শিল্পীর দেশে ‘কদর্য’ ফুটবল এবং জার্মানির মধুর প্রতিশোধ

১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর সেই ধূসর বিকেলে বিশ্বকাপ নামে যে মহাযাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই যাত্রার কোথাও পেলে-গারিঞ্চার সাম্বার ছন্দ, কোথাও ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদুকরি ছোঁয়া, আবার কোথাও জিনেদিন জিদান কিংবা লিওনেল মেসির অমরত্বের পথে হেঁটে যাওয়া—সব মিলিয়েই তো এই ফুটবল-পুরাণ। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে বিশ্বকাপের সব রোমাঞ্চকর স্মৃতি ফেরানোর আয়োজন—ফিরে দেখা বিশ্বকাপ।

ইতালি মানেই শিল্প-সংস্কৃতির এক অফুরন্ত খনি। কলোসিয়ামের ঐতিহাসিক স্থাপত্য, লেওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘দ্য লাস্ট সাপার’ কিংবা মিকেলাঞ্জেলোর ‘ডেভিড’—যে দেশে পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে এমন সব নান্দনিক সৃষ্টি, সেই দেশের মাটিতেই কি না বসল বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে ‘কদর্য’ আর রক্ষণাত্মক ফুটবলের আসর!

মাঠভর্তি এত এত তারকা, কিন্তু তাঁদের জাদুকরি ছোঁয়ার দেখা মেলেনি কেন জানি। পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে এই আসরের দৈন্যদশা: ৫২ ম্যাচে গোল হয়েছিল মাত্র ১১৫টি। বিশ্বকাপে ম্যাচের গড় গোলের দিক থেকে যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন (২.২১)।

১৯৯০ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর জার্মানির খেলোয়াড়দের উদ্‌যাপন

নকআউট পর্বের ম্যাচগুলো গোলশূন্য রেখে টাইব্রেকারে নিয়ে যাওয়ার এক অলিখিত প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। দুটি সেমিফাইনালই ১-১ সমতার পর ভাগ্য নির্ধারণের জন্য গেল ওই লটারিতে। রোমের ফাইনালে মুখোমুখি জার্মানি ও আর্জেন্টিনা—বিশ্বকাপের ইতিহাসে টানা দুই ফাইনালে একই প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা সেই প্রথম। আর ফাইনাল উপহার দিল আরও দুটি অনাকাঙ্ক্ষিত ‘প্রথম’। ফাইনালে এর আগে কোনো রানার্সআপ দল গোল না করে মাঠ ছাড়েনি, আর্জেন্টিনা সেটিই করল। ফাইনালে লাল কার্ডও এর আগে কখনো দেখেনি ফুটবল–বিশ্ব। আর্জেন্টিনার পেদ্রো মনজোন ও গুস্তাভো দেজোত্তি সেই ‘কলঙ্কে’রও খাতা খুললেন।

ওদিকে জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার নাম লেখালেন ইতিহাসে। ব্রাজিলের মারিও জাগালোর পর খেলোয়াড় ও কোচ—দুই ভূমিকাতেই বিশ্বজয়ের কীর্তি গড়লেন তিনি।

ক্যামেরুনের রূপকথা

আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ক্যামেরুনের উল্লাস।

১৯৯০ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চমক ছিল ক্যামেরুন। উদ্বোধনী ম্যাচেই বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দেয় ‘অদম্য সিংহ’রা। এরপর রোমানিয়াকে হারায় ২-১ গোলে। শেষ ম্যাচে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হলেও ৩ গোল দেওয়া এবং ৫ গোল খাওয়ার পর ‘মাইনাস ২’ গোল ব্যবধান নিয়েই গ্রুপ সেরা হয় তারা। রূপকথার এখানেই শেষ নয়। প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছানোর কীর্তি গড়ে ক্যামেরুন। শেষ আটে ইংল্যান্ডের কাছে ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নিলেও সেটিই ছিল গোটা টুর্নামেন্টের সেরা ম্যাচ।

রজার মিলার বিখ্যাত নাচ।

এই রূপকথার সবচেয়ে বড় নায়ক আলবার্ট রজার মুক মিলার, যাঁকে ফুটবল–বিশ্ব এখন চেনে ‘রজার মিলা’ নামে। গোলের পর যার নাচ মন কেড়েছিল দর্শকদের। কোচ ভ্যালেরি নেপোমনিয়াচ্চির মূল দলেই ছিলেন না এই বুড়ো স্ট্রাইকার। ক্যামেরুনের রাষ্ট্রপতির বিশেষ সুপারিশে শেষ মুহূর্তে ইতালি যাওয়ার টিকিট জোটে তাঁর। আর তাতেই ইতিহাস! রোমানিয়ার বিপক্ষে বদলি নেমে ২ গোল, আবার দ্বিতীয় পর্বে কলম্বিয়ার বিপক্ষেও জোড়া গোল। ৩৮ বছর ২৯ দিন বয়সে গোল করে মিলা বনে যান সেই সময় বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতা।

লিনেকারের ‘ঘাস-টয়লেট’

মাঠের মধ্যে সবচেয়ে অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা গ্যারি লিনেকার। ১১ জুন আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে হঠাৎ তাঁর পেটে তীব্র মোচড় দেয়। বহু বছর পর লিনেকার এক সাক্ষাৎকারে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘প্রথমার্ধেই শরীরটা খারাপ লাগছিল। দ্বিতীয়ার্ধে রাইট উইং দিয়ে একটা আক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে যখন মাটিতে পড়ে গেলাম, ব্যস, শরীর ছেড়ে দিল!’ প্যান্ট না খুলেই মলত্যাগ করে বসেন লিনেকার! এরপর কুকুরের মতো ঘাসে নিজেকে ঘষে পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন। লিনেকার বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক অভিজ্ঞতা। ভাগ্য ভালো আগের রাতে বৃষ্টি হয়েছিল, তাই ঘাসটা ভেজা ছিল।’ ১০ মিনিট পর অবশ্য এই ‘দুর্গন্ধযুক্ত’ লিনেকারকে তুলে নেন কোচ ববি রবসন।

গয়কোচিয়ার মূত্রবিসর্জন

আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার আসল নায়ক ছিলেন গোলরক্ষক সের্হিও গয়কোচিয়া, যার নায়ক হয়ে ওঠার গল্পটা রূপকথাকেও হার মানায়। দ্বিতীয় ম্যাচে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে নিয়মিত গোলরক্ষক নেরি পুম্পিদোর পা ভেঙে গেলে কপাল খোলে গয়কোর। কোয়ার্টার ফাইনালে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারের আগে নার্ভাস গয়কোর প্রচণ্ড প্রস্রাবের বেগ পায়। বাথরুমে যাওয়ার সময় নেই। নিরুপায় হয়ে দুই সতীর্থকে সামনে দাঁড় করিয়ে মাঠের মধ্যেই কাজ সারেন গয়কো। হালকা হয়েই পেনাল্টি শুটআউটে দুটি শট আটকে দেন তিনি!

’৯০ বিশ্বকাপে পেনাল্টি ঠেকিয়ে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন গয়কোচিয়া

সেমিফাইনালে ইতালির বিপক্ষেও একই কাণ্ড। এবার আর বেগ নয়, কুসংস্কারাচ্ছন্ন কোচ বিলার্দোর কড়া নির্দেশ—‘মাঠে মূত্রবিসর্জন করতেই হবে!’ গয়কো আবার করলেন, আর ডোনাডোনি ও সেরেনার শট আটকে দিয়ে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুললেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৩ কোপা আমেরিকাতেও ব্রাজিলের বিপক্ষে টাইব্রেকারের আগে কোচ আলফিও বাসিলে গয়কোকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কাজটা করেছ তো?’ গয়কো আবার মাঠে প্রস্রাব করেন এবং ম্যাচ জেতান!

বোতল-রহস্য

দ্বিতীয় রাউন্ডে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ম্যাচে এক অদ্ভুত বিতর্ক দানা বাঁধে, যা ‘হলি ওয়াটার স্ক্যান্ডাল’ নামে পরিচিত। ব্রাজিলের লেফটব্যাক ব্রাঙ্কোর অভিযোগ ছিল, আর্জেন্টিনার ‘ওয়াটার বয়’ মিগুয়েল দি লোরেঞ্জো (যিনি গালিন্দেজ নামে পরিচিত) তাঁকে পানি পানের জন্য যে বোতলটি দিয়েছিলেন, তাতে কোনো চেতনানাশক বা ‘বমি বমি ভাব’ তৈরির তরল মেশানো ছিল। যার কারণে ম্যাচের মাঝে তিনি ঝিমিয়ে পড়েন ও অসুস্থ বোধ করেন। অফিশিয়ালি এর কোনো সত্যতা না মিললেও ক্যামেরায় দেখা যায়, খেলার বিরতিতে গালিন্দেজ ব্রাঙ্কোকে একটি প্লাস্টিকের বোতল দিচ্ছেন, যার গায়ে সাদা স্কচটেপ দিয়ে আলাদা করে দাগ দেওয়া ছিল।

আর্জেন্টিনা–ব্রাজিল ম্যাচে ক্যানিজিয়ার গোলের মুহূর্ত

ম্যারাডোনা পরবর্তী সময়ে এক টিভি শোতে হেসে স্বীকার করেছিলেন, বোতলে ঘুমের ওষুধ ‘রোহিপনল’ মেশানো ছিল। বলেছেন, ‘ব্রাজিলিয়ানরা পানি চেয়েছিল। আমি বলছিলাম—হ্যাঁ, খাও খাও।’ যদিও আর্জেন্টিনার কোচ কার্লোস বিলার্দো এবং ফুটবল প্রধান হুলিও গ্রনদোনা একে ম্যারাডোনার ‘পাগলামি’ ও ‘কৌতুক’ বলে উড়িয়ে দেন।

সেই ম্যাচে পুরোটা সময় দাপট দেখাল ব্রাজিল, কিন্তু আর্জেন্টিনা জিতে গেল ম্যারাডোনার পাস থেকে ক্যানিজিয়ার দুর্দান্ত এক গোলে।

সেই ফাইনাল, ছেঁড়া জুতা ও ব্রেহমের সততা

ফাইনালের আগে জার্মানি রেফারি বদলের দাবি তোলে। ফিফার প্রথম পছন্দ ব্রাজিলের জোসে রবের্তো রাইট হলেও জার্মানির আপত্তির কারণে মেক্সিকোর এদগার্দো কোদেসালকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কারণ, জার্মানি আগের দুটি ফাইনাল হেরেছিল ব্রাজিলীয় রেফারির পরিচালনায় (১৯৮২ ও ১৯৮৬)।

ম্যাচের ৮৪ মিনিটে রুডি ফোলারকে বক্সের মধ্যে নেস্টর সেনসিনি ফাউল করলে বিতর্কিত পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। জার্মানির নিয়মিত পেনাল্টি টেকার অধিনায়ক লোথার ম্যাথাউস সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলটি আন্দ্রেয়াস ব্রেহমেকে দিয়ে বলেন, ‘শটটা তুমি নাও।’ সবাই ভেবেছিল ম্যাথাউস হয়তো গয়কোচিয়াকে ভয় পেয়েছেন। কিন্তু আসল কারণ ছিল অন্য। ম্যাথাউস তাঁর বহু পুরোনো একজোড়া আরামদায়ক জুতা পরে প্রথমার্ধে খেলেছিলেন। কিন্তু প্রথমার্ধেই তাঁর ডান পায়ের বুটের একটি স্পাইক ভেঙে যায়। বিরতিতে নতুন জুতা পরলেও তিনি স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। সেই জুতা দিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে চার মিনিট বাকি থাকতে এমন একটি ঐতিহাসিক শট নেওয়ার মতো আত্মবিশ্বাস তাঁর ছিল না।

১৯৯০ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন জার্মানি।

মজার ব্যাপার, সেই ছেঁড়া জুতা জোড়ার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ডিয়েগো ম্যারাডোনার নাম! দুই বছর আগে এক চ্যারিটি ম্যাচে ম্যারাডোনা জুতা আনতে ভুলে গেলে ম্যাথাউস তাঁকে নিজের একজোড়া নতুন জুতা দেন। ম্যারাডোনা খেলা শেষে জুতা ফেরত দেওয়ার সময় ফিতাগুলো একটু অন্যভাবে বেঁধেছিলেন। ম্যাথাউস পরে মাঠে নেমে দেখেন ওই কায়দায় ফিতা বাঁধলে পায়ে দারুণ আরাম পাওয়া যায়। সেই থেকে ক্যারিয়ারের শেষ দিন পর্যন্ত ম্যারাডোনার সেই স্টাইলেই ফিতা বাঁধতেন তিনি।

বাকিটা ইতিহাস। ব্রেহমে নিখুঁত শটে বল জালে জড়ান, গয়কোচিয়া এবার আর ‘মূত্র-টোটকা’ দেখানোর সময় পাননি। জার্মানি চ্যাম্পিয়ন হয়। তবে ১৬ বছর পর ব্রেহমে এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছিলেন, ‘সেনসিনি কোনো ফাউল করেনি। ওটা পেনাল্টি ছিল না, সঠিক ট্যাকল ছিল। তবে তার আগে অগেনথালারের ওপর একটা ফাউল হয়েছিল, সেটা পেনাল্টি ছিল।’

রেফারি কোদেসালের কানে কথাটা গিয়েছিল কি না, তা আর জানা যায়নি।