ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের বড় ক্ষতি
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের বড় ক্ষতি

বিপুল আয়ের প্রিমিয়ার লিগে ক্লাবগুলোর ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি

বিপুল রাজস্ব আয়ের সক্ষমতার কারণে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ বিশ্বজুড়ে ঈর্ষণীয় হলেও মাঠের সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে আর্থিক স্থিতিশীলতা অনেকটাই উপেক্ষিত হয়েছে। এর ফলেই গত মৌসুমে ক্লাবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ১০০ কোটি ডলার ক্ষতির মুখে পড়ে। বাংলাদেশের মুদ্রায় যা প্রায় ১২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা।

২০২৪-২৫ মৌসুমে রেকর্ড ৬০৮ কোটি পাউন্ড (প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা) আয় করলেও ট্রান্সফার বাজারে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, খেলোয়াড়দের উচ্চ বেতন এবং এজেন্ট ফির কারণে সব মিলিয়ে ব্যয় আয়কে ছাড়িয়ে গেছে।

এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ চেলসি। ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত হিসাব বছরে তারা কর-পূর্ব ৬ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড ক্ষতি দেখিয়ে প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসে অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড গড়েছে। বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রতিভা দলে ভেড়াতে ক্লাবটির এলোমেলো নীতিই তাদের এই চরম অবস্থার একটি কারণ। তবে তারা একেবারে ব্যতিক্রম কিছু নয়, বরং সামগ্রিক প্রবণতার অংশ।

অন্যদিকে অবনমনের শঙ্কায় থাকা টটেনহাম বিশ্বের নবম ধনী ক্লাব। তারাও আধুনিক ও মাল্টিপারপাস স্টেডিয়াম থেকে বিপুল আয় এবং ইউরোপা লিগ জয়ের পরও গত মৌসুমে ১২ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড লোকসানে ছিল।

সব মিলিয়ে আর্থিক চিত্র আরও হতাশাজনক হতো, যদি হিসাব–নিকাশে কিছু চালাকির আশ্রয় না নেওয়া হতো। কয়েকটি ক্লাব নিজেদের মালিকানাধীন গ্রুপের কাছেই সম্পদ বিক্রি করে কাগজে-কলমে লাভ দেখিয়েছে।

সৌদি মালিকানাধীন নিউক্যাসল যেমন তাদের স্টেডিয়াম সেন্ট জেমস পার্ক ক্লাবমালিকদেরই আরেকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে লাভ দেখায়। অন্যদিকে এভারটন ও অ্যাস্টন ভিলা নিজেদের নারী দল মূল কোম্পানির কাছে বিক্রি করে অর্থ তুলে নিয়েছে।

ফুটবল অর্থনীতি বিশ্লেষক কিয়েরেন ম্যাগুয়ার এএফপিকে বলেন, ‘প্রিমিয়ার লিগের সমস্যাটা হলো, ক্লাবগুলোকে অতিরিক্ত খরচ করতে উৎসাহিত করা হয়। দিনের শেষে এটা এমন এক প্রতিযোগিতা, যেখানে খেলোয়াড় কিনতে ট্রান্সফার ফি আর বেতনের দিক থেকে সবাই একে অন্যকে ছাড়িয়ে যেতে চায়।’

খরুচে ক্লাবের অন্যতম চেলসি

২০২৪-২৫ মৌসুমের এই হিসাবেও গত গ্রীষ্মের ট্রান্সফার উইন্ডোতে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর রেকর্ড ৩০০ কোটি পাউন্ডের খরচ পুরোপুরি ধরা হয়নি, যা আগের সর্বোচ্চ ব্যয়ের চেয়ে ৬৫ কোটি পাউন্ড বেশি।

এদিকে গত গ্রীষ্মের দলবদলে ইংলিশ ক্লাবের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়ে লিভারপুল। ১২ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ডে তারা আলেক্সান্দার ইসাককে দলে ভেড়ায়। এটি ছিল তাদের মোট ৪৫ কোটি পাউন্ডের বড়সড় ট্রান্সফার ব্যয়ের অংশ, যা এখন পর্যন্ত মাঠে প্রত্যাশিত সাফল্য এনে দিতে পারেনি।

প্রিমিয়ার লিগে খেলোয়াড়দের বেতনও লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে। গত মৌসুমে মোট বেতন ব্যয় দাঁড়িয়েছিল ৪০৪ কোটি পাউন্ড, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ শতাংশ বেশি। অথচ একই সময়ে ক্লাবগুলোর মোট আয় বেড়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। ফলে ব্যয়ের চাপ আরও বেড়েছে।

এজেন্টদের ফি বা কমিশন খাতেও রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে, যা নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। কারণ, মাঠে সফলতার পাশাপাশি ক্লাবগুলো যখন বিপুল অর্থ বাইরে খরচ করছে, তখন দর্শকের কাছ থেকে টিকিটের দামও বাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে।

প্রিমিয়ার লিগে এখন সাফল্যের মানদণ্ড শুধু ট্রফি জেতা নয়। আর্থিক দিক থেকেও অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া টানা দ্বিতীয় বছর অন্তত পাঁচটি ইংলিশ ক্লাব চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে, যা ক্লাবগুলোর জন্য বিশাল আর্থিক লাভের সুযোগ তৈরি করে।

তবে আগামী মৌসুম থেকে নতুন আর্থিক নিয়ম চালু হতে যাচ্ছে প্রিমিয়ার লিগে। এই নিয়মের মূল লক্ষ্য হলো ক্লাবগুলোর স্কোয়াড খরচকে তাদের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, খেলোয়াড়দের বেতন, ট্রান্সফার ফি এবং এজেন্টদের খাতে মোট খরচ ক্লাবের আয়ের ৮৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। আর ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় থাকা দলগুলোর ক্ষেত্রে এই সীমা আরও কঠোর, মাত্র ৭০ শতাংশ।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব পরিবর্তন বড় ধরনের লোকসান কমাতে তেমন কার্যকর হবে না। কারণ, অপারেটিং খরচ, যা গত মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ ক্লাবগুলোর জন্য ১০৯ কোটি পাউন্ডে পৌঁছেছে, সেটাকে এই নিয়মের বাইরে রাখা হয়েছে।

অর্থনৈতিক ক্ষতির পরও ক্লাবগুলো এখনো অত্যন্ত আকর্ষণীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর কারণ হলো তাদের সীমিত সংখ্যা এবং প্রিমিয়ার লিগের বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা।

গত মৌসুমে বড় অংকের খরচ করেছে লিভারপুল

উদাহরণ হিসেবে ব্রিটিশ ধনকুবের জিম র‍্যাটক্লিফের কথা বলা যায়। যিনি ২০২৪ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ২৭.৭ শতাংশ শেয়ার ১.২৫ বিলিয়ন পাউন্ডে কিনেছিলেন, যার ফলে ২০ বারের ইংলিশ চ্যাম্পিয়নদের মূল্যায়ন দাঁড়ায় প্রায় ৪০৫ কোটি পাউন্ড। অন্যদিকে চেলসি ২০২২ সালে বিক্রি হয় মোট ৪২৫ কোটি পাউন্ড মূল্যের একটি চুক্তিতে, যেখানে নেতৃত্ব দেয় মার্কিন বিনিয়োগকারী টড বোয়েলি ও প্রাইভেট ইকুইটি প্রতিষ্ঠান ক্লিয়ারলেক ক্যাপিটাল।

ম্যানচেস্টার সিটি আবুধাবির রাজপরিবারের মালিকানায় যাওয়ার পর থেকে ইংলিশ ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করেছে। একইভাবে ২০২১ সালে সৌদি আরবের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল নিউক্যাসলের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড অধিনায়ক গ্যারি নেভিল মনে করেন, চেলসির বড় ধরনের আর্থিক সমস্যা অন্য ইংলিশ ক্লাবগুলোকে ‘বুমিং’ বা ঊর্ধ্বমুখী বাজারে ধীরগতির ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে ফুটবল ফাইন্যান্স বিশেষজ্ঞ ম্যাগুয়ার বলেন, এই বিশাল লোকসানও ধনাঢ্য মালিকদের জন্য বড় সমস্যা নয়। তাঁর মতে, ‘বিলিয়নিয়ার ও সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের মালিকানায় ক্লাব থাকায় এই ক্ষতিগুলো তাদের কাছে সহনীয় বলেই ধরা হয়।’

ম্যাগুয়ার আরও সতর্ক করেন, ‘যতক্ষণ না ক্লাবমালিকদের মানসিকতায় পরিবর্তন আসে এবং খেলোয়াড়-সম্পর্কিত মূল খরচ (ট্রান্সফার ও বেতন) নিয়ন্ত্রণ করা হয়, ততক্ষণ এই ধরনের আর্থিক প্রবণতা চলতেই থাকবে।’