মুরাত ইয়াকিনের দিকে অদ্ভুত প্রশ্নটা উড়ে এসেছিল ইউরো ২০২৪-এর এক সংবাদ সম্মেলনে। স্কটল্যান্ডের সঙ্গে ড্র করা ম্যাচের পর কৌশল আর খেলোয়াড় বদলি নিয়ে যাবতীয় গুরুগম্ভীর প্রশ্নের মধ্যে হঠাৎ কেউ জিজ্ঞেস করে বসল, টিকটকে যে তিনি রীতিমতো সেক্স সিম্বল—এই খবর কি জানেন?
ইয়াকিনের ভুরু কপালে উঠে গিয়েছিল বিস্ময়ে। পাশে বসা ম্যানুয়েল আকাঞ্জি ফেটে পড়েছিলেন হাসিতে। সেই হাসিতে পরে ইয়াকিনও যোগ দিয়ে শুধু বলেছিলেন, ‘আশা করি, আমার স্ত্রী এসব শুনছেন না।’
প্রসঙ্গটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও তাঁকে নিয়ে এই আলোচনাটা আসলে তখনো ছিল, এখনো আছে। ব্যাক ব্রাশ করা কাঁচা–পাকা চুল, চোখে চওড়া ফ্রেমের চশমা আর পরনের দামি আর্ল গ্রে ব্লেজারে তাঁকে যত না ফুটবল কোচ, সিনেমার আবেদনময় অভিনেতাই বেশি মনে হয়।
এবার চোখ ফেরান আর্জেন্টিনার ডাগআউটে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা ইয়াকিনের মতো গ্ল্যামারাস নন। ডাগআউটে বেশির ভাগ সময় তাঁর গায়ে থাকে সাদামাটা টি-শার্ট ও ট্রাউজার। লোকটার আবেগের প্রকাশ কম। কিন্তু যখন সেই প্রকাশটা হয়, সেটা খুবই তীব্র। লিওনেল স্কালোনি কাঁদেন।
বিশ্বকাপ জেতার পরও কেঁদেছেন, কোপা আমেরিকা জেতার পরও। তাঁর কাছে আর্জেন্টিনার কোচের চেয়ার কোনো চাকরি নয়, এক আজীবনের স্বপ্ন, যা হঠাৎ সত্যি হয়ে গেছে। খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা তাই নির্ভেজাল আবেগের।
বাংলাদেশ সময় কাল সকাল সাতটায় কানসাস সিটিতে যখন দুই ডাগআউটে দাঁড়াবেন এই দুই কোচ, তখন আসলে মুখোমুখি হবে দুটো দর্শন। একদিকে আবেগে ভাসা এক মানুষ, যিনি হৃদয়ের কথা বেশি শোনেন। অন্যদিকে বেশ হিসাবি এক মস্তিষ্ক, যিনি বিশ্বাস করেন, রক্ষণের গাঁথুনি ঠিক থাকলে যেকোনো ঝড় ঠেকানো যায়।
ইয়াকিনের ফুটবলার-জীবন কেটেছে নিজ শহরের ক্লাব এফসি বাসেলে। লিবেরো হিসেবে খেলতেন, দলের অধিনায়কও ছিলেন। পরে ২০২১ সালে সুইজারল্যান্ডের দায়িত্ব নিয়ে টানা দুটি বিশ্বকাপে তুলেছেন দলকে। কাতারে ব্রাজিলের পেছনে গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে শেষ ষোলোয় পর্তুগালের কাছে ৬-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার তেতো স্মৃতিও আছে। কিন্তু এবার কলম্বিয়াকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ১৯৫৪ সালের পর প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছেন সুইজারল্যান্ডকে।
স্কালোনির খেলোয়াড়ি জীবন কোচিং ক্যারিয়ারের মতো এত ঝলমলে ছিল না। কখনো রাইটব্যাক বা মিডফিল্ডের ডানে খেলতেন। স্পেনে দেপোর্তিভো লা করুনিয়ায় কাটিয়েছেন বেশির ভাগ সময়, লিগ আর কোপা দেল রে জিতেছেন। কোচিং শুরু সাম্পাওলির সহকারী হিসেবে, সেভিয়ায়।
তারপর জাতীয় দলের সহকারী কোচ, অনূর্ধ্ব-২০ দলের প্রধান কোচ, আর ২০১৮ সালে হঠাৎই সিনিয়র দলের দায়িত্ব। ২০২১ সালে ২৮ বছরের খরা কাটিয়ে কোপা জেতালেন, ইতালিকে হারালেন ফিনালিসিমায়, তারপর কাতারে মেসির হাতে তুলে দিলেন সেই ট্রফি, যা ছাড়া মেসির কীর্তি অসম্পূর্ণ থেকে যেত।
২০২৪ কোপাও জিতে টানা তিন টুর্নামেন্টের ট্রফি—এমন কীর্তি আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী বাকি দুই কোচ মেনোত্তি বা বিলার্দোরও নেই।
কানসাস সিটির মাঠে তাই দুই বিপরীত মেরুর সাক্ষাৎ হবে। ইয়াকিনের কাছে ফুটবল কৌশলের যুদ্ধ, স্কালোনির চোখে যা হৃদয়ের লড়াইও। একজন হিসাব কষেন, আরেকজন অনুভব করেন।
তবে ফুটবল বারবার দেখিয়ে দিয়েছে, শেষ পর্যন্ত মাঠে হিসাব আর হৃদয় আলাদা থাকে না বেশিক্ষণ।