দিনকাল ভালো যাচ্ছিল না রিয়াল মাদ্রিদের। গত ১০ দিনে স্প্যানিশ সুপার কাপের ফাইনালে বার্সেলোনা ও কোপা দেল রে–তে আলবাসেতের কাছে হেরেছে তারা। ক্ষোভে ফুঁসছিলেন সমর্থকেরা। গত শনিবার লা লিগায় লেভান্তের বিপক্ষে ম্যাচে ভিনিসিয়ুস ও জুড বেলিংহামকে সেই ক্ষোভ হজম করতে হয়। দুয়োর শিকার হন তাঁরা। এমনকি রিয়াল সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজকেও সমর্থকেরা ছেড়ে কথা বলেননি। কোচ পদ থেকে জাবি আলোনসোর ছাঁটাই হওয়া তখনো কারও মনে জ্বলছিল তুষের আগুনের মতো।
কিন্তু সেখানেই এখন বেশ শান্তি শান্তি ভাব বিরাজ করছে। বলতে পারেন, ‘অল কোয়ায়েট ইন দ্য সান্তিয়াগো বার্নাব্যু ফ্রন্ট।’ কারণটা অজানা থাকলেও আন্দাজ করে নেওয়া সহজ। রিয়াল যে আবারও চেনা পথে ফিরেছে। চ্যাম্পিয়নস লিগে গতকাল রাতে মোনাকোকে ৬–১ গোলে বিধ্বস্ত করেছে আলভারো আরবেলোয়ার দল। রিয়াল কোচ হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লিগে নিজের অভিষেক ম্যাচেই তাঁর জায়গা হয়েছে ইতিহাসে।
১৯৫৯ সালে ফ্লেইতাস সোলিচ এবং ২০১৩ সালে কার্লো আনচেলত্তির পর রিয়ালের তৃতীয় কোচ হিসেবে ইউরোপের শীর্ষ ক্লাব প্রতিযোগিতায় আরবেলোয়ার অভিষেক হলো ন্যূনতম ৬ গোলে। গ্যালারি থেকে আরবেলোয়ার এমন দারুণ অভিষেক দেখতে নিশ্চয়ই ভালো লেগেছে আনচেলত্তির। সাবেক শিষ্যদের খেলা দেখতে বার্নাব্যুর গ্যালারিতে ছিলেন ‘ডন কার্লো।’
যে সমর্থকেরা কদিন আগেই বেলিংহাম ও ভিনিকে দুয়ো দিয়েছিলেন, সেই তারাই কাল রাতে এ দুজনকে করতালিতে যখন সিক্ত করলেন, আনচেলত্তির দেখে নিশ্চয়ই ভালো লেগেছে? তবে ব্রাজিলের এই কোচের সবচেয়ে ভালো লাগার কথা রিয়ালের খেলার ‘ডিএনএ’ ফেরায়—ধারালো ও দ্রুতলয়ের আক্রমণ এবং গোলের খোঁজে নির্মম। এই অভ্যাসকে ফিরিয়ে এনেই গোল করেছেন ভিনি ও বেলিংহামরা। ভিনি দুটি গোল বানিয়েও দেন।
আর এমবাপ্পে? জোড়া গোল করে সাবেক ক্লাবকে বলেছেন ‘সরি’। অবশ্য মোনাকোর সমর্থকেরা বলতে পারেন, মুখে ‘সরি’ বলে মাঠে সাবেক ক্লাবের বিপক্ষে নিয়মিত গোল করাটা একটু কড়া রসিকতা হয়ে যায়। কারণ, মোনাকোর বিপক্ষে পিএসজি ও রিয়ালের হয়ে ১৫ ম্যাচে এ পর্যন্ত ১৩ গোল করেছেন এমবাপ্পে।
দুর্দান্ত ভিনি–এমবাপ্পেদের সামনে মোনাকোর আসলে কিছুই করার ছিল না। ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় নিজেদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হার নিয়ে ফিরতে হয়েছে তাঁদের।
বার্নাব্যুর দর্শকদের মন জিততে কী করতে হবে সেটা ভিনি থেকে বেলিংহাম—সবাই জানতেন। মাঠে নেমে কেউ আর দেরি করেননি। ৫ মিনিটে এমবাপ্পের গোলে শুরু, যেটা গিয়ে থেমেছে ৮০ মিনিটে বেলিংহামের গোলে। এমবাপ্পে, ভিনিও বেলিংহামের পাশাপাশি গোল করেন ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোও। রিয়ালের অন্য গোলটি আত্মঘাতী। মোনাকোর হয়ে গোলটি জর্ডান তেজের।
প্রথম গোল করার পর গ্যালারিতে মোনাকোর দর্শকদের প্রতি হাত উঁচিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন এমবাপ্পে। তবে ওই পর্যন্তই। কারণ, ২৬ মিনিটে দ্বিতীয় গোলটি করতে এতটুকু কুণ্ঠা করেননি। চলতি মৌসুমে ২৭ ম্যাচে ৩২ গোল করা এমবাপ্পে এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগে ৬ ম্যাচে ১১ গোল করলেন। এর মধ্য দিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে প্রথম পর্বে ৬ ম্যাচে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ১১ গোলের রেকর্ড ছুঁলেন ফরাসি তারকা। ২০১৫–১৬ মৌসুমে রোনালদো রিয়ালের হয়ে গ্রুপ পর্বে প্রথম ৬ ম্যাচে ১১ গোল করেন। তবে এমবাপ্পে যে গতিতে এগোচ্ছেন, তাতে চ্যাম্পিয়নস লিগে এক মৌসুমে রোনালদোর সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড (২০১৩–১৪ মৌসুম, ১৭ গোল) ভাঙতে পারেন এবারই।
ভিনি তাঁর প্রতি সমর্থকদের অভিমান ভেঙেছেন ৬৩ মিনিটে, ম্যাচের সেরা গোলটি করে। বক্সের ভেতর থেকে বুলেট গতির শটে গোল করেন। গ্যালারিতে রিয়ালের সমর্থকেরা এরপরই ভিনির নামে স্লোগান ধরেন। কে বলবে, কদিন আগেও ভিনি এসব দর্শকের কাছেই দুয়ো শুনেছেন!
১৯৫৯ সালে ফ্লেইতাস সোলিচ এবং ২০১৩ সালে কার্লো আনচেলত্তির পর রিয়ালের তৃতীয় কোচ হিসেবে ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় আরবেলোয়ার অভিষেক হলো ন্যূনতম ৬ গোলে।
বেলিংহাম অবশ্য দর্শকদের সঙ্গেই দুষ্টুমি করতে ছাড়েননি। মাঠের বাইরে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কদিন ধরেই বেশ সমালোচনা হচ্ছিল। ৮০ মিনিটে গোল করার পর ইংল্যান্ড তারকার মনে হয়েছে, এসবের জবাব দেওয়া উচিত। সে কারণে হাসিমুখে কল্পিত গ্লাসে মদ্যপানের ভঙ্গি করেছেন বারবার।
ম্যাচ শেষে এই উদ্যাপন নিয়ে বেলিংহাম বলেন, ‘অনেকে অনেক কিছু বলে। এগুলো দুই ভাবে নেওয়া যায়। কাঁদতে পারেন, আইনজীবী পাঠাতে পারেন কিংবা উপভোগ করতে পারেন। এটা ছিল দর্শক এবং সেসব মানুষদের প্রতি একটু মজা, যাঁরা যা খুশি তা–ই বলতে পারেন। কিন্তু সত্যিটা জানি আমি। আমি জানি, আমাকে কীসের ভেতর দিয়ে যেতে হয়।’
রিয়াল কোচ আরবেলোয়াও দলের পারফরম্যান্সে খুশি। ম্যাচ শেষে বলেছেন, ‘আজ দেখলাম ভিনিসিয়ুস, কিলিয়ান, জুড এবং বাকিদেরও সমর্থন দিচ্ছে বার্নাব্যু। তারা অসাধারণ খেলেছে। বেলিংহামের দৌড় স্বাভাবিক ছিল না। এমন প্রচেষ্টায় আমি খুব খুশি। এটাই আমাদের প্রয়োজন।’
দুর্দান্ত কিছু ড্রিবলিং, গোল করার পাশাপাশি গোল বানিয়ে ম্যাচসেরা ভিনিসিয়ুসও কথা বলেছেন ম্যাচ শেষে। তাঁর ভাষায়, ‘সম্প্রতি যা ঘটছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এই পারফরম্যান্স আমার জন্য অনেক কিছু...কখনো কখনো আমরা দুয়োর অর্থ বুঝি না। তবে এই ক্লাব ও জার্সির ওজনটা জানি। আমি নিজের কাজটা শুধু মাঠেই সর্বস্ব নিংড়ে দিয়ে করতে পারি। যেখানে স্বস্তি পাই, সেই ঘরের মাঠে আমি চাই না আমাকে দুয়ো দেওয়া হোক। তবে সমর্থকদের সেই অধিকার আছে।’
শীর্ষ আটে থেকে সরাসরি শেষ ষোলোয় ওঠার পথে ভালোভাবেই টিকে রইল রিয়াল। ৩৬ দলের এই তালিকায় ৭ ম্যাচে ১৫ পয়েন্ট নিয়ে দুইয়ে মাদ্রিদের ক্লাবটি। ৬ ম্যাচে ১৫ পয়েন্ট নিয়ে তিনে বায়ার্ন মিউনিখ। ৭ ম্যাচে ২১ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে আর্সেনাল।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ পয়েন্ট তালিকায় শীর্ষে থাকা আর্সেনাল গতকাল রাতে ইন্টার মিলানের মাঠে নতুন ইতিহাস গড়েছে। সর্বশেষ মৌসুমে ফাইনালে খেলা ইতালিয়ান ক্লাবটিকে ৩–১ গোলে হারিয়েছে আর্সেনাল। এসিএল চোটে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকা আর্সেনালের ব্রাজিলিয়ান তারকা গ্যাব্রিয়েল জেসুস জোড়া গোল করেন। ২০২৩ সালের নভেম্বরের পর চ্যাম্পিয়নস লিগে প্রতিপক্ষের জাল খুঁজে পেলেন জেসুস।
এই জয়ে লিগ পর্বে শীর্ষ দুই দলের একটি হয়ে শেষ ষোলোয় ওঠা নিশ্চিত হলো আর্সেনালের। পাশাপাশি শতভাগ জয়ের ধারাও বজায় রাখল মিকেল আরতেতার দল। লিগ পর্বে এ পর্যন্ত ৭ ম্যাচের সবগুলোই জিতে আর্সেনাল যেন এখন ‘সপ্তম স্বর্গে’। আর্সেনালের ইতিহাসে ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় টানা ৭ ম্যাচ জয়ের নজির এই প্রথম।