বিশ্বকাপ মানেই তো উন্মাদনা, গ্যালারি উপচে পড়া ভিড় আর টিকিট নিয়ে কাড়াকাড়ি। কিন্তু অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, নিজের দেশেই দর্শকখরায় ভুগতে পারে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র দল। খোদ লস অ্যাঞ্জেলেসের ‘সোফি স্টেডিয়ামে’ যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বোধনী ম্যাচ ঘিরে যে তথ্য সামনে আসছে, তা আয়োজক ফিফার কপালে ভাঁজ ফেলার জন্য যথেষ্ট। ২০২৬ বিশ্বকাপের পর্দা ওঠার অপেক্ষায় থাকা দেশটিতে ফুটবল নিয়ে যখন সাজ সাজ রব, ঠিক তখনই এক নথিতে দেখা যাচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচের চেয়ে ইরানিদের ম্যাচ দেখতে মানুষের আগ্রহ অনেক বেশি!
আগামী ১২ জুন ২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে সোফি স্টেডিয়ামে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে মাঠে নামবে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম দ্য অ্যাথলেটিকের পাওয়া এক অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা গেছে, ১০ এপ্রিল পর্যন্ত এই ম্যাচের টিকিট বিক্রি হয়েছে মাত্র ৪০,৯৩৪টি। অথচ এর তিন দিন পর একই ভেন্যুতে নিউজিল্যান্ড ও ইরানের মধ্যকার ম্যাচের টিকিট এরই মধ্যে বিক্রি হয়েছে ৫০,৬৬১টি। সোফি স্টেডিয়ামের দর্শক ধারণক্ষমতা প্রায় ৭০ হাজার। মানে, এখন পর্যন্ত যে হিসাব, তাতে স্বাগতিকদের ম্যাচে গ্যালারির একটা অংশ খালি পড়ে থাকতে পারে!
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচ নিয়ে কেন এই অনীহা? কারণটা এরই মধ্যে বহুচর্চিত—টিকিটের আকাশচুম্বী দাম। ফিফা যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্বোধনী ম্যাচটিকে বিশ্বকাপের তৃতীয় সর্বোচ্চ দামি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এর চেয়ে বেশি দাম শুধু ফাইনাল আর একটি সেমিফাইনালের। ক্যাটাগরি-১ এবং ক্যাটাগরি-২ টিকিটের দাম ধরা হয়েছে যথাক্রমে ২ হাজার ৭৩০ ডলার (প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা) এবং ১ হাজার ৯৪০ ডলার (প্রায় ২ লাখ ২৮ হাজার টাকা)। সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এই অঙ্কটা যে একটু বেশিই, তা টিকিট বিক্রির মন্থর গতিই বলে দিচ্ছে।
যেখানে অন্য সব ম্যাচের টিকিটের দাম বাড়ানো হয়েছে কয়েক শ ডলার করে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বোধনী ম্যাচের টিকিটের দাম গত ছয় মাসে এক পয়সাও বাড়াতে পারেনি ফিফা। আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা মেক্সিকোর উদ্বোধনী ম্যাচগুলোর মধ্যে শুধু এই একটি ম্যাচেই গত ছয় মাসে টিকিটের মূল্যবৃদ্ধি হয়নি। অথচ মেক্সিকোর উদ্বোধনী ম্যাচের ক্যাটাগরি–১ টিকিট অক্টোবরে ছিল ১ হাজার ৮২৫ ডলার, এখন সেটা ২ হাজার ৯৮৫ ডলার।
দাম না কমলে কেনার মানুষও কম। ১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ‘লাস্ট মিনিট সেলস ফেজে’ ফিফার টিকিটিং সাইটে এই ম্যাচের হাজার হাজার টিকিট পড়ে রয়েছে। ৯ এপ্রিল থেকে দ্য অ্যাথলেটিক এই ম্যাচের টিকিট বিক্রির প্রতিদিনের হিসাব রাখা শুরু করে। সেদিন ছিল ২ হাজার ৫২৯টি টিকিট। ১০ দিন পর ১৯ এপ্রিল সেটা কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৩২-এ। মানে প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে ৫০টিরও কম টিকিট।
এই পরিস্থিতি অনেকটা ২০২৫ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের মতোই। গত জুন–জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া টুর্নামেন্টটিতে শুরুতে টিকিটের দাম ছিল চড়া। পরে দর্শক চাহিদা কম দেখে টিকিটের দাম কমাতে বাধ্য হয় ফিফা, তবে ততক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে যায়। কোনো কোনো সেমিফাইনালের টিকিট বিক্রি হয়েছিল মাত্র ১৩ ডলারে! সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে অনেক দর্শকই এখন অপেক্ষায় আছেন হয়তো শেষ মুহূর্তে দাম কমবে।
যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল দলের জনপ্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। গত কয়েক বছরে নিজেদের মাঠেই দর্শক টানতে হিমশিম খেয়েছে দলটি। অনেক সময় প্রতিপক্ষের সমর্থকই গ্যালারিতে বেশি ছিল। বিশেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেসে, যে শহরকে অনেক সময় রসিকতা করে ‘তেহরানজেলস’ বলা হয়। প্রবাসী ইরানিদের বিশাল এক বসতি এখানে। আর সে প্রভাবই পড়ছে টিকিটের বাজারে। ১২ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচে স্থানীয় বাসিন্দারা টিকিট কিনেছেন মাত্র সাড়ে ৮ হাজার; অথচ ইরানের ম্যাচে লস অ্যাঞ্জেলেসের মানুষ টিকিট কিনেছেন ১৭ হাজারের বেশি! শুধু কি আবেগ? না, পকেটের হিসাবটাও এখানে মুখ্য। ইরানের ম্যাচ দেখার টিকিট যেখানে শুরু হয়েছে মাত্র ১৪০ ডলার থেকে, সেখানে মার্কিনদের খেলা দেখতে গুনতে হচ্ছে এর কয়েক গুণ।
টিকিট বিক্রির এই হতাশাজনক চিত্র নিয়ে ফিফা অবশ্য মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছে। তাদের দাবি, সব ম্যাচেই টিকিটের চাহিদা ব্যাপক। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো কিছুদিন আগে জানিয়েছেন, ৬৭ লাখ টিকিটের মধ্যে ৫০ লাখই বিক্রি হয়ে গেছে। দেরিতে আসা দর্শকদের সুযোগ দিতেই নাকি কিছু টিকিট সরিয়ে রাখা হয়েছে।
কিন্তু পর্দার পেছনের চিত্র ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থকদের কাছে টিকিট বিক্রির জন্য এখন ই–মেইল পাঠিয়ে বিশেষ অফার দেওয়া হচ্ছে। এমনকি রিসেল মার্কেট বা সেকেন্ডারি মার্কেটে ফিফার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে টিকিট ছাড়ছেন অনেকে। মনে করা হচ্ছে, গত বছরের ক্লাব বিশ্বকাপের মতো এখানেও শেষ মুহূর্তে টিকিটের দাম কমানোর রাস্তায় হাঁটতে পারে ফিফা।
কারণ, বিশ্বকাপের মতো মহাযজ্ঞে স্টেডিয়ামে আসন ফাঁকা দেখার চেয়ে বড় অস্বস্তির ছবি আর কী হতে পারে!