রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে তাঁর গল্পটা শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালের এক গ্রীষ্মে। মাত্র ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে যখন ৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরোয় কিনে নিল রিয়াল, সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর আকাশে-বাতাসে ছিল গভীর সংশয়। অচেনা এক কিশোরকে নিয়ে এত বড় জুয়া? ৯ বছর আগের সেই সংশয়ের গল্পগুলো এখন কেবলই স্মৃতির জাদুঘরে আর্ট পেপারে মুড়িয়ে রাখার মতো।
সেই কিশোরের নাম ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। রিয়ালে পা রেখে শুরুতে হোঁচট খেয়েছিলেন, খেলেছেন মূল দলের বদলে ‘কাস্তিয়া’তে। ওই দিনগুলো যে কতখানি কষ্টের ছিল, তা শুধু ভিনিই জানেন। গোল মিস করেছেন, সমালোচনা শুনেছেন।
কিন্তু সান্তিয়াগো বার্নাব্যু যেমন প্রতিভাকে পরীক্ষা করে, তেমনই একসময় তা মাথায় তুলে নিতেও কার্পণ্য করে না। সেই কঠিন দিনগুলো পেরিয়ে এখন তিনি রিয়ালের ইতিহাসেই এক বড় নাম। ৯ বছর পর রিয়ালের জার্সিতে তাঁর পরিসংখ্যান: ৩৭৫ ম্যাচ, ১২৮ গোল, ৮৫ অ্যাসিস্ট। শুধু সংখ্যা নয়, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ট্রফির গল্পও।
চ্যাম্পিয়নস লিগে রিয়ালের সর্বশেষ যে দুই শিরোপা, সেখানে ভিনিসিয়ুস ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্র। তবে মাঠের এই নান্দনিক পারফরম্যান্স ভিনির গল্পের অর্ধেক মাত্র। মাঠের বাইরের ভিনিসিয়ুস আরও এক আশ্চর্য বিস্ময়। রিয়ালের জন্য এক সোনার ডিমপাড়া হাঁস! কীভাবে? ব্যাখ্যা করা যাক।
শুধু রিয়াল মাদ্রিদে নয়, ব্রাজিল ও ফুটবল–বিশ্বেরও সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন এখন ভিনি। সর্বশেষ বিশ্বকাপে ভিনির গায়ে ছিল ১৬টি প্রতিষ্ঠানের স্পনসরশিপের ছাপ। টুর্নামেন্টে নেইমারের (২০টি) পর তিনিই ছিলেন স্পনসরদের সবচেয়ে প্রিয় মুখ। তাঁর ব্র্যান্ডগুলোর বড় অংশই বিশাল সব বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, যাদের কাছ থেকে প্রচারদূত হিসেবে মোটা অঙ্ক আয় করেন ভিনি। ব্রাজিলিয়ান এই উইঙ্গারের সঙ্গে রিয়ালের বর্তমান চুক্তি আগামী বছরের জুন পর্যন্ত। বছরে তাঁর বেতন ২ কোটি ৫০ লাখ ইউরো। ভিনিকে নিয়ে এরই মধ্যে আর্সেনালসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি ক্লাব আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
তবে বিক্রি করার চিন্তা দূরের কথা, চুক্তি শেষ হওয়ার আগেই তাঁর সঙ্গে চুক্তি নবায়নে মরিয়া হয়ে উঠেছে রিয়াল। ২০২২ সালে রিয়ালের সঙ্গে চুক্তি নবায়নের পর তাঁর ইমেজ রাইটসের প্রায় ৫০ শতাংশ এখন রিয়াল মাদ্রিদের অধিকারে। মানে ইমেজ রাইটস থেকে ভিনি যা আয় করেন, তার অর্ধেকের মতো পায় রিয়াল। এবং সেই অঙ্কটা তাঁর বার্ষিক বেতনের চেয়ে বেশি। মাদ্রিদের স্প্যানিশ সাংবাদিকেরা তাই মজা করে বলেন, ভিনিসিয়ুস মূলত নিজের ভাবমূর্তি বেচেই নিজের বেতন নিজে উপার্জন করেন! এমন একজনকে রিয়াল কেন বিক্রি করবে!
ভিনিসিয়ুস তাই রিয়ালের জন্য স্রেফ একজন ফুটবলার নন, একই সঙ্গে একটি ব্যবসাও। ভিনির ইমেজ রাইটস ও ব্র্যান্ডের মূল দেখাশোনা করে ‘রক নেশন স্পোর্টস ব্রাজিল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী ফ্রেদেরিকো পেনা বলছেন, ‘এ বয়সেই ভিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্লাব ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দলের মূল খেলোয়াড়। দুবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন, হয়েছেন তারকা। ব্রাজিলের তরুণদের কাছে তিনি অধ্যবসায় আর সাফল্যের প্রতীক। সামাজিক ইস্যুতেও তিনি পিছিয়ে থাকেন না। ফলে তাঁর প্রতি ব্র্যান্ডগুলোর আগ্রহ বাড়ছেই।’
পেনা আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানে শুধু ভিনি–সম্পর্কিত বিষয়গুলো দেখভাল করার জন্য আলাদা কাঠামো আছে। যেখানে সিইও, সিএফও তো আছেনই, আছে প্রশাসন, আইন, বাণিজ্য, বিপণন, যোগাযোগ সব বিভাগও। পাশাপাশি ভিনির ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে সামাজিক কাজও হচ্ছে, যা শিশু-কিশোরদের জন্য উদ্ভাবনী শিক্ষাপদ্ধতি ও বর্ণবৈষম্যবিরোধী শিক্ষা দেয়।
এই কাজগুলোই ভিনিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কারণ, তিনি শুধু গোল করেন না, তিনি অবস্থান নেন। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট, দৃঢ়, আপসহীন।
মাঠে অপমানিত হয়েছেন, তবু চুপ থাকেননি। এই লড়াই তাঁকে আরও বড় করেছে। কোম্পানিগুলোর কাছে তিনি এখন শুধু তারকা নন, একটি কণ্ঠস্বর। মাঠে তিনি দৌড়ান, গোল করেন, ট্রফি জেতেন। মাঠের বাইরে তিনি কথা বলেন, প্রভাব ফেলেন।
আর রিয়াল মাদ্রিদ তো সব সময় এমন খেলোয়াড়ই নিজেদের দলে চায়।