
ফর্টিস ডাউনটাউন রিসোর্টে শেষ বিকেলের ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। ভেজা সবুজ ঘাসের গন্ধ আর মেঘলা আকাশের নিচে যেন হঠাৎ ফিরে এসেছিল তিন দশক আগের এক ফুটবল-রূপকথা। সেই রূপকথার নায়ক—আর্জেন্টিনার ‘উড়ন্ত উইঙ্গার’ ক্লদিও ক্যানিজিয়া। বাতাসে উড়তে থাকা তাঁর সোনালি চুল, নব্বইয়ের বিশ্বকাপের দুরন্ত গতি আর গোলের স্মৃতি যেন ঢাকা ইন্টারস্কুল চ্যাম্পিয়নস লিগের সমাপনী বিকেলটাকে মুহূর্তেই করে তুলেছিল অন্য রকম।
বৃষ্টিভেজা বিকেলে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্যও আশার কথা শোনালেন আর্জেন্টিনার এই কিংবদন্তি। তাঁর কণ্ঠে ফুটে উঠল বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে বিশ্বাস, ‘বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া সব সময়ই কঠিন। তবে আমি আশা করি, বাংলাদেশ আগের চেয়ে আরও ভালো করবে এবং এগিয়ে যাবে। বিশ্বকাপে এখন ৪৮টি দল খেলছে। ভবিষ্যতে হয়তো আরও বেশি দল খেলবে। ফলে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ তৈরি হতে পারে। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশও একদিন বিশ্বকাপে খেলবে।’
ঢাকা আন্তস্কুল চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালের বিজয়ীদের হাতে ট্রফি তুলে দিতেই বাংলাদেশে এসেছিলেন ক্যানিজিয়া। বৃষ্টির কারণে অবশ্য পুরো ম্যাচটি দেখা হয়নি তাঁর। ফাইনালে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটোরিয়ালকে (বিআইটি) হারিয়ে শিরোপা জেতে নৌবাহিনী কলেজ।
স্কুল-কলেজের তরুণ ফুটবলারদের দিকে তাকিয়ে তাঁর কণ্ঠে ছিল অভিভাবকের মতো পরামর্শ। ম্যাচটি দেখতে না পারার আক্ষেপও লুকাননি। বললেন, ‘ফুটবল কেবল ভাগ্যের খেলা নয়। এটা কঠোর শৃঙ্খলা, সঠিক প্রস্তুতি আর মানসিক দৃঢ়তার সমীকরণ। কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই—কোচের কথা শোনো, নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখো এবং প্রতিদিন সেরাটা দাও।’
ক্যানিজিয়া নামটি উচ্চারণ করলেই ফুটবলপ্রেমীদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ১৯৯০ ইতালি বিশ্বকাপ। ব্রাজিলের বিপক্ষে ডিয়েগো ম্যারাডোনার অসাধারণ পাস, এরপর ক্যানিজিয়ার সেই নিখুঁত ফিনিশিং—আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
আর্জেন্টিনার হয়ে ৫০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১৬ গোল করা ক্যানিজিয়ার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি জুড়ে আছেন ম্যারাডোনা। সেই বন্ধুর কথা উঠতেই কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তিনি, ‘ডিয়েগো আমার বন্ধু ছিল। আমরা আর্জেন্টাইনরা তাকে অনেক মিস করি। জাতীয় দলে আমরা বহু বছর একসঙ্গে খেলেছি। আমি তার চেয়ে কিছুটা ছোট ছিলাম, তাই ছোটবেলা থেকেই তাকে দেখে বড় হয়েছি। বোকা জুনিয়র্সে তার সঙ্গে খেলাটাও ছিল দারুণ অভিজ্ঞতা।’
ম্যারাডোনার সঙ্গে তাঁর সেই বিখ্যাত চুমুর প্রসঙ্গও আসে। হেসে ক্যানিজিয়া বলেন, ‘সেই বিখ্যাত চুমুর ব্যাপারটি আসলে খুব স্বাভাবিক ছিল। সে করতে চেয়েছিল, আমরা করেছি। এর মধ্যে অন্য কিছু ছিল না। এটি ছিল দুই বন্ধুর বন্ধুত্বপূর্ণ চুমু।’
পরে সংবাদ সম্মেলনে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মাতামাতির কথাও বলেন ক্যানিজিয়া, ‘১৯৮৬ সালের পর থেকেই আমি জানি, বাংলাদেশের মানুষ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে অনুসরণ করে। প্রথমবার বাংলাদেশে এসে মানুষের কাছাকাছি থেকে তাদের ভালোবাসা দেখার সুযোগ পাওয়া আমার জন্য দারুণ আনন্দের।’
বাংলাদেশে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে উন্মাদনা যে তাঁকে মুগ্ধ করেছে, সেটিও জানিয়ে দিলেন এরপর, ‘বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় আর্জেন্টিনার সমর্থক আছে; কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মতো এত আবেগ ও ভালোবাসা খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়।’
২০৩০ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসিকে দেখা যাবে কি না—এই প্রশ্নে সম্ভাবনাটাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি ক্যানিজিয়া, ‘মেসির জন্য ২০৩০ বিশ্বকাপে খেলা কঠিন হবে। আমার মনে হয় না, সে খেলবে। এ ধরনের খেলোয়াড়দের পাশে সব সময় দৌড়াতে পারে—এমন খেলোয়াড় প্রয়োজন। সে ফুটবলের একজন জিনিয়াস। তাই সে চাইলে এটা করতে পারে। তবে তার ইচ্ছা আছে কি না, সে খেলতে চায় কি না—সেটাই বিষয়। কিন্তু সে চাইলে অবশ্যই পারবে।’