
মা–বাবা নাইজেরিয়ান। জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্র আর বেড়ে ওঠা ইংল্যান্ডে। তিন দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার সুযোগ পেয়ে শেষ পর্যন্ত বেছে নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রকে। নিজের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচেই ফোলারিন বালোগান নাম লিখিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়।
প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে গতকাল অভিষেক হয়েছে বালোগানের। প্রথম ম্যাচেই জোড়া গোল করে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ ব্যবধানের বড় জয় এনে দেন ২৪ বছর বয়সী স্ট্রাইকার, জিতে নেন ম্যাচসেরার পুরস্কারও।
এই জোড়া গোল মার্কিন ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য কীর্তি গড়েছে। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন খেলোয়াড় বিশ্বকাপের এক ম্যাচে একাধিক গোল করলেন।
১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ট প্যাটেনড বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম হ্যাটট্রিকটি করেছিলেন ৩-০ গোলের ম্যাচে, সেটিও ছিল প্যারাগুয়ের বিপক্ষেই। ঠিক ৯৬ বছর পর বালোগান যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটালেন।
বালোগানের গল্প সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানাবে। নাইজেরিয়ান মা–বাবা ছিলেন লন্ডনের বাসিন্দা। ২০০১ সালে এই দম্পতি বেড়াতে গিয়েছিলেন নিউইয়র্কে। ছুটি শেষে লন্ডনে ফেরার ফ্লাইটে ওঠার সময় বাধে বিপত্তি। মা তখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় নিরাপত্তাজনিত কারণে বিমান সংস্থা তাঁকে ভ্রমণের অনুমতি দেয়নি। ফলে কাকতালীয়ভাবে সে বছর ৩ জুলাই নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্ম বালোগানের।
জন্মের দুই মাস পর মা–বাবার সঙ্গে লন্ডনে আসে শিশু বালোগান। সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা। মাত্র আট বছর বয়সে আর্সেনাল যুব একাডেমিতে যোগ দেয় বালোগান। সেখানেই কেটেছে ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত। এর মধ্যে ২০১৭ সালে আর্সেনাল অনূর্ধ্ব-১৬ দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন, যে দলটি কোচ ট্রেভর বামস্টেডের অধীনে ‘লিয়াম ব্র্যাডি কাপ’ জিতেছিল। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে আর্সেনালের সঙ্গে প্রথম পেশাদার চুক্তি করেন বালোগান।
তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে কার হয়ে খেলবেন, তা নিয়ে তাঁর মনে বড় দ্বিধা ছিল। বা–মায়ের সূত্রে নাইজেরিয়া, জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্র আর বেড়ে ওঠার কারণে ইংল্যান্ড—তিন দেশের হয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার সুযোগ ছিল সামনে। বালোগান ইংল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-১৭, ১৮, ২০ ও ২১ দলের হয়ে খেলেছেন, আবার ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অনূর্ধ্ব-১৮ দলের হয়েও মাঠে নামেন। একসময় নাইজেরিয়ার হয়ে খেলার আগ্রহ প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালের মে মাসে ফিফার অনুমোদনে স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলার স্বীকৃতি পান।
যুক্তরাষ্ট্রের জার্সি গায়ে জড়ানোর পর থেকেই তাঁর ক্যারিয়ার সামনের দিকে ছুটেছে। ২০২৩ সালের জুনে কনকাকাফ নেশনস লিগে যুক্তরাষ্ট্র দলে অভিষেক। ফাইনালে কানাডার বিপক্ষে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করে দলকে জেতান শিরোপা।
ক্লাব ফুটবলেও আসে বড় পরিবর্তন। ২০২৩ সালের আগস্টে ফরাসি ক্লাব এএস মোনাকোতে যোগ দিয়ে ৭২ ম্যাচে ২৪ গোল করেছেন এখন পর্যন্ত। বর্ষসেরা খেলোয়াড় হয়েছেন ২০২৫-২৬ মৌসুমে।
গতি আর ড্রিবলিংয়ের সঙ্গে ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি উচ্চতার বালোগানের দুই পায়ে সমানভাবে শট নেওয়ারও সামর্থ্য আছে। একজন খাঁটি ‘নাম্বার নাইন’ বিবেচনা করা হলেও বালোগান দ্বিতীয় স্ট্রাইকার বা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবেও খেলতে পারেন।
আর্সেনালের সাবেক কিংবদন্তি মার্টিন কিওন তাঁর গতি ও বুদ্ধিমত্তা দেখে তাঁকে ক্লাবের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা ইয়ান রাইটের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে এখন পর্যন্ত ২৮ ম্যাচে ১১ গোল করা বালোগানকে বিবেচনা করা হচ্ছে মার্কিন ফুটবলের আগামী দিনের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হিসেবে। ভাগ্যিস, ২৪ বছর আগে এক অন্তঃসত্ত্বা মাকে লন্ডনে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি বিমান সংস্থা, নইলে কি আর বালোগানকে পেত যুক্তরাষ্ট্র!