প্রয়াত মার্লন ব্র্যান্ডো হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা। একবার তাঁর কাছে এক সাংবাদিক জানতে চান, কেউ কেউ যে তাঁকে সর্বকালের সেরা অভিনেতা বলে মনে করেন, ব্যাপারটি তাঁর কেমন লাগে? উত্তরে ‘গডফাদার’ নিস্পৃহভাবে বলেছিলেন, ‘তাতে কী আসে–যায়!’
ব্র্যান্ডোর যুক্তি ছিল, তুলনা ব্যাপারটাই তাঁর অপছন্দ। কারণ, সবাই সবার জায়গা থেকে সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করেন এবং একেকজনের কাজের ধারা একেক রকম। পৃথিবীতে সফলতার যে সংজ্ঞা, সে অনুযায়ী কেউ সফল হন, কেউ হন না। কিন্তু কাজটা তো সবাই করেন।
সিনেমার জগৎ যেমন সৃষ্টিশীল, তেমনি খেলার জগৎও। আর সৃষ্টিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক কাজে তুলনা উঠবেই। তাতে ব্র্যান্ডো কিংবা অন্যরা পছন্দ করুন না করুন, মানুষ যে তুলনা করতে পছন্দ করে। এই যেমন ধরুন আলভারো আরবেলোয়া রিয়াল মাদ্রিদ কোচ হিসেবে ৪টি ম্যাচ পার করার পরই তুলনাটা উঠে গেছে—কার শুরুটা বেশি ভালো? জাবি আলোনসোর রিয়াল মাদ্রিদ নাকি আরবেলোয়ার?
আলোনসোর বিষয়টি এত দিনে বেশ অতীত হলেও মন থেকে মুছে যাওয়ার কথা নয়। মাত্র ৭ মাস দায়িত্বে থাকার পর ১২ জানুয়ারি রিয়ালের কোচের পদ থেকে ছাঁটাই হন আলোনসো। স্প্যানিশ সুপার কাপের ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার কাছে ৩–২ গোলে হেরে যাওয়ার পর তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। আলোনসোর অধীনে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৪ ম্যাচ খেলে ২৪টিতে জিতেছে রিয়াল। ড্র করেছে ৪টি, হেরেছে ৬টি।
আলোনসোর পর রিয়ালের মূল দলের কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয় আলভারো আরবেলোয়ার কাঁধে। তাঁর আগে গত বছর জুন থেকে রিয়ালের ‘বি’ দলের (কাস্তিয়া) কোচের দায়িত্বে ছিলেন ক্লাবটির সাবেক এ ফুলব্যাক। ২০১৭ সালে বুট তুলে রেখে আরবেলোয়া কোচিং পেশা শুরু করেন ২০২০ সালে। শুরু থেকেই তিনি রিয়ালের যুব একাডেমির কোচ ছিলেন।
আরবেলোয়ার অধীনে শুরুটা ভালো হয়নি রিয়ালের। কোপা দেল রের শেষ ষোলোয় আলবাসেতের কাছে ৩–২ গোলের হারে রিয়ালের মূল দলের কোচ হিসেবে আরবেলোয়ার শুরুটা হয় হতাশা দিয়ে। কিন্তু এরপর টানা তিন ম্যাচে জিতেছে তাঁর দল—লা লিগায় দুটি এবং অন্য ম্যাচটি চ্যাম্পিয়নস লিগে। লেভান্তের ও ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে লা লিগায় জিতেছে ২–০ গোলে এবং চ্যাম্পিয়নস লিগে মোনাকোকে বিধ্বস্ত করে ৬–১ গোলে।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কার দাবি, আলোনসোর স্কোয়াড নিয়েই তাঁর চেয়ে শুরুটা ভালো করেছেন আরবেলোয়া। এ দাবির পক্ষে আছে কিছু পরিসংখ্যান। যেমন ধরুন, রিয়াল কোচ হিসেবে নিজের প্রথম ৪ ম্যাচে আলোনসো না হারলেও তাঁর দল গোল করেছিল ৮টি—সেখানে আরবেলোয়ার রিয়াল প্রথম ৪ ম্যাচে গোল করেছে ১২টি। যদিও তারা হজম করে ৪ গোল, আর আলোনসোর রিয়াল হজম করেছিল ২ গোল।
আলোনসোর অধীনে রিয়াল ৩৪ ম্যাচে করেছিল ৭২ গোল। অর্থাৎ, ম্যাচপ্রতি তাঁদের গোলগড় ছিল ২.১১। কিন্তু আরবেলোয়ার রিয়ালের শুরুতে ম্যাচপ্রতি গোলগড় ৩ (৪ ম্যাচে ১২ গোল)। পোস্টে শট রাখায়ও আলোনসোর সময়কে শুরুতেই টেক্কা দিয়েছেন আরবেলোয়া। আলোনসোর সময়ে ম্যাচপ্রতি গড়ে ১৮.৮টি শট পোস্টে রেখেছে রিয়াল, কিন্তু আরবেলোয়ার বর্তমান সময়ে রিয়ালের খেলোয়াড়েরা ম্যাচপ্রতি গড়ে ২১.৫টি করে শট পোস্টে রাখছেন।
বল দখলে রাখার হারেও এগিয়ে আরবেলোয়ার দল। ম্যাচপ্রতি তারা গড়ে ৬৩.৯ শতাংশ বল দখলে রাখছে, যেখানে আলোনসোর রিয়াল রেখেছে ৫৭.৩ শতাংশ করে।
আরেকটু গভীরে তাকানো যাক।
আরবেলোয়ার রিয়াল আলোনসোর রিয়ালের তুলনায় একটু বেশি পাসিং ফুটবল খেলে। ম্যাচপ্রতি গড়ে ৬১৮.১৫টি করে পাস খেলেছে আরবেলোয়ার দল, আলোনসোর রিয়াল গড়ে খেলেছে ৫৫৩টি করে পাস। সফল পাসেও এগিয়ে আরবেলোয়া—তাঁর দল যেখানে গড়ে ৫৫৫টি করে সফল পাস খেলেছে, আলোনসোর রিয়াল খেলেছে ৪৯০টি করে। প্রতিপক্ষের অর্ধেও আরবেলোয়ার রিয়ালের সফল পাস খেলার সংখ্যা বেশি—৮৬.৬ শতাংশ ও ৮৩.৪ শতাংশ। যদি রক্ষণভাগে তাকানো যায়, সেখানেও অন্তত আলোনসোর চেয়ে কম শট হজম করেছে আরবেলোয়ার দল। আলোনসোর রিয়াল যেখানে ম্যাচপ্রতি গড়ে পোস্টে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে ৪.৩টি করে শট হজম করেছে, সেখানে ৩টি করে শট হজম করেছে আরবেলোয়ার দল।
সব মিলিয়ে প্রতিপক্ষের অর্ধে উপস্থিতি, আক্রমণ, বল দখলে রাখা এবং পাস খেলা—ভালো ফুটবল খেলার যেসব পূর্বশর্ত, সেসব বিষয়ে আলোনসোর দলের চেয়ে ভালো করার ইঙ্গিত দিচ্ছে আরবেলোয়ার দল। সর্বশেষ ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে ম্যাচের কথাই ধরুন—সে ম্যাচে ভিয়ারিয়ালের পোস্টে ১৪টি শট রাখার বিপরীতে মাত্র ৮টি শট হজম করেছে রিয়াল। বল দখলে রেখেছিল ৫৮.১ শতাংশ। পাশাপাশি রিয়াল এ মৌসুমে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জয় পেয়েছে কিন্তু আরবেলোয়ার অধীনেই (মোনাকোর বিপক্ষে ৬–১)। কার্লো আনচেলত্তিও গত মৌসুমে রিয়ালকে এত বড় জয় এনে দিতে পারেননি।
স্কোয়াডে কোনো রকম পরিবর্তন না এনেই এই উন্নতি করেছেন আরবেলোয়া। তবে এটা সত্য, আরবেলোয়ার অধীনে কিছু খেলোয়াড় বেশি সুযোগ পেয়েছেন, যেমনটা অনেকে পেয়েছিলেন আলোনসোর অধীনেও। যেমন ধরুন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র—আরবেলোয়ার স্কোয়াডে ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার খুব গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।
সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডার আরদা গুলেরকেও ফিরিয়েছেন আরবেলোয়া। আলোনসোর অধীনে শেষ দিকে অনিয়মিত হয়ে পড়েছিলেন এই তরুণ তুর্কি। এদগুয়ার্দো কামাভিঙ্গাকে ফুলব্যাক পজিশনে খেলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আরবেলোয়া। যদিও ভিয়ারিলারের বিপক্ষে মিডফিল্ডে চোখধাঁধানো পারফরম্যান্স করেন এই ফরাসি তারকা। আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোও গুরুত্বপূর্ণ আরবেলোয়ার কাছে। অবশ্য আলোনসোর একাদশেও নিয়মিত উপস্থিতি ছিল তাঁর।
আলোনসো ও আরবেলোয়া একসময় রিয়ালে সতীর্থ ছিলেন। দুজনের সম্পর্কও চমৎকার। আরবেলোয়ার ভাষায়, ‘ভাইয়ের মতো’ বন্ধু। এমন সম্পর্কের দুজন মানুষের মধ্যে কোচ হিসেবে পারফরম্যান্সে ফারাক দেখে তাঁদের এখনই বিচার করাটা একটু বাড়াবাড়ি হতে পারে। কারণ, আরবেলোয়া রিয়ালের মূল দলের কোচ হিসেবে যাত্রাটা কেবল শুরু করলেন। আর আলোনসোও কিন্তু রিয়ালে নিজেকে প্রমাণের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাননি। এ কারণে মার্লন ব্র্যান্ডের ওই কথাটা কারও কারও কাছে সত্য মনেও হতে পারে—কে সেরা, তাতে কী যায়–আসে! নিজের কাজটা তো তারা করেছে।