২০২৪ সালের জুলাই। অনেক আশা আর বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে পালমেইরাস থেকে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়েছিলেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড এনদ্রিক। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই রিয়ালের সাদা জার্সি গায়ে জড়িয়ে বলেছিলেন, ‘সব সময় এখানেই আসতে চেয়েছি। এটা তো আমার স্বপ্ন পূরণ হওয়ার মতো ব্যাপার।’ তবে স্বপ্ন আর বাস্তবের আকাশ-পাতাল তফাতটা বুঝতে এনদ্রিকের খুব বেশি সময় লাগেনি। রিয়ালে তাঁর স্বপ্নের ডানা মেলার সুযোগ মেলেনি বললেই চলে।
দেড় বছরে রিয়ালের জার্সিতে মাত্র ৪০টি ম্যাচে মাঠে নামতে পেরেছেন এক সময়ের এই ব্রাজিলিয়ান ‘বিস্ময় বালক’। গোল করেছেন ৭টি, সঙ্গে ১টি গোলে সহায়তা। অবাক করার মতো বিষয় হলো এই দেড় বছরে মাত্র একটি ম্যাচে পুরো ৯০ মিনিট খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এনদ্রিকের কপাল আরও পুড়েছিল কোচ জাবি আলোনসো রিয়ালের কোচ হওয়ার পর। দলে তিনি যেন হয়ে পড়েছিলেন এক ‘অনাহূত অতিথি’। চলতি মৌসুমে তো দুই ম্যাচ মিলিয়ে মাঠে ছিলেন মাত্র ১১ মিনিট!
শেষ পর্যন্ত অভিমানে কি না কে জানে, জানুয়ারির দলবদলে ধারে রিয়াল ছেড়ে পাড়ি জমালেন ফরাসি ক্লাব অলিম্পিক লিওঁতে। আর সেখানেই ঘটালেন ম্যাজিক। মাত্র তিন ম্যাচ খেলেই জিতে নিয়েছেন লিগ আঁ-র মাসসেরা ফুটবলারের পুরস্কার।
অথচ কিছুদিন আগেও রিয়ালে বসে থাকা এনদ্রিককে দেখে অনেকে ধরেই নিয়েছিলেন, এক বিশাল প্রতিভার অপচয় ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু মাঠের ফুটবলেই সব অবহেলার জবাব দিচ্ছেন এই তরুণ। তিনি যে ‘হঠাৎ চমকে দেওয়া’ কেউ নন, বরং সত্যিকারের এক প্রতিভা—সেটা প্রমাণ করতে তাঁর লেগেছে মাত্র ৩টি ম্যাচ। এই তিন ম্যাচেই এক হ্যাটট্রিকসহ ৪টি গোল ও ১টি অ্যাসিস্ট তাঁর!
লিওঁর হয়ে ফ্রেঞ্চ কাপে লিলের বিপক্ষে এনদ্রিকের অভিষেকটা ছিল মনে রাখার মতো। ৪২ মিনিটেই প্রথম গোলটা পেয়ে যান। দ্বিতীয় ম্যাচে ব্রেস্তের বিপক্ষে গোল না পেলেও সতীর্থকে দিয়ে গোল করিয়েছেন দারুণ দক্ষতায়। আর সর্বশেষ মেৎসের বিপক্ষে লিওঁর ৫-২ গোলের বড় জয়ে করেছেন দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক।
ইউরোপের মাটিতে সর্বকনিষ্ঠ ব্রাজিলিয়ান হিসেবে হ্যাটট্রিক করার রেকর্ড এখন এনদ্রিকের। পেছনে ফেলে দিয়েছেন কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিওকেও। এমনকি ইউরোপের শীর্ষ ৫ লিগে গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে (৫) অনূর্ধ্ব-২০ খেলোয়াড়দের মধ্যে এনদ্রিকই এখন সবার ওপরে।
ফ্রান্সের এই লিগে এমবাপ্পে, নেইমার, মেসি কিংবা ইব্রাহিমোভিচদের মতো মহাতারকারা খেলেছেন। কিন্তু এনদ্রিক তাঁদেরও টেক্কা দিয়েছেন এক জায়গায়। লিগ আঁ-তে নিজের দ্বিতীয় ম্যাচেই হ্যাটট্রিক পেয়েছেন তিনি। অথচ এমবাপ্পের লেগেছিল ২৮ ম্যাচ, নেইমারের ১৫ আর করিম বেনজেমার লেগেছিল ৪৭ ম্যাচ। আর লিওনেল মেসি? পিএসজিতে দুই মৌসুম খেললেও লিগ আঁ-তে তো তাঁর কোনো হ্যাটট্রিক নেই!
লিওঁ কোচ পাওলো ফনসেকা তাই দারুণ মুগ্ধ এনদ্রিককে নিয়ে, ‘ও একেবারেই ভিন্ন ধাঁচের স্ট্রাইকার। আমাদের আক্রমণভাগে যে ধার আর গভীরতার অভাব ছিল, এনদ্রিক সেটা পুষিয়ে দিচ্ছে। সে একা যেমন পার্থক্য গড়ে দিতে পারে, তেমনি দলগত খেলাতেও দারুণ। ভুলে গেলে চলবে না, ও এ বছর প্রায় খেলতেই পারেনি। ফিটনেস আরও বাড়লে সামনে ও আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে।’
ধারে পাঠিয়ে দেওয়া এনদ্রিকের এমন অবিশ্বাস্য ফর্ম দেখে রিয়াল কর্তাদেরও এখন সম্ভবত কিছুটা আক্ষেপ হচ্ছে। খেলাধুলাভিত্তিক পোর্টাল ‘দ্য অ্যাথলেটিক’ জানিয়েছে, রিয়াল কর্মকর্তারা নাকি ভেবেই পাচ্ছেন না বিদায়ী কোচ জাবি আলোনসো কেন এনদ্রিককে এমন বসিয়ে রাখলেন।
এমন পারফরম্যান্স চলতে থাকলে ধারের মেয়াদ শেষে রিয়াল যে তাঁকে ফিরিয়ে নিতে উঠেপড়ে লাগবে, তা বলাই বাহুল্য। তবে রিয়ালে ফিরলে এনদ্রিক কি আবার বেঞ্চ গরম করতে চাইবেন? সেই উত্তর তোলা থাকল সময়ের কাছে।