
সিডনির আকাশে তখন সন্ধ্যা নেমেছে। গ্যালারিতে চলছিল গর্জন। দুই দলের দর্শক সংখ্যা হয়তো ছয় হাজার, কিন্তু লাল-সবুজের সমর্থকেরা যেভাবে দলকে উৎসাহিত করছিলেন, মনে হচ্ছিল গ্যালারিতে অন্তত ২০ হাজার প্রাণ একসঙ্গে জড়ো হয়েছে।
এশিয়ান কাপের বড় মঞ্চে চীনের মতো ফুটবল পরাশক্তির বিপক্ষে বাংলাদেশের মেয়েরা দারুণ লড়াই করলেন। ৯০ মিনিট ছাপিয়ে এ লড়াই এক সাহসের গল্প। মাঠের স্কোরবোর্ড ২-০ ব্যবধান দেখাচ্ছে, কিন্তু পুরো ম্যাচজুড়ে বাংলাদেশের মেয়েরা যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা এশিয়ান ফুটবলের মানচিত্রে এক নতুন বার্তা দিয়ে গেল।
এশিয়ান কাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের কাছে বড় ব্যবধানে হারের শঙ্কা ছিল। অন্তত সেটি হয়নি। ২-০ গোলে হার অনেক সম্মানজনক; তাই হেরেও বাংলাদেশের মেয়েরা জিতেছেন। এশিয়ান কাপের এত বড় মঞ্চে প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেই মাথা উঁচু করে মাঠ ছেড়েছেন মনিকা-মারিয়ারা।
৮৮ মিনিটে বড় পর্দায় ভেসে ওঠে ম্যাচ পরিসংখ্যান। বল পজেশন চীন ৫৯, বাংলাদেশ ৪১। পাস চীনের ৩৭৫টি, বাংলাদেশের ২৫৭টি। পরিসংখ্যানে বাংলাদেশ হয়তো পিছিয়ে, তবে ৮ বার বিশ্বকাপ খেলা দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের মেয়েরা যতটা টক্কর দিয়েছেন, তার জন্য কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়।
ম্যাচের শুরু থেকেই কোচ পিটার বাটলারের পরিকল্পনা ছিল স্পষ্ট—চীনের শক্তিশালী আক্রমণভাগকে আটকে দেওয়া। অভিজ্ঞ রূপনা চাকমার বদলে উচ্চতার সুবিধার্থে তরুণ মিলি আক্তারকে গোলপোস্টের নিচে দাঁড় করানো ছিল এক সাহসী জুয়া।
রক্ষণভাগে শিউলি আজিম, শামসুন্নাহার সিনিয়র, আফঈদা খন্দকার, কোহাতি কিসকু ও নবীরন খাতুন মিলে চীনের গতিশীল ফুটবলকে ৪২ মিনিট পর্যন্ত রুখে দিয়েছিলেন। এটি বাংলাদেশের রক্ষণভাগের অবিশ্বাস্য উন্নতিরই প্রমাণ। বিশেষ করে গোলকিপার মিলি আক্তার যেভাবে ১২ মিনিটে ওয়াং সুয়াংয়ের নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে দিলেন এবং পুরো ম্যাচজুড়ে সাহসিকতার সঙ্গে গোলপোস্ট আগলে রাখলেন, তা এককথায় বিস্ময়কর।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় আক্ষেপের মুহূর্তটি আসে ম্যাচের ১৪ মিনিটে। বাঁ উইং দিয়ে বল নিয়ে বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে যান তারকা উইঙ্গার ঋতুপর্ণা চাকমা। গায়ে সেঁটে থাকা ডিফেন্ডারকে ছিটকে দিয়ে তিনি যে বাঁ পায়ের দূরপাল্লার শটটি নিয়েছিলেন, তা বাতাসে ভেসে গোলপোস্টে ঢোকার ঠিক আগমুহূর্তে চীনের গোলকিপার চেন চেন কোনোমতে না ঠেকালে ম্যাচের ইতিহাস আজ অন্যভাবে লেখা হতো। ঋতুপর্ণার সেই আক্রমণ জানান দিচ্ছিল, বাংলাদেশ শুধু রক্ষণ করতে নামেনি, সুযোগ পেলে প্রতিপক্ষকে ঝাঁকুনি দিতেও জানে।
মাঝমাঠে মনিকা চাকমা ও মারিয়া মান্দা নিজেদের উজাড় করে লড়েছেন। প্রথমার্ধে একক স্ট্রাইকার হিসেবে শামসুন্নাহার জুনিয়র চীনের দীর্ঘদেহী ডিফেন্ডারদের বিপক্ষে শারীরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও লড়াই ছাড়েননি। ম্যাচের ২৪ মিনিটে যখন ওয়াং সুয়াং গোল করে বসেছিলেন, তখন গ্যালারি নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
তবে বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্ত হওয়া ভিএআর প্রযুক্তিতে অফসাইড প্রমাণিত হওয়ায় সেই গোল বাতিল হয়। থাই রেফারি পানসা চাইসাইন্ত যখন গোল বাতিলের বাঁশি বাজালেন, মনে হলো সিডনির মাঠে এক টুকরা বাংলাদেশ প্রাণ ফিরে পেল।
তবে ৪৩ মিনিটে দুর্ভাগ্যের শিকার হয় বাংলাদেশ। যখন মনে হচ্ছিল গোলশূন্য সমতা নিয়ে বিরতিতে যাওয়া যাবে, ঠিক তখনই ওয়াং সুয়াংয়ের এক দুর্দান্ত দূরপাল্লার শট দূরের পোস্ট দিয়ে জালে জড়ায়। চীনের এই উইঙ্গার, যিনি উহান জিয়াংদার হয়ে খেলেন এবং শততম ম্যাচের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন, তিনি একাই বাংলাদেশের রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছিলেন। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে দ্বিতীয় গোলটি ছিল আরও বেশি হাহাকারের, যেখানে কোহাতি কিসকুর পায়ে লেগে বলের দিক পরিবর্তন হয়ে জালে ঢুকে যায়।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই কোচ বাটলার আক্রমণের ধার বাড়াতে হালিমা, তহুরা খাতুন এবং স্বপ্না রানীকে মাঠে নামান। বিশেষ করে স্বপ্না রানী নামার পর মাঝমাঠে গতির সঞ্চার হয়। বাংলাদেশের ফরোয়ার্ডদের গতি চীনের ডিফেন্ডারদের ভাবিয়ে তুললেও বাংলাদেশ কোনো গোল পায়নি।
ম্যাচের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে এক চীনা সাংবাদিক বাংলাদেশের অধিনায়ক আফঈদাকে দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন—এত তরুণ অধিনায়ক কি তাঁর দল নিয়ে চীনের অভিজ্ঞদের সঙ্গে লড়াই করতে পারবেন? আজ মাঠের লড়াই শেষে সেই সাংবাদিক নিশ্চয়ই তাঁর উত্তর পেয়েছেন। এই মেয়েরা আজ প্রমাণ করেছেন যে তাঁরা লড়াই করতে জানেন।
শারীরিক সামর্থ্য আর অভিজ্ঞতায় চীন যোজন যোজন এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের মেয়েরা দেখিয়ে দিয়েছেন যে তাঁরা এখন এশিয়ার চ্যাম্পিয়নের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলার সামর্থ্য রাখেন। সিডনির মাঠে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উচ্ছ্বাস আর মেয়েদের এই মরণপণ লড়াই শেষে এই হার বাংলাদেশের জন্য নতুন এক আত্মবিশ্বাস। ভবিষ্যতে বড় কোনো অর্জনের পথে এটি এক পা এগিয়ে যাওয়া। লাল-সবুজের মেয়েরা আজ হারলেও মন জিতেই মাঠ ছেড়েছেন। ৬ মার্চ উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে অঘটনের স্বপ্ন এখন তাঁরা দেখতেই পারেন।