
উনিশ বছর বয়স। কলেজজীবনের রেশ এখনো গায়ে লেগে থাকার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার দুশ্চিন্তা—এই বয়সে সাধারণত এসবই মাথায় ঘোরে। কিন্তু ইয়ান দিওমান্দের মাথায় এখন ঘুরছে অন্য এক ভার—১০৭ মিলিয়ন পাউন্ড, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
আরবি লাইপজিগ থেকে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়ে এই আইভরিয়ান উইঙ্গার নিজের নামের পাশে বসিয়ে দিয়েছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় এক অঙ্ক, বোনাসসহ যা ছুঁতে পারে ১২০ মিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত।
কিন্তু ফুটবলের ইতিহাস বলে, এই বয়সে এত বড় অঙ্কের ট্যাগ গলায় ঝোলানো মানেই তারকা হয়ে ওঠার নিশ্চয়তা নয়—আলো ছড়ানোর পাশাপাশি রেকর্ড আছে ঝরে পড়ারও।
শুরুটা করা যাক ম্যাটাইস দি লিখটকে দিয়ে। ২০১৯ সালে আয়াক্সের রূপকথার মতো চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনাল যাত্রায় মাত্র ১৯ বছর বয়সেই দলের অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরেছিলেন এই ডাচ ডিফেন্ডার। সেই মৌসুমেই লিগ ও কাপ জিতে জুভেন্টাসের নজর কাড়েন তিনি, আর তুরিনের ক্লাবটি তাঁকে কিনে নেয় ৭৭ মিলিয়ন পাউন্ডে।
কিন্তু ইতালিতে আলো ছড়াতে পারেননি। বায়ার্ন মিউনিখেও একই দশা। শেষ পর্যন্ত ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে গিয়ে চোট-আঘাতের সঙ্গে লড়াই করেই যেন নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাচ্ছেন লিখট।
এরপর জুড বেলিংহামের নাম। ১৬ বছর বয়সে বার্মিংহামে অভিষেকের পর থেকেই তাঁকে ঘিরে ছিল বিস্ময়ের গুঞ্জন। বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে তিন মৌসুম কাটিয়ে ২০ বছর পূর্ণ হওয়ার ঠিক আগে আগে রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি জমান ৮৮.৫ মিলিয়ন পাউন্ডে, বোনাসসহ যা দাঁড়ায় ১১৫ মিলিয়ন পাউন্ডে।
বার্নাব্যুতে প্রথম ১৫ ম্যাচে ১৪ গোল করে ছাড়িয়ে যান ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও আলফ্রেডো ডি স্টেফানোর মতো কিংবদন্তিদের যৌথভাবে গড়া পুরোনো রেকর্ড। সেই মৌসুমেই লা লিগা আর চ্যাম্পিয়নস লিগ—জোড়া শিরোপা জেতে রিয়াল, যদিও তারপর থেকে আর কোনোটাই আসেনি। তবু বেলিংহামকে নিয়ে সমর্থকদের বিশ্বাস টলেনি এতটুকু।
তবে সব গল্প বেলিংহামের মতো রূপকথা হয়ে ওঠে না। ২০১৯ সালে বেনফিকা থেকে আতলেতিকো মাদ্রিদ যখন ১১৩ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে জোয়াও ফেলিক্সকে কেনে, তখন মনে হয়েছিল ফুটবলের পরবর্তী মহাতারকা বুঝি চলেই এলেন। কিন্তু দিয়েগো সিমিওনের কড়া শৃঙ্খলার ছকে সেই প্রতিভা যেন হারিয়ে যায়।
চেলসিতে দুই দফা ধারে কাটানো, বার্সেলোনায় ঘুরে আসা, শেষে চেলসিই তাঁকে কিনে নেয় ৪৬.৫ মিলিয়ন পাউন্ডে—অথচ সেখানেও জায়গা হয়নি ঠিকমতো, এসি মিলানে ধারে কাটাতে হয় মৌসুমের বাকি অংশ। এখন ২৬ বছর বয়সে সৌদি আরবের আল-নাসরে রোনালদোর সতীর্থ ফেলিক্স—এক বিশাল সম্ভাবনার করুণ অপচয়ের নাম।
আর সবার ওপরে বসে আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ২০১৭ সালে নেইমারকে ২০০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশ্ব রেকর্ড গড়ে কেনার কয়েক সপ্তাহ পরই মোনাকো থেকে পিএসজি তরুণ এমবাপ্পেকে কিনে নেয় প্রায় ১৬৫.৭ মিলিয়ন পাউন্ডে। এমবাপ্পে প্রতিটি পয়সার প্রতিদান দিয়েছেন পিএসজিতে—২৬৪ ম্যাচে ২৩৫ গোল, ছয়টি লিগ শিরোপা, চারটি ফরাসি কাপই তা বলছে। শুধু চ্যাম্পিয়নস লিগটাই বাকি ছিল তাঁর। আর কী নির্মম পরিহাস—এমবাপ্পে রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি জমানোর পর পিএসজি টানা দুইবার জিতে নেয় সেই ট্রফি, যা তাঁর হাতে কখনো ওঠেনি।
আর সবার শেষে দিওমান্দে। আরবি লাইপজিগে গত মৌসুমে ছত্রিশ ম্যাচে ১৩ গোল আর ১০ অ্যাসিস্ট—এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় কেন আর্সেনাল, লিভারপুল, ম্যানচেস্টার সিটি আর পিএসজির মতো ক্লাবগুলো ছুটেছিল দিওমান্দের পেছনে। এবারের বিশ্বকাপে আইভরি কোস্টের জার্সিতেও নজর কেড়েছেন তিনি। রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে তাঁর গল্প কোন পথে যাবে, সময়ই তার জবাব দেবে।