ব্রাজিলের স্কোয়াড ঘোষণা করছেন কার্লো আনচেলত্তি। ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) সদর দপ্তরে
ব্রাজিলের স্কোয়াড ঘোষণা করছেন কার্লো আনচেলত্তি। ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) সদর দপ্তরে

ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কেমন হলো আনচেলত্তির ব্রাজিল দল

২৬ জনের স্কোয়াডে আটজন নতুন মুখ। খেলোয়াড়দের গড় বয়স ২৪.৪ বছর। ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি কি তাহলে নতুন কোনো চিন্তাভাবনা করছেন?

আন্তর্জাতিক বিরতিতে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলবে ব্রাজিল। সে জন্য গতকাল রাতে এই স্কোয়াড ঘোষণা করেন আনচেলত্তি। বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়ার পর এটাই আনচেলত্তির প্রথম স্কোয়াড।

ব্রাজিল সমর্থকের নিশ্চয়ই মনে আছে, নরওয়ের বিপক্ষে সেই হারে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়ে জাতীয় দলের স্কোয়াড ঢেলে সাজানোর কথা বলেছিলেন আনচেলত্তি। ইতালিয়ান এই কোচ সেই কথা রাখতে ব্রাজিলের সর্বশেষ বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে ১৫ খেলোয়াড়কে বাদ দিয়েছেন।

আনচেলত্তির স্কোয়াডে ছোট ছোট কিছু পরিবর্তন চোখে পড়ে। বোঝা যাচ্ছে, ২০৩০ বিশ্বকাপ-চক্র সামনে রেখে ২৮ বছর পর ট্রফি জয়ের ‘ব্লু-প্রিন্ট’ তৈরি করছেন আনচেলত্তি।

যেমন ধরুন, খেলোয়াড়দের বয়স। ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের গড় বয়স ছিল ২৯ বছর ৬ মাস ২৯ দিন। ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ইতিহাসে গড় বয়সের হিসাবে সেটাই সবচেয়ে বেশি বয়সী দল। তাতে কাজ না হওয়ায় আনচেলত্তি সম্ভবত অভিজ্ঞতাকে তেমন একটা গুরুত্ব না দিয়ে একটু বয়সী খেলোয়াড়ের আধিক্য থেকে সরে এসেছেন। এবার আনচেলত্তির দলের গড় বয়স ২০.৪ বছর।

ভিনিসিয়ুস ও রাফিনিয়াকে দলে রেখেছেন আনচেলত্তি

আনচেলত্তির এই দলে ব্রাজিলের ঘরোয়া ফুটবলে খেলা খেলোয়াড়দের প্রাধান্যও চোখে পড়ার মত। গত বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ব্রাজিলের ঘরোয়া দল থেকে সুযোগ পেয়েছিলেন চারজন খেলোয়াড়। এই স্কোয়াডে ব্রাজিলের ঘরোয়া দলগুলো থেকে ১০ জন খেলোয়াড়কে রেখেছেন আনচেলত্তি। সংখ্যাটা গত ১৩ বছরে সর্বোচ্চ। সর্বশেষ ব্রাজিলের স্কোয়াডে ঘরোয়া ক্লাবগুলো থেকে কমপক্ষে ১০ জন খেলোয়াড় দেখা গিয়েছিল ২০১৩ সালের ১৪ মে। সেবার প্রীতি ম্যাচের জন্য ঘরোয়া ফুটবলে খেলা ১১ জনকে স্কোয়াডে রেখেছিলেন তৎকালীন কোচ লুই ফেলিপে স্কলারি।

আনচেলত্তি পরিবর্তনের শুরুটা করেছেন একদম গোলপোস্ট থেকে। তিনজন গোলকিপারই বলতে গেলে নতুন মুখ। হুগো সউজা শুধু একটি ম্যাচ খেলেছেন জাতীয় দলে। ওতাভিও এবং পেদ্রো মরিসকো অভিষেকের অপেক্ষায়। জায়গা হয়নি লিভারপুলের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক আলিসন বেকারের।

সিদ্ধান্তটির ব্যাখ্যায় ব্রাজিল কোচ বলেন, ‘তার মানে এই নয় যে বাকিদের বাদ দেওয়া হয়েছে। আলিসনকে ভালো করেই চিনি। কোপা আমেরিকার মতো বড় টুর্নামেন্ট যখন আসবে, তখন সে যদি ব্রাজিলের সেরা গোলরক্ষক থাকে, তবে আলিসনই খেলবে। কিন্তু এই মুহূর্তে তরুণদের অগ্রাধিকার দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।’

আনচেলত্তির দল থেকে বাদ পড়েছেন গোলরক্ষক আলিসন বেকার

সে জন্যই অভিজ্ঞ দুই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ফাবিনিও এবং কাসেমিরোর স্কোয়াডে জায়গা হয়নি। নতুনদের মধ্যে আছেন অ্যাতলেতিকো পারানায়েন্সের ডিফেন্ডার আর্থার দিয়াস ও পিএসভি আইন্দহোভেনের ফুলব্যাক মাউরো জুনিয়র। তরুণদের সঙ্গে কিছুটা অভিজ্ঞতার মিশেল ঘটাতে ব্রুনো গিমারাইস ও মারকিনিওসকে স্কোয়াডে রেখেছেন আনচেলত্তি।

আসলে অভিজ্ঞ কিছু খেলোয়াড়কে রেখে সামনের পথটা ঠিক করতে চাচ্ছেন ব্রাজিল কোচ। সেটা বোঝা গেল তাঁর ব্যাখ্যায়, ‘জাতীয় দলের কৌশলে বড় পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়ায় সাহায্য করতেই আমি মারকিনিওস, গাব্রিয়েল, ব্রুনো, রাফিনিয়া এবং ভিনিকে নিয়েছি। ভবিষ্যতের জন্য তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা তরুণ খেলোয়াড়দের উন্নতির পথ দেখাবে। তার মানে এই নয় যে অন্য খেলোয়াড়দের সুযোগ বন্ধ হয়ে গেল।’

আনচেলত্তির এমন সিদ্ধান্তে ব্রাজিলের সবাই কিন্তু প্রশংসাসূচক করতালি দেয়নি। দেশটির সাবেক অধিনায়ক থিয়াগো সিলভা যেমন একটু সমালোচনার সুরেই বলেছেন, কোনো খেলোয়াড় অবদান রাখতে পারলে শুধু বয়সের অজুহাতে তাঁকে জাতীয় দল থেকে ছেঁটে ফেলা উচিত নয়।

সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে জানতে চাওয়া হলে আনচেলত্তির ব্যাখ্যা, ‘একটি বিষয় পরিষ্কার-৩৪ বা ৩৫ বছর বয়সী কোনো খেলোয়াড় ভবিষ্যতের ভিত্তি হতে পারেন না। তাঁরা বর্তমান। ওই বয়সের কেউ যদি কোনো বড় টুর্নামেন্টে খেলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকেন, তবে তিনি অবশ্যই দলে সুযোগ পাবেন। কিন্তু এখন মূল বিষয় হলো তরুণদের গড়ে তোলা।’

করিন্থিয়ান্সের সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার ব্রেনো বাইডন

তরুণদের গড়ে তোলার এই পরিকল্পনায় করিন্থিয়ান্সের সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার ব্রেনো বাইডনকে সম্ভবত আলাদা চোখেই দেখবেন আনচেলত্তি। ২১ বছর বয়সী বাইডন অনেকের চোখেই জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ হতে পারেন। আর আনচেলত্তিও হন্যে হয়ে জাতীয় দলের জন্য মানসম্পন্ন মিডফিল্ডার খুঁজছেন, যে পজিশনের খেলোয়াড় নিয়ে এক সময় গর্ব করত ব্রাজিল।

ব্রাজিল কোচের ঘনিষ্ঠদের দাবি, এ পজিশনের জন্য নতুন খেলোয়াড় খুঁজে বের করতে আনচেলত্তি এখন মরিয়া। নিজের খেলার কৌশলকে মাঠে ফলাতে এই জায়গায় সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন ক্লাব ফুটবলে প্রায় সর্বজয়ী এ কোচ। সে জন্য ব্রাজিলের বয়সভিত্তিক দলগুলোয় চোখ রাখছেন আনচেলত্তি। বাইডন যেমন উঠে এসেছেন ব্রাজিলের অনূর্ধ্ব-২০ দল থেকে।

ব্রাজিল স্কোয়াড: গোলকিপার: হুগো সউজা, পেদ্রো মরিসকো, ওতাভিও। ডিফেন্ডার: আর্থার দিয়াস, দগলাস সান্তোস, গাব্রিয়েল মাগালায়েস, জাইর, মার্কিনিওস, মাথেউজিনিও, মাউরো জুনিয়র, ভিতর রেইস, ওয়েসলি। মিডফিল্ডার: আন্দ্রে সান্তোস, ব্রেনো বাইডন, ব্রুনো গিমারায়েস, দানিলো সান্তোস, দগলাস লুইস, গাব্রিয়েল বোন্তেম্পো। ফরোয়ার্ড: এনদ্রিক, এস্তেভাও, জোয়াও পেদ্রো, পেদ্রো, রাফিনিয়া, রায়ান, স্যামুয়েল লেনো ও ভিনিসিউস জুনিয়র।

তবে মাউরা সিলভার ডাক পাওয়াটা চমক। কারণ, আনচেলত্তি নিজেই স্বীকার করেছেন, এই খেলোয়াড়কে তিনি ভালোভাবে চেনেন না, ‘আমি এখনো তাঁকে খুব ভালো করে চিনি না। তবে আমরা ইউরোপে সব ফুলব্যাককেই পরখ করে দেখছি এবং আমাদের হাতে বেশ কিছু ভালো বিকল্প আছে। মাউরো জুনিয়রকে আমি কাছ থেকে দেখতে চাই; কারণ, তাঁর খেলার ধরন বেশ আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে।’

২৫ ও ২৯ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলবে ব্রাজিল। ৩ অক্টোবর ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি হবে কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচ দুটি অনুষ্ঠিত হবে টাউনসভিলের কুইন্সল্যান্ড কান্ট্রি ব্যাংক স্টেডিয়াম ও ব্রিসবেনের সানকর্প স্টেডিয়ামে।