
প্রথমবারের মতো এএফসি এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে অংশ নিতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে আজ রাত দুইটায় রওনা হবে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। দেশ ছাড়ার আগে আজ দুপুরে বাফুফে ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ দলের ইংলিশ কোচ পিটার বাটলার রীতিমতো বিস্ফোরক কথাবার্তা বলেছেন। বাংলাদেশ দলের অন্দরমহলের অস্থিরতা এবং প্রস্তুতির দৈন্য দশা পিটার বাটলারের কথায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
দলের প্রস্তুতিতে ঘাটতি এবং বাফুফের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা নিয়ে নিজের জমানো ক্ষোভ সরাসরি উগরে দিয়েছেন বাটলার। স্পষ্ট ভাষায় বাফুফে কর্তাদের ফুটবলীয় জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বাফুফের মতো সংগঠনের যে পেশাদারত্ব দরকার, সেটা বোঝাতে গিয়েই অমন মন্তব্য করেন বাটলার।
হয়তো এই বাফুফেতে সবাই ফুটবলকে সেভাবে বোঝেন না। জীবনে যেমন হয়, ফুটবলও তেমন। অনেক সময় আপনি জয় আর ফলাফল দিয়ে ফাটলগুলো কাগজ দিয়ে ঢেকে রাখেন। কিন্তু বিষয়টা শুধু প্রথম ১০ মিনিটে ২ গোল করা, তার পরের ২০ মিনিটে আবার ২ গোল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।পিটার বাটলার, কোচ, বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল
বাটলার বলেন, ‘হয়তো এই বাফুফেতে সবাই ফুটবলকে সেভাবে বোঝেন না। জীবনে যেমন হয়, ফুটবলও তেমন। অনেক সময় আপনি জয় আর ফলাফল দিয়ে ফাটলগুলো কাগজ দিয়ে ঢেকে রাখেন। কিন্তু বিষয়টা শুধু প্রথম ১০ মিনিটে ২ গোল করা, তার পরের ২০ মিনিটে আবার ২ গোল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিষয়টা হলো, এমন পারফরম্যান্স গড়ে তোলা, যেখানে বিশ্বাসযোগ্য, মানসম্মত পারফরম্যান্সের ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায়।’
৭ ফেব্রুয়ারি নেপালের পোখারায় সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবলের ফাইনালে ভারতের কাছে ৪-০ গোলে হেরেছে বাংলাদেশ। ফাইনালের আগে বাফুফের নারী উইংয়ের প্রধান মাহফুজা আক্তার মেয়েদের প্রথম ১০ মিনিটেই প্রথম গোল এবং পরের ১০ মিনিটে দ্বিতীয় গোল করতে বলেছিলেন। এতে মেয়েরা চাপে পড়েছে এবং চাপের কাছে হার মেনে ৪ গোল খেয়েছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
আমি কারও হাতের পুতুল নই। যখন সবকিছু গোলমেলে হয়ে যায়, তখন সবাই বলে এটা “বাটলারের দোষ” বা “বাটলারের পরিকল্পনা”। আমি এই দলের জন্য দায়বদ্ধ হতে রাজি, কিন্তু তার আগে লোকেদের মিডিয়ার কাছে গিয়ে মিথ্যা বলা বন্ধ করতে হবে।পিটার বাটলার, কোচ, বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই বাটলার তাঁর মায়ের একটি প্রবাদ টেনে বলেন, ‘আমার মা বলতেন, যত কম কথা, তত কম ঝামেলা। কিন্তু মাঝেমধ্যে সত্যটা বলতেই হয়। আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে অনেক মিথ্যাচার করা হয়েছে। আমি কাউকে আঙুল দিয়ে দোষারোপ করছি না, তবে আমাদের পরিকল্পনাগুলো কাজে লাগেনি।’
বাফুফের ওপর দায় চাপিয়ে বাটলার আরও যোগ করেন, ‘আমি লাইবেরিয়া, বতসোয়ানা, ইংল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় কাজ করেছি। আমি কারও হাতের পুতুল নই। যখন সবকিছু গোলমেলে হয়ে যায়, তখন সবাই বলে এটা “বাটলারের দোষ” বা “বাটলারের পরিকল্পনা”। আমি এই দলের জন্য দায়বদ্ধ হতে রাজি, কিন্তু তার আগে লোকেদের মিডিয়ার কাছে গিয়ে মিথ্যা বলা বন্ধ করতে হবে।’
ডিসেম্বরের পর আর প্রস্তুতি ম্যাচ না হওয়া প্রসঙ্গে বাটলার সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন বাফুফেকে। তাঁর মতে, জাতীয় দলের প্রস্তুতির চেয়ে ঘরোয়া লিগকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বাটলার জানান, ১৯ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের বিপক্ষে খেলার কথা থাকলেও লিগের ম্যাচ পেছানোর ফলে ১০ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি দুটি লিগ ম্যাচ খেলতে হয়েছে। ফলে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। একই সমস্যা হয়েছে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের বিপক্ষে প্রস্তাবিত ম্যাচের ক্ষেত্রেও। এ প্রসঙ্গে বাটলার বলেন, ‘আমি বাস্তব জগতে বাস করি, রূপকথার রাজ্যে নয়। প্রস্তুতির চেয়ে লিগ বেশি অগ্রাধিকার পেয়েছে, যা আদর্শ মানের হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘আমি রিঅ্যাকটিভ হওয়ার চেয়ে প্রোঅ্যাকটিভ হওয়া পছন্দ করি।’
দলের তরুণ তুর্কি আলপি, প্রীতি ও উমেলাদের পারফরম্যান্সে কোচ বেশ সন্তুষ্ট। বিশেষ করে প্রীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সে এখন অদম্য শক্তিতে ফিরে এসেছে। তরুণেরা এখন সিনিয়রদের ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছে, যা দলের জন্য ইতিবাচক।’ তবে বড় দলগুলোর বিপক্ষে ভুলের মাশুল যে ভয়াবহ হতে পারে, সে বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি। তাঁর মতে, উজবেকিস্তান, চীন বা উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ভুল করলে বড় ব্যবধানে হারার ঝুঁকি থাকবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বাফুফের নারী কমিটির প্রধান মাহফুজা আক্তার প্রস্তুতির ঘাটতির কথা স্বীকার করে নেন। তিনি বলেন, ‘প্রস্তুতিটা আরও ভালো হতে পারত। আমি হতাশ বলব না, তবে বাইরে পাঠিয়ে ট্রেনিং বা আরও প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলাতে পারলে তুষ্টিটা আরেকটু বাড়ত।’ সঙ্গে যোগ করেন, ‘...কিন্তু আমি একা সিদ্ধান্ত নিই না, আমার ওপর শীর্ষ কর্তারা আছে।’
বাফুফের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত ছিল, থাইল্যান্ডে কয়েক দিন ক্যাম্প করে এবং সেখানে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে দল যাবে সিডনি। কিন্তু থাইল্যান্ডে ক্যাম্প হচ্ছে না। থাইল্যান্ড বাতিল হওয়ার পর ফিলিপাইনে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেটাও হয়নি কোচ রাজি না হওয়ায়। সব মিলিয়ে প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়েই যেতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।