
এনরিকে মাকায়া মার্কেজের বয়স ৯১। ১৮টা বিশ্বকাপ দেখেছেন নিজের চোখে। সুইডেন থেকে শুরু, ১৯৫৮ সালে, যখন পেলে মাত্র ১৭ এবং পৃথিবীর কাছে ‘পেলে’ হয়ে ওঠেননি। সেই একই মানুষ ডালাসের সংবাদ সম্মেলনকক্ষে বসে লিওনেল স্কালোনিকে প্রশ্ন করলেন, জর্ডান ম্যাচে কি লিওনেল মেসি দলে থাকবেন?
স্কালোনি থামলেন একটু। তারপর বললেন, ‘এনরিকে, আপনি বলেই উত্তরটা দিচ্ছি। অন্য কেউ জিজ্ঞেস করলে এড়িয়ে যেতাম।’ তারপর জানিয়ে দিলেন, ‘লিও শুরুতে বেঞ্চে থাকবে, পরের দিকে নামবে হয়তো।’
এটা ও রকম কোনো কৌশল নয়, স্রেফ বিশ্রাম। কারণ, আর্জেন্টিনা ইতিমধ্যে গ্রুপ জের শীর্ষস্থান নিশ্চিত করে ফেলেছে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলে জয়, তার আগে আলজেরিয়ার সঙ্গে ৩-০ জয়ে—সব হিসাব চুকে গেছে। ৫টা গোলই মেসির। ৪ জুলাই মায়ামিতে কেপ ভার্দের বিপক্ষে রাউন্ড অব থার্টি-টু, সেই মঞ্চের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে এই জাদুকরকে।
জর্ডানের বিপক্ষে আজ তাই নামছে আর্জেন্টিনার রিজার্ভ দল, প্রায় পুরোটাই। ডালাসের মাঠে আজকের ম্যাচটা তাই গণিতের হিসাব মেলানোর ম্যাচ নয়। এটা বরং উঁচু পাহাড়ের নিচে এসে একটু শ্বাস নেওয়ার সময়। রোজ যে যুদ্ধে নামতে হয়, আজ সেই যুদ্ধের বর্ম খুলে রাখার দিন।
স্কালোনি এই মুহূর্তকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন একটু ভিন্নভাবে, ‘যারা সুযোগ পায়নি, তাদের সুযোগ দেওয়ার ইচ্ছা আছে।’ কিন্তু শুধু কি সুযোগ দেওয়া? এর ভেতরে আছে আরেকটা কথা, দলের প্রতিটি মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়া যে তারাও এই স্বপ্নের অংশ।
জর্ডানের গল্পটা একটু অন্য রকম। আগের দুই ম্যাচ হেরে এরই মধ্যে বিদায় নিশ্চিত। তবু এই ম্যাচ তাদের জন্য শেষ সুযোগ। নিজেদের প্রমাণ করার, অন্তত সম্মান নিয়ে ফেরার। এই ধরনের ম্যাচেই প্রতিপক্ষের জন্য বিপদ লুকিয়ে থাকে। কারণ ফুটবলে ‘হারানোর কিছু নেই’ মানসিকতা সবচেয়ে বিপজ্জনক। আজ একটু সতর্ক তাই থাকতেই হবে আর্জেন্টিনাকে।
প্রথম একাদশে যে মেসি থাকবেন না, সেটা তো বলেই দিয়েছেন কোচ। সম্ভবত থাকবেন না লাওতারো মার্তিনেজও। শুরু থেকে হয়তো মাঠে নামবেন গঞ্জালো মন্তিয়েল, নিকোলাস ওতামেন্দি, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো। মাঝমাঠে লিয়ান্দ্রো পারেদেস আর এজেকিয়েল পালাসিওস। দুই প্রান্তে হুলিয়ানো সিমিওনে আর জিওভান্নি লো সেলসো—বিশ্বকাপে এই প্রথম মাঠ পাচ্ছেন দুজনেই। আর সামনে হুলিয়ান আলভারেজ। নিকো পাজ অথবা লাওতারো—তাঁর পাশে কে থাকবেন, সেটা এখনো রহস্য। তবে স্কালোনির চিন্তায় নিকো পাজই হয়তো এগিয়ে।
৬৮ বছর আগে মাকায়া মার্কেজ যখন সুইডেনে প্রথম বিশ্বকাপ দেখতে গেলেন, ঠিক সেই টুর্নামেন্টেই আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেছিলেন আনহেল লাব্রুনা—৩৯ বছর বয়সে। রিভার প্লেটের সেই কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চে নেমেছিলেন বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে।
আজ যদি মেসি জর্ডানের বিপক্ষে কিছুটা সময়ের জন্যও মাঠে নামেন, তাহলে লাব্রুনার পর তিনি হবেন আর্জেন্টিনার হয়ে ৩৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপে খেলা দ্বিতীয় ফুটবলার। আর যদি একটি গোল পান, তাহলে হবেন টানা সাত বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করা প্রথম খেলোয়াড়। ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন ও ব্রাজিলের জেয়ারজিনহো থেমে গিয়েছিলেন টানা ছয় ম্যাচ গোল করে। ফন্টেইন সেই ১৯৫৮ বিশ্বকাপে, জেয়ারজিনহো ১৯৭০-এ। মাকায়া মার্কেজ দুজনের কীর্তিই দেখেছেন চোখের সামনে।
ইতিহাস এভাবেই লেখা হয় কি? মাকায়া ১৯৫৮তে ছিলেন, যখন লাব্রুনা ছিলেন, ফন্টেইন ছিলেন। এখন মেসি আছেন, সেই মাকায়াও আছেন।
তবে আজ কোনো ভার নেই আর্জেন্টিনার কাঁধে, মেসির কাঁধে। রিজার্ভ থেকে মাঠে নামবেন, কিছুক্ষণ খেলবেন। যদি গত রাতের মধ্যে কেউ তাঁকে পেরিয়ে গিয়ে না থাকেন, তাহলে এখনো তিনি এই বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা। কিছুটা সময় যদি আজ মাঠে পান, সুযোগ থাকবে সেই সংখ্যাটা আরও বাড়িয়ে নেওয়ার।
তবে সংখ্যা নিয়ে ভাবনা নয়, আজ মেসির নির্ভার থাকার দিন। বেঞ্চে বসে জুলাই ৪ তারিখের অপেক্ষা করার দিন। মায়ামিতে শেষ ৩২-এর লরাই সেদিন। সেখানে নামবেন পুরো তেজে।
আজ ডালাসে তাই যুদ্ধ নয়, আজ শুধু নিশ্বাস নেওয়া। পাখি যেমন পরের উড়ানের আগে ডানা একটু ঝাড়ে, তেমনি।