
চীনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আজ নারী এশিয়ান কাপে নিজেদের যাত্রা শুরু করবে বাংলাদেশ। কোচের চাওয়া—নিজেদের সেরা খেলা খেলে মেয়েরা দর্শকদের মন জয় করুক।
সিডনির ব্যস্ততম প্যারামাটা রেলস্টেশনের পাশে বিশাল চত্বর। কাল দুপুরে সেখানে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল। এক নারী দুই হাতে দুই দেশের পতাকা নিয়ে আপনমনে নেচে চলেছেন। কাছে গিয়ে দেখা গেল পতাকাগুলো উত্তর কোরিয়া আর উজবেকিস্তানের। পেছনে দুই তরুণ অনবরত ঢোল বাজাচ্ছেন। তাঁদের সামনে রাখা ব্যানারে বড় করে লেখা, ‘আপনার টিকিট কিনুন এখনই!’
২১তম নারী এশিয়ান কাপ ফুটবলকে ঘিরে সিডনির রাজপথে এখন উৎসবের আমেজ। আর এই উৎসবের সমান্তরালে আজ এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। প্রথমবার এই আসরে খেলতে এসে ওয়েস্টার্ন সিডনি স্টেডিয়ামে শক্তিশালী চীনের মুখোমুখি হবে লাল-সবুজ প্রতিনিধিরা।
সিডনির ঘড়িতে যখন সন্ধ্যা ৭টা বাজবে (বাংলাদেশ সময় বেলা ২টা), তখন মাঠে শুধু বাংলাদেশের ১১ জন নারী খেলোয়াড়ই থাকবেন না, অদৃশ্যভাবে গোটা দেশই তাঁদের পাশে থাকবে। চীনের মেয়েরা চাইবে বাংলাদেশকে সহজেই হারিয়ে দশম এশিয়ান মুকুটের পথে প্রথম ধাপ এগোতে, ওদিকে বাংলাদেশের মেয়েদের প্রত্যাশা এশিয়ার সেরাদের বিপক্ষে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেওয়া। কোচ পিটার বাটলারের বার্তাটি যেন পুরো দলেরই মনের কথা, ‘আমরা ছোট হতে পারি, কিন্তু খেলোয়াড়দের হৃদয় অনেক বড়। আমরা আমাদের ফুটবল খেলব এবং মানুষের মন জয় করব।’
এএফসি নারী এশিয়ান কাপের মঞ্চে বাংলাদেশের জন্য আজকের দিনটি শুধুই ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানো নয়। ১৯৮০ সালে পুরুষ দল এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলার ৪৫ বছর পর এবার মেয়েদের হাত ধরে এশিয়ার শীর্ষ মঞ্চে বাংলাদেশ। সেই রোমাঞ্চেই উজ্জীবিত বাংলাদেশ শিবির। যে চীন এশিয়ান কাপে সর্বোচ্চ ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন এবং টুর্নামেন্টে ৫১ বছরে ইতিহাসে কখনোই সেরা চারের বাইরে যায়নি, তাদের বিপক্ষেই প্রথম ম্যাচে মাঠে নামবে লাল-সবুজের মেয়েরা। র্যাঙ্কিংয়ের ১৭ নম্বর দল চীনের বিপক্ষে ১১২ নম্বর বাংলাদেশ খেলবেও এই প্রথম।
তিনবারের এশিয়ান গেমস জয়ী চীন নারী দল ১৯৯৬ অলিম্পিক গেমসে হয়েছে রানার্সআপ। আটবার বিশ্বকাপে খেলে সর্বোচ্চ সাফল্য ১৯৯৯ সালে রানার্সআপ হওয়া। বিশ্বকাপের ৩৬ ম্যাচ খেলে ১৭টিতে জয়, ৭ ড্র ও ১২ হার। আর দুবারের নারী সাফজয়ী বাংলাদেশ এশিয়ান স্তরেই খেলছে এই প্রথম।
এ ম্যাচে তাই বাংলাদেশের হারানোর কিছু নেই। কাল দুপুরে ওয়েস্টার্ন সিডনি স্টেডিয়ামে ম্যাচ–পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে কোচ পিটার বাটলার হয়তো সে কারণেই বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন। প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে ক্ষোভ–হতাশা ভুলে বললেন, ‘এটি সম্ভবত বাংলাদেশের নারী ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ঐতিহাসিক ম্যাচ হতে যাচ্ছে।’
অসম লড়াই বলে এই ম্যাচকে ‘ডেভিড বনাম গোলিয়াথ’ যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন বাটলার। আকাশকুসুম কল্পনায় না ভুগে বাস্তবে পা রাখছেন কোচ। বাস্তবতা বোঝাতে গিয়েই বাটলার মজা করে বললেন, ‘আমরা গুলিস্তানে ক্যাম্প করে এসেছি, আর এখন করছি অস্ট্রেলিয়ায়। বাস্তবতাটা বুঝতে হবে, যাতে কেউ বেশি প্রত্যাশা না করে। তবে সামর্থ্যের সেরাটা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।’
শক্তিশালী দলের বিপক্ষে পিছিয়ে থাকা দলগুলো সাধারণত গোল ঠেকাতে রক্ষণে খেলোয়াড় বাড়িয়ে খেলে, কিন্তু বাটলারের দর্শন ভিন্ন, ‘ফলাফল যা-ই হোক, আমরা বাস পার্ক করার মতো দল নই। আমি চাই মেয়েরা মাঠে গিয়ে নিজেদের মেলে ধরুক এবং স্বাধীনভাবে ফুটবল খেলুক।’
চীনের কোচ আন্তে মিলিচিক নিজের চেনা শহর সিডনিতে ফিরেছেন শিরোপা ধরে রাখার মিশন নিয়ে। ক্রোয়েশীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান মিলিচিক সিডনির ইনার ওয়েস্ট এলাকার উপশহর স্ট্র্যাথফিল্ডে বেড়ে উঠেছেন। অবশ্য চেনা আঙিনায় তিনিও বাস্তববাদী। বাছাইপর্বে মিয়ানমারকে তাদেরই মাঠে হারিয়ে আসা বাংলাদেশের লড়াকু মনোভাব মিলিচিকের বিশেষ নজরে আছে। র্যাঙ্কিংয়ে অনেক পিছিয়ে থাকলেও বাংলাদেশকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন এই অস্ট্রেলিয়ান কোচ, ‘আধুনিক ফুটবলে যেকোনো দল যেকোনো দিনে কঠিন সময় উপহার দিতে পারে। বাংলাদেশ কোনো চাপ ছাড়াই খেলবে। দলটাতে কিছু ভালো খেলোয়াড় আছে। আমরা তাদের মোটেও খাটো করে দেখছি না।’
বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল সিডনিতে দলের সঙ্গেই আছেন। মেয়েরা তাঁর কাছে ঐতিহাসিক এই ম্যাচের জন্য বিশেষ বোনাসের দাবিও জানিয়ে রেখেছেন। অবশ্য ২০২৪ সালের অক্টোবরে দ্বিতীয়বার সাফ জয়ের পর বাফুফের ঘোষিত দেড় কোটি টাকা বোনাস আজও তাঁরা বুঝে পাননি। তবু বড় মঞ্চে বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলার রোমাঞ্চ উজ্জীবিত করছে দলকে। তাঁদের বিশ্বাস—এশিয়ার ফুটবল আজ চিনবে এক নতুন বাংলাদেশকে।
এশিয়ান কাপে শক্তিশালী চীনের বিপক্ষে মাঠের লড়াইয়ের আগেই মাঠের বাইরে নিজেদের সরব উপস্থিতি জানান দিতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিরা। আজ স্থানীয় সময় বিকেল চারটায় মিন্টো স্টেশন কার পার্কে সমবেত হবেন তাঁরা। সেখান থেকে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নিয়ে প্রায় ২০০টি গাড়ির শোভাযাত্রা স্টেডিয়ামের দিকে যাত্রা করবে। সিডনির রাজপথে এই গাড়ির বহর তুলে ধরবে বাংলাদেশকেও।
সিডনির বাংলাদেশি–অধ্যুষিত এলাকা লাকেম্বার দোকানগুলোয় বাংলাদেশের জার্সির চাহিদা বেড়েছে। শোভাযাত্রার আয়োজক আব্দুল রতন খান আজকের ম্যাচ নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত, ‘আমরা যখন মিন্টো থেকে ২০০ গাড়ি নিয়ে রওনা দেব, তখন সিডনি দেখবে বাংলাদেশিদের আবেগ কতটা গভীর।’ ফাহিম ফয়সাল ও বোরহান খান বলেন, মাঠের ফল যা–ই হোক না কেন, গ্যালারি থেকে বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের সমর্থন দিয়ে যাবেন তাঁরা।
মাত্র ১০ অস্ট্রেলিয়ান ডলারে (প্রায় ৯০০ টাকা) ম্যাচের একটি টিকিট কিনলে আরেকটি টিকিট বিনা মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া টিকিট থাকলে সিডনির গণপরিবহনেও কোনো ভাড়া লাগবে না দর্শকদের।