বিদায়ী ম্যাচের আগে তাঁর ছবিগুলো দেখেছেন? না দেখাটা কঠিন। শুধু সংবাদমাধ্যমই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিডও তো মেসিময় হয়ে আছে গত দু-তিন দিন। হোটেলে ঢোকার সময় মেসি, আর্জেন্টিনা দলের সঙ্গে শেষ অনুশীলনে মেসি, সেটির ফাঁকে ফাঁকে একটু জিরিয়ে নেওয়ার সময় মেসি...। খেয়াল করেছেন হয়তো, প্রায় সব ছবিতেই একটা জিনিস কমন। লিওনেল মেসির মুখভরা হাসি।
ছবিগুলো দেখে একটু কি খটকা লেগেছে? বিদায়ে না একটা বিষণ্ন সুর বাজে! বিদায় রাগিণী মানেই তো বিষাদময় করুণ এক সুর। যাতে প্রচ্ছন্ন হয়ে থাকে কান্না। শুধু আর্জেন্টিনাতেই নয়, লিওনেল মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে যা বাজতে শুরু করেছে ফুটবল বিশ্ব জুড়েই। তাহলে মেসির মুখে বিষণ্নতার ছাপ নেই কেন?
মেসিকে যেহেতু জিজ্ঞেস করার সুযোগ নেই, আমরা শুধু অনুমানই করতে পারি। মেসির মুখের ওই হাসিতে হয়তো সব পেয়ে বিদায় নিতে পারার তৃপ্তি। তিন বছরের মধ্যে কোপা আর বিশ্বকাপ মিলিয়ে তিন–তিনটি ফাইনাল হারার পর দুঃখে–অভিমানে অবসর নিয়ে ফেলার কথা নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে। খ্রিষ্টের জন্মের আগে ও পরের মতো মেসির ক্যারিয়ারেও তাই পরিষ্কার দুটি ভাগ। ২০১৬ সালের আগে ও পরে। আগে শুধুই না পাওয়ার হাহাকার। পরে গলায় একের পর এক প্রাপ্তির মালা। ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে হেরেছেন। যা জিতলে এখনো অনিন্দ্যসুন্দর মেসির গল্পটা অবশ্যই আরও সুন্দর হতো। তবে এর আগেই তো তাঁর পাওয়া হয়ে গেছে সব। বিদায়বেলায় মেসির মুখে যে হাসির কথা বলছিলাম, সেটির সহজ ব্যাখ্যা তো এটাই হয়।
তারপরও কথা থাকে। যখন শেষবারের মতো আকাশি–সাদা জার্সি গায়ে মাঠে নামবেন; যখন তাঁকে বিদায় অর্ঘ্য দিতে ম্যাচের আগে-পরে, এমনকি বিরতিতেও হবে নানা আয়োজন, তখনো কি ওই হাসিটা থাকবে মুখে! নাকি আগে থেকেই ‘এটাই শেষ’ জানা থাকার পরও সত্যি সত্যিই যখন ওই শেষের সময়টা আসবে, লিওনেল মেসি ভেঙে পড়বেন। আবেগে ভেসে যাওয়া যে মেসিকে অনেকবারই দেখেছে ফুটবল বিশ্ব। সর্বশেষ বিশ্বকাপেই তো একাধিকবার।
আজ থেকে অনেক অনেক বছর পরও মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচের কথা উঠলেই উচ্চারিত হবে এমনিতে অখ্যাত এই দেশের নাম! বেনিনের অংশ বলতে শুধু ওটুকুই, নইলে এই ম্যাচের আর কোনো পরিচয় নেই, এটি শুধুই মেসির ম্যাচ। ফুটবল ইতিহাসে এক যুগাবসানের স্মারক।
যে ম্যাচটি খেলে এই বিদায়, সেটির কথা এখনো যে বলাই হয়নি, তার কারণ তো আছেই। বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ বেনিন, এটা শুধু বলতে হয় বলেই বলেছে সবাই। কখনো বিশ্বকাপ না খেলা ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৯৩ নম্বর আফ্রিকার এই দেশ এখানে নিছকই সিনেমার ‘এক্সট্রা’। যদিও পাকেচক্রে এই বেনিনও ঢুকে যাচ্ছে ইতিহাসে। আজ থেকে অনেক অনেক বছর পরও মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচের কথা উঠলেই উচ্চারিত হবে এমনিতে অখ্যাত এই দেশের নাম! বেনিনের অংশ বলতে শুধু ওটুকুই, নইলে এই ম্যাচের আর কোনো পরিচয় নেই, এটি শুধুই মেসির ম্যাচ। ফুটবল ইতিহাসে এক যুগাবসানের স্মারক।
ইন্টার মায়ামিতে হয়তো খেলে যাবেন আরও কিছুদিন। সেই ‘কিছুদিন’ বছরও হতে পারে, হয়তো আরও বেশি। মেসি কোনো আভাসই দেননি। তবে আর্জেন্টিনার মেসিকে তো আর দেখা যাবে না কখনো। আর্জেন্টিনার ম্যাচ হবে, ২১ বছরের অভ্যস্ত দর্শকের চোখ হয়তো আরও কিছুদিন খুঁজে বেড়াবে মেসিকে। তারপর বিদ্যুচ্চমকের মতো মনে পড়বে, মেসি তো এখন অতীত।
তবে স্মৃতিতে তো জ্বলজ্বল করবেন ঠিকই। ফুটবল খেলাটা যত দিন থাকবে, তত দিনই। আর ইউটিউবের এই যুগে সেই স্মৃতিকে আবার জীবন্ত করে তোলাটাও খুবই সহজ। বিদায়ী ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনা দলের অংশ হয়ে শেষবারের অনুশীলনের কয়েকটি ছবিকে কোলাজ বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছেন মেসি নিজেই। যাতে ছোট্ট এক লাইনের ক্যাপশন—‘আমি জানি এই বিশেষ মুহূর্তগুলো মিস করব।’
তা তো করারই কথা। মেসিকেও যে মিস করবে আর্জেন্টিনা, আসলে ফুটবল বিশ্বও—এটা বোধ হয় আলাদা করে বলার দরকার পড়ছে না। সবচেয়ে বেশি কী মিস করবে, কেউ এই প্রশ্ন করলে মেসির ওই ক্যাপশনটাতেই লুকিয়ে আছে উত্তর। একজন খেলোয়াড়ের কী সবচেয়ে বেশি মনে থাকে দর্শকের? মোমেন্টস! সহজ করে বললে মেসির পোস্টের ওই কথাটাই। মুহূর্ত, বিশেষ মুহূর্ত!
ফুটবল মাঠে এমন অগণ্য বিশেষ মুহূর্তের জন্ম দিয়েই তো মেসির মেসি হয়ে ওঠা। ইউটিউবে শুধু তাঁর গোল দেখেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়। মাঝে মাঝে অবশ্য মনে প্রশ্ন জাগে, গোলের চেয়েও মেসি-মহিমা কি বেশি প্রকাশিত তাঁর পাসিংয়ে! ডিফেন্স চেরা অবিশ্বাস্য সব পাস, যেন কম্পাস দিয়ে মাপা!
ফুটবলার মেসি নিয়ে কথা শুরু করলে তা সহজে শেষ হওয়ার নয়। সেই চেষ্টা তাই না করাই ভালো। তা ছাড়া নতুন আর কীই–বা বলার আছে! সবই কি বলা হয়ে যায়নি! এর সঙ্গে যোগ করুন কথায়-আচরণে তাঁর প্রায় নিষ্কলুষ ভাবমূর্তি। সব মিলিয়ে লিওনেল মেসি এমন এক প্যাকেজ, যার তুল্য কিছু ফুটবল ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া কঠিন।
মজাটা এখানেই। যাঁর উত্তরাধিকার হিসেবে মেসির আবির্ভাব, অন্তত অর্জনে যাঁকে নিশ্চিত ছাড়িয়ে গেছেন, সেই ডিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে এখানে কোনো মিলই নেই। বরং মিল খুঁজে পেলে তা পেতে পারেন সর্বকালের সেরার তর্কে অবধারিত অন্য নাম পেলের সঙ্গে। ২৮ বছর আগে–পরে হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে দুজনেরই অভিষেক—ম্যারাডোনা–মেসির মিল এখানে শুরু, বলতে গেলে এখানেই শেষ।
যেখানে পেলের সঙ্গে মিলটা শুধু মাঠে ও মাঠের বাইরে একজন আদর্শ ফুটবলারের প্রতিকৃতি হয়ে থাকাতেই নয়, বিদায়েও। মেসিকে বিদায় জানাতে যেমন নতুন সাজে সেজেছে আর্জেন্টাইন ফুটবলের তীর্থ বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তাল, ১৯৭১ সালের ১৮ জুলাই পেলেকে বিদায় দিতে তেমনি সেজেছিল ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের তীর্থ মারাকানা। ম্যারাডোনার যেখানে মাঠ থেকে বিদায়ই নেওয়া হয়নি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ফক্সবরো স্টেডিয়ামে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটির পর সাদা অ্যাপ্রন পরা এক তরুণীর সঙ্গে যখন ডোপ টেস্ট দিতে মাঠ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন কেউই ভাবেননি ম্যারাডোনা আসলে বেরিয়ে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেই।
মেসিও যাচ্ছেন। তবে একেবারেই অন্যভাবে। সবার ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে। এই বিদায় শুধুই একজন ফুটবলারের বিদায় নয়, একটা সভ্যতারও অবসান।
মেসি–সভ্যতা!