে রোমাঞ্চিত ইব্রাহিম স্পষ্ট জানালেন, ক্লাবের জার্সিতে খেললেও তাঁর মনজুড়ে ছিল লাল-সবুজের পতাকা।

কোচ মাসুদ কায়সারের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে এসে তিনি বলেন, ‘আমার মাথায় এটা ছিল না যে ফর্টিসের হয়ে খেলছি। মনে হয়েছে, দেশের জন্য খেলছি। এখানে দেশটাই বড়। দেশের হয়ে অবদান রেখে গোল করতে পেরে ভীষণ ভালো লাগছে।’

উইংয়ে খেলতেই অভ্যস্ত ইব্রাহিম। তবে ম্যাচের ৫২ মিনিটে তাঁকে দেখা গেল ভিন্ন ভূমিকায়। প্রতিপক্ষের বক্সের ঠিক মুখে গাম্বিয়ান ফরোয়ার্ড ও দলের অধিনায়ক পা ওমর বাবুর কাছ থেকে দারুণ একটি পাস পান তিনি। বল ধরে কিছুটা ভেতরে ঢোকেন। এরপর ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিয়ে নিখুঁত ও জোরালো বাঁ পায়ের গড়ানো শটে বল জালে জড়ান। পুরো স্টেডিয়াম আনন্দে ভেসে ওঠে (১-০)।

জাতীয় দলের হয়ে ৪২ ম্যাচে ৪টি গোল করেছেন এই ফরোয়ার্ড। এটিই তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা গোল কি না—এমন প্রশ্নে ইব্রাহিম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ম্যাচে এর আগেও গোল করেছি। এটি সেরা গোল নয়, তবে এই ম্যাচ ও মুহূর্তটির গুরুত্ব আমার কাছে অনেক বেশি।’

গোল শোধে মরিয়া হয়েও শেষ পর্যন্ত ১–০’তে হেরেছে মুরাস

ফর্টিসের কোচ যখন এই ম্যাচের জন্য ইব্রাহিমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তখন তিনি নিজেও কিছুটা অবাক হয়েছিলেন। তবে কোচের আস্থার শতভাগ মর্যাদা দিতে পেরে ২৯ বছর বয়সী ইব্রাহিম ভীষণ খুশি, ‘কোচ আমাকে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে বলেছিলেন। আমি সেই বিশ্বাস রেখেই নিজের সেরাটা উজাড় করে খেলেছি।’

ফর্টিসের একাদশে আটজন বিদেশি ফুটবলারের বিশাল উপস্থিতি ছিল। সেই ভিড়ে আক্রমণভাগে একজন স্থানীয় ফুটবলারকে বড় ভরসা হিসেবে খেলানোটা কোচ মাসুদ কায়সারের জন্য বেশ সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল।

পেছনের গল্প ও কৌশলের কথা তুলে ধরে কোচ বলেন, ‘ফরোয়ার্ড লাইনে প্রথমে আমি অন্য দুটি নাম ভেবেছিলাম—রাকিব আর ফাহিম। কিন্তু কোনো কারণেই হোক ওদের আমি পাইনি। তখন চিন্তা করতে শুরু করি, কিরগিজস্তানের এই শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা আমাদের কার আছে? ঠিক তখনই আবাহনীর আল আমিনের পাশাপাশি ইব্রাহিমের কথা মাথায় আসে। গত বছর ঠিক এই সময়ে এএফসি প্রতিযোগিতায় কিরগিজ ক্লাবের বিপক্ষে আবাহনীর হয়ে ঢাকার মাঠে খেলেছিল ওরা। আমি শেষ পর্যন্ত সেই অভিজ্ঞতা আর পেশাদারত্বের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেই ইব্রাহিমকে বেছে নিই। আমার সেই আস্থার প্রতিদান ইব্রাহিম যেভাবে দিয়েছে, তা সত্যিই অসাধারণ।’

কোচ হিসেবে মাসুদ কায়সারের জন্য এটিই ছিল ক্লাব পর্যায়ে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। কয়েক বছর ধরে ফর্টিসের মূল কোচের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনি। তবে এই ম্যাচ তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল।

এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগে প্রথমবার খেলতে নেমে প্রথম ম্যাচই জিতে নিয়েছে ফর্টিস

প্রতিপক্ষ মুরাস ইউনাইটেড ছিল এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের গত আসরের সেমিফাইনালিস্ট। এ ছাড়া গত বছর এই ঢাকাতেই আবাহনীকে হারিয়েছিল তারা।

সব মিলিয়ে মানসিক চাপ ছিল কি না, এমন প্রশ্নে কোচ বলেন, ‘হ্যাঁ, একটা মানসিক চাপ তো অবশ্যই ছিল। তবে খেলাটা ঘরের মাঠে হওয়ায় আমাদের আত্মবিশ্বাস ছিল। দলের খেলোয়াড়েরা মাঠে নেমে আমার পরিকল্পনা শতভাগ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। ম্যাচের আগে অনেকেই বলছিলেন, তাঁরা ফর্টিসের লড়াকু ফুটবল দেখতে চান। আজ আমার দলের সবাই ৯০ মিনিট নিজেদের উজাড় করে দিয়ে সেই ফুটবলটাই খেলে দেখিয়েছে।’

ঢাকার দুপুরের প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় প্রথমার্ধের পর থেকেই কাবু হয়ে পড়েন শীতপ্রধান দেশের দল মুরাস ইউনাইটেডের খেলোয়াড়েরা। তবে শুধু আবহাওয়া নয়, দলগত পারফরম্যান্সকেই জয়ের মূল চাবিকাঠি বলছেন কোচ মাসুদ কায়সার, ‘গরমে ওরা একটু কাহিল হয়ে পড়েছিল ঠিকই। তবে গরম যা–ই থাক, ফর্টিস আজ সত্যিই ভালো ফুটবল খেলে জিতেছে। শুরু থেকেই আমরা ভালো ফুটবল খেলেছি। এই জয়ের পুরো কৃতিত্ব আমার সব খেলোয়াড়ের। এককভাবে কাউকে আলাদা করতে চাই না।’

তবে রক্ষণভাগে জাপানি সেন্টারব্যাক কাওয়াসাকি অসাধারণ খেলেছেন। প্রতিপক্ষের অনেকগুলো বিপজ্জনক আক্রমণ ও শট ব্লক করেছেন তিনি। ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় পা ওমর বাবুকে কৌশলের কারণেই শেষের দিকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। বিদেশি কোটা পূরণ প্রসঙ্গে কোচ যোগ করেন, ‘আমাদের হাতে খুব বেশি বিকল্প ছিল না। তাই গতবার এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগে খেলে যাওয়া দুই জাপানিকে স্কোয়াডে যুক্ত করি। তারাও ভালো খেলেছে।’

কিরগিজ ক্লাবটির সহকারী কোচ বলেন, ‘আমরা খেলোয়াড়দের দ্রুতগতিতে খেলতে বলেছিলাম। তারা সেটা পারেনি। এ ছাড়া গরমের কারণেও আমাদের সমস্যা হয়েছে। আমরা পেনাল্টি মিস করেছি। তবে ফর্টিসকে অভিনন্দন, তারা ভালো খেলেই জিতেছে।’