টানা ৭ ম্যাচ অপরাজিত লিভারপুল
টানা ৭ ম্যাচ অপরাজিত লিভারপুল

৭ ম্যাচ ধরে অপরাজিত লিভারপুল কি সত্যিই ছন্দে ফিরল

অ্যানফিল্ডে আজ বৃহস্পতিবার লিডসের মুখোমুখি হচ্ছে লিভারপুল। এক মাসও হয়নি গত ডিসেম্বরে এই লিডসের মাঠ এল্যান্ড রোডে খেলে এসেছে অলরেডরা। কিন্তু এই অল্প সময়েই যেন বদলে গেছে অনেক কিছু। গত ৬ ডিসেম্বরও মনে হচ্ছিল, লিভারপুলের মৌসুমটা বুঝি রসাতলে গেল! সে ম্যাচে ৩-৩ গোলে ড্রর পর কোচ আর্নে স্লটের ওপর রীতিমতো তোপ দেগেছিলেন মোহাম্মদ সালাহ। অভিযোগ ছিল, স্লট তাঁকে বেঞ্চে বসিয়ে রেখে ‘বলির পাঁঠা’ বানাচ্ছেন। ইব্রাহিমা কোনাতেদের যাচ্ছেতাই রক্ষণভাগের সুবাদে দু-দুবার এগিয়ে গিয়েও পয়েন্ট হারিয়েছিল লিভারপুল।

সেই ড্রর পর প্রিমিয়ার লিগে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা নেমে গিয়েছিল টেবিলের ১০ নম্বরে। আগের ১০ ম্যাচে জয় ছিল মাত্র দুটি। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম মৌসুমেই দলকে শিরোপা জেতানো স্লটের চাকরি থাকবে কি না—তা নিয়েই শুরু হয়ে গিয়েছিল চায়ের কাপে ঝড়।

কোচ আর্নে স্লটের ওপর রীতিমতো তোপ দেগেছিলেন মোহাম্মদ সালাহ।

তবে দৃশ্যপট বদলেছে। ব্রাইটন, টটেনহাম ও উলভসকে হারিয়ে টানা তিন জয়ে পয়েন্ট টেবিলের চারে উঠে এসেছে স্লটের দল। সালাহর সঙ্গে কোচের মান-অভিমানও এখন অতীত। আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে যাওয়ার আগে দলের সেরা তারকাকে হাসিমুখেই বিদায় দিয়েছেন ডাচ কোচ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, লিভারপুল কি আসলেই ছন্দে ফিরেছে? নাকি জয়ে ফিরলেও পারফরম্যান্সের সেই ‘শুভংকরের ফাঁকি’ রয়েই গেছে?

লিভারপুলের কোচ আর্নে স্লট

নতুন বছরকে সামনে রেখে অ্যানফিল্ডের গ্যালারিতে আশার আলো অবশ্যই দেখা যাচ্ছে। গ্রীষ্মকালীন দলবদলে আসা নতুন মুখগুলো দেরিতে হলেও মানিয়ে নিতে শুরু করেছেন। যদিও ক্লাবের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় আলেক্সান্ডার ইসাককে চোটের কারণে মার্চ পর্যন্ত মাঠের বাইরে থাকতে হবে। নিজের দ্বিতীয় গোলটি করার সময়ই পা ভেঙেছে তাঁর। মার্সিসাইডে ইসাকের অভিষেক মৌসুমটা আপাতত ‘লস প্রজেক্ট’ হিসেবেই ধরা হচ্ছে।

এখনো আলো ছড়াতে পারেননি ইসাক

তবে ইসাক না থাকলেও লিভারপুলের কপাল ভালো যে তারা উগো একিতিকের মতো একজনকে পেয়েছে। বরং একিতিকেকে এখন ইসাকের চেয়েও কার্যকর মনে হচ্ছে। ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে আসা এই ফরোয়ার্ড যে এত দ্রুত নিজেকে চিনিয়ে দেবেন, তা হয়তো লিভারপুলের রিক্রুটমেন্ট টিমও ভাবেনি।

উগো একিতিকে

১৮ রাউন্ড শেষে আর্লিং হলান্ডের পরই পেনাল্টি ছাড়া লিগে সর্বোচ্চ গোল (৮টি) এখন তাঁর। শেষ চার ম্যাচেই করেছেন ৫ গোল। স্লটের অধীন পুরো ফিটনেস ফিরে পাওয়া ২৩ বছর বয়সী এই ফরাসি এখন মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। গত শনিবার উলভসের বিপক্ষে ফ্লোরিয়ান ভির্টৎসকে দিয়ে করানো তাঁর অ্যাসিস্টটি ছিল দেখার মতো।

ভির্টৎসের সেই গোল ছিল লিভারপুলের জার্সিতে তাঁর প্রথম। ১০০ মিলিয়ন পাউন্ডের এই জার্মান তরুণের গোল উদ্‌যাপনেই বোঝা যাচ্ছিল, বুক থেকে কত বড় একটা পাথর নেমেছে! গোটা ম্যাচে উলভস রক্ষণকে নিজের পায়ের জাদুতে নাচিয়েছেন তিনি। ক্লাবের সাবেক তারকা জন অলড্রিজ তো ভির্টৎসের মুভমেন্ট দেখে গ্রেট পিটার বিয়ার্ডসলির ছায়া দেখতে পাচ্ছেন। স্লট অবশ্য বলছেন, ভির্টৎস আগে থেকেই ভালো খেলছিলেন, এখন পেশিবহুল শরীরের কারণে ইংলিশ ফুটবলের ধকলটা সয়ে নিতে পারছেন।

ফ্লোরিয়ান ভির্টৎস

একই কথা খাটে জেরেমি ফ্রিমপংয়ের ক্ষেত্রেও। চোটের কারণে ২৭ ম্যাচের ১৪টিই মিস করেছেন এই ডাচ তারকা। তবে ফেরার পর ১২০ মিনিট খেলেই দুটি অ্যাসিস্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, কেন বুন্দেসলিগায় তাঁর এত নামডাক ছিল। রায়ান গ্রাভেনবার্চকে দিয়ে করানো তাঁর গোলটি নিয়ে স্লট মুগ্ধ হয়ে বলেছেন, ‘গতিই ওর শক্তি। আধুনিক ফুটবলে এই গতির কোনো বিকল্প নেই।’

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। স্লট স্বীকার করেছেন, ডেড-বল বা সেট-পিস এখন লিভারপুলের বড় দুর্বলতা। পরিসংখ্যান বলছে, লিগে এ পর্যন্ত লিভারপুল যে ২৬টি গোল খেয়েছে, তার মধ্যে ১২টিই এসেছে কর্নার, থ্রো ইন বা ফ্রি-কিক থেকে। অর্থাৎ প্রায় ৪৬ শতাংশ গোল হজম করতে হয়েছে সেট-পিস থেকে! গত মৌসুমে যারা একটি ডেড-বল থেকেও গোল খায়নি, তাদের এই অবস্থা কেন হলো?

লিভারপুল অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইক

ভার্জিল ফন ডাইক বলছেন, তাঁরা বাতাসে থাকা বল দখলের চ্যালেঞ্জে হারছেন না (৫৭.২% সাফল্য), বরং বিপদের মুখে বল ঠিকঠাক ক্লিয়ার করতে পারছেন না। যার খেসারত দিতে হয়েছে সেট-পিস কোচ অ্যারন ব্রিগসকে। মঙ্গলবার তাঁকে চাকরিচ্যুত করেছে ক্লাব। তবে দায় শুধু কোচের নয়, লিভারপুলের মানসিকতা এবং মাঝমাঠের ভারসাম্যেও বড়সড় গলদ দেখা যাচ্ছে। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার বা গ্রাভেনবার্চরা ডমিনিক সোবোসলাইয়ের মতো প্রেসিং করতে পারছেন না। ফলে লিভারপুল বল দখলে এগিয়ে থাকলেও ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না।

সহজ কথায়, লিভারপুল জিতছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি জয়ই আসছে ঘাম ঝরিয়ে। ইন্টার মিলানের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগে জিততে হয়েছে ভাগ্যের জোরে, ব্রাইটনের বিপক্ষে জয়কেও স্লট ‘লাকি’ বলে অভিহিত করেছেন। টটেনহাম বা উলভস—কারও বিপক্ষেই লিভারপুলকে সেই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী মনে হয়নি।

নতুন বছরে কি ছন্দ ধরে রাখতে পারবে লিভারপুল

লিডসের বিপক্ষে আজ আবারও বড় পরীক্ষা। প্রতিপক্ষ লিডস কিন্তু সেট-পিসে বেশ দক্ষ। স্লট বলছেন উন্নতি হচ্ছে, তবে সেটা কাগজে-কলমে কতটুকু টেকসই, সেটাই দেখার বিষয়। লিভারপুল জয়ের ধারায় ফিরলেও এখনো নিজেদের সেরা ছন্দের খোঁজ পায়নি। আজকের ম্যাচটি তাই শুধু ৩ পয়েন্টের নয়, বরং হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের পথে এক বড় অগ্নিপরীক্ষাও।
তার আগে লিভারপুলের সমর্থকদের জন্য আপাতত সান্ত্বনা এটুকুই—মৌসুমের শুরুটা যেমনই হোক, স্লটের ‘রোলার কোস্টার’ রাইডটা অন্তত আবার ঊর্ধ্বমুখী।